কিছু কিছু প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ‘নির্লিপ্ত ও নিশ্চুপ’ ভূমিকা পালন করছেন বলে প্রশ্ন তুলেছেন নজরুল ইসলাম খান।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপির নির্বাচনি অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান এই প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, “আমরা চাই যথাসময়, ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হোক এবং আমরা এটাও চাই যে সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। আমাদের কোনও কাজে কোনও কনফিউশন যাতে না হয়, সেজন্য আমাদের চেয়ারম্যান তার উত্তরাঞ্চল সফর স্থগিত করেছেন। আমরা যেখানে নির্বাচনি পরিবেশ বজায় রাখার জন্য এত উদ্যোগী, সেখানে আশা করতেই পারি যে অন্য সবাই নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে শান্তি-শৃঙ্খলা এবং নির্বাচনি পরিবেশ অটুট রাখার জন্য কাজ করবেন।”
“দুর্ভাগ্য আমাদের, সেটা হচ্ছে না। আপনারা ছবিগুলোতে (সংবাদ সম্মেলনে দেখানো আলোকচিত্র) দেখতে পাবেন যে আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের প্রধানরা পর্যন্ত এমন বক্তব্য রাখছেন, এমন সব ব্যানার নিয়ে কথা বলছেন, যেটা স্পষ্টতই নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন। আমরা আশা করি নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনি কর্মকর্তারা সাধারণ প্রার্থীদের প্রতি যেমন কঠোর আইন পালন করার ব্যাপারে আগ্রহী, সবার ব্যাপারেই তেমনই আইনানুগ আচরণ করবেন। আমরা নির্বাচন কমিশনে বলে এসেছি, এখন আপনাদের মাধ্যমে বলছি, নির্বাচন কমিশনের এই নির্লিপ্ততা কিংবা নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিশ্চুপতা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করছে। এটা অনুচিত বলে আমরা মনে করি এবং আমরা আশা করি তারা তাদের আচরণে পরিবর্তন আনবে”, বলেন নজরুল ইসলাম খান।
তিনি বলেন, “সব রাজনৈতিক দলের কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে যে তারা নিজের দায়িত্বেই এই কাজগুলো থেকে বিরত থাকবেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা আশা করবো বাংলাদেশে আরও যারা রাজনৈতিক দল আছেন তারাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে কোনও বাধার কারণ হবেন না। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনি কর্মকর্তাবৃন্দ যার যা দায়িত্ব, যার যা ভূমিকা, যার যার ক্ষমতা সেটা তারা প্রয়োগ করবেন বলে আমরা আশা করি।”
‘সবাইকে নিয়ে নির্বাচন চাই’
সাংবাদিকদের উদ্দেশে নজরুল ইসলাম খান বলেন, “আমরা আপনাদের সাক্ষী রেখে বলতে চাই যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব যদি কেউ দাবি করতে পারে, সেটা বিএনপি। আমরা একদলীয় স্বৈরশাসনের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছি, আমরা রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে দেশকে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারে পরিণত করেছি, আমরা এক-এগারোর সরকারকে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারে বাধ্য করেছি। এবারও প্রায় ১৭-১৮ বছর ধরে আমরা অবিরাম লড়াই করেছি। আমাদের বহু সাথী গুম হয়েছেন, খুন হয়েছেন, নিপীড়িত হয়েছেন, মিথ্যা মামলায় নির্যাতিত হয়েছেন। আমরা সবাইকে নিয়ে একটা শান্তিপূর্ণ, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন চাই। সেজন্য আমরা আমাদের ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আপনাদের মাধ্যমে আমরা জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই, দেশের মানুষ যারা বহু বছর ভোট দিতে পারেনি, মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। তারা যাতে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে, শান্তি এবং শৃঙ্খলার মধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেজন্য আমরা কাজ করছি। এ ব্যাপারে আমাদের ভূমিকা আমরা পালন করছি, আমরা তাদের সমর্থন চাই, আমরা তাদের সহায়তায় সহযোগিতায় আমাদের যে কর্মসূচি সেটা পালনের ইচ্ছা রাখি।”
‘নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই’
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান বলেন, ‘‘আমরা বারবার বলে এসেছি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চাই, সবার জন্য সমান সুযোগ। দল বড় হোক বা ছোট হোক, ব্যক্তি ক্ষমতাবান হোন বা না হোন, পদবিধারী হোন বা সাধারণ নাগরিক হোন, সবার জন্য নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকা দরকার।”
তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন বিএনপির কয়েকজন প্রার্থীকে শোকজ করেছে। হয়তো কোনও প্রার্থী নির্বাচনি এলাকা নয়—এমন কোনও দোয়া মাহফিল বা আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন, সেখানে উপস্থিত কারও বক্তব্য থেকে ‘ধানের শীষে ভোট দিন’—এ ধরনের কথা বলা হয়েছে। যিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন, তিনি প্রার্থী নন, আমাদের দলের উল্লেখযোগ্য কোনও নেতাও নন। তবু ওই ঘটনায় প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। একইভাবে আমাদের একজন প্রার্থীর মেয়ের পরিচালিত একটি ফেসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়, যা নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এ কারণে ওই প্রার্থী ও তার মেয়েকে শোকজ করা হয়েছে। আমরা এটি মেনে নিয়েছি, মেনে নিতে পারি। তবে আমরা দেখতে চাই, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনি কর্মকর্তারা সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের আচরণ করছে কিনা।”
তিনি বলেন, “কিন্তু আপনারা এখানে (সংবাদ সম্মেলনে দেখানো আলোকচিত্র) কিছু দৃশ্য দেখতে পাবেন যে অন্য দলগুলো একই আচরণ করছে না। অন্য দলগুলোর উল্লেখযোগ্য নেতা, গুরুত্বপূর্ণ নেতা, এমনকি প্রধান নেতারা পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনি কর্মকর্তাদের চোখের সামনে। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।”
নজরুল ইসলাম খান বলেন, “অথচ আপনারা জানেন, আমাদের দলের চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত সফরে দেশের উত্তরাঞ্চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেখানে তিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কবর জিয়ারত, চব্বিশের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম শহীদ আবু সাঈদসহ বিভিন্ন জেলার শহীদদের কবর জিয়ারত করে তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, তার নানির কবর জিয়ারত, নিজের গ্রামের বাড়িতে যাওয়া এবং তার মা— যিনি গত ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেছেন—তার জন্য দোয়া মাহফিলে অংশ নেওয়ার কথা ছিল।”
“শুরু থেকেই পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল, এটি কোনও নির্বাচনি সফর নয়, রাজনৈতিক সফরও নয়। তিনি কোথাও কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন না, কোনও নির্বাচনি সমাবেশেও অংশ নেবেন না। তারপরও এ নিয়ে কিছু মহলে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয়।”
“এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন আমাদের অনুরোধ করেছিল, সফরটি যেন ২২ তারিখ পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। আমরা সেই অনুরোধ মেনে নিয়েছি এবং আমাদের চেয়ারম্যান সফরটি স্থগিত করেছেন।”
পোস্টাল ব্যালট প্রসঙ্গে
ছাপানো পোস্টাল ব্যালটে তিনটি রাজনৈতিক দলের প্রতীক একেবারে প্রথম দিকে আর বিএনপির প্রতীক ভাঁজে নিচে স্থান পাওয়ার প্রসঙ্গটি তুলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, “আপনারা বুঝবেন যে বিষয়টা খুব স্পষ্টতই উদ্দেশ্যমূলক। আমরা এটাকে খুবই অন্যায় এবং অনৈতিক মনে করি। আমরা মনে করি এটা দ্রুত সংশোধন হওয়া প্রয়োজন। দরকার হলে পুনরায় ব্যালট ছাপানো হোক, এখনও যথেষ্ট সময় আছে।”
তিনি বলেন, “আমরা এটাও আলোচনা করেছি যে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে আরও কিছু ঘটনা ঘটছে। আপনারা লক্ষ করে থাকতে পারেন, বাহরাইনে একজন জামায়াত নেতার বাসায় দুইশ’র বেশি ব্যালট পেপার নিয়ে কাজ করার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ব্যালট পেপার একজন ভোটারের আমানত। আমার ব্যালট পেপার আমি ছাড়া অন্য কারও দেখার সুযোগ নেই। এটা শুধু অনুচিত নয়, বেআইনিও।”
“আপনারা জানেন, ভোটকেন্দ্রে একজন ভোটার ব্যালট পেপার নিয়ে এনক্লোজারের ভেতরে গিয়ে ভোট দেন এবং পরে সেটি বাক্সে ফেলেন। এই প্রক্রিয়ার মাঝখানে আর কারও সেই ব্যালট পেপার দেখার বা হাতে নেওয়ার কোনও সুযোগ থাকে না। অথচ এখানে দেখা যাচ্ছে, একটি বাসায় অনেক ব্যালট পেপার নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এতে ব্যালট পেপার ব্যবহারের স্বাভাবিক, ন্যায্য ও আইনানুগ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “একই ধরনের আরেকটি ঘটনা আজও আমরা পেয়েছি। ওমানের একটি গ্যারেজে গাড়ির ওপর অনেকগুলো ব্যালট পেপার রেখে একজন কাজ করছে—এমন একটি ভিডিও পাওয়া গেছে। যিনি কাজ করছেন তার নাম হুমায়ুন কবির এবং সেখানে বসবাসকারীদের জানিয়েছেন তিনি জামায়াতের একজন কর্মী। এসব ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গতকাল আমরা শুধু বাহরাইনের বিষয়টি জানতাম এবং তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলেছি, এ বিষয়ে যেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সেখানকার কর্মকর্তারা বলেছেন, এমন একটি ঘটনা ঘটেছে এবং এ বিষয়ে রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। ভিডিওটি দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যায়—চেহারা স্পষ্ট এবং টেবিলের ওপর অসংখ্য ব্যালট পেপার রেখে কাজ করা হচ্ছে, যা সবাই দেখতে পাচ্ছে।”
‘এই ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে’
নজরুল ইসলাম খান বলেন, “আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। আমরা চাই জনগণ এই নির্বাচনের ওপর আস্থা রাখুক। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হবে, তার বিরুদ্ধে যেন কোনও ধরনের কারসাজির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার অভিযোগ না ওঠে। কিন্তু এনআইডি কার্ড নিয়ে, বিকাশ নম্বর নিয়ে এবং পোস্টাল ব্যালট নিয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটছে—সেগুলো আমরা অনৈতিক ও বেআইনিভাবে নিজেদের পক্ষে অধিক ভোট সংগ্রহের অপচেষ্টা বলেই মনে করি।”
তিনি বলেন, “আমরা শুধু এসব ঘটনার নিন্দা বা প্রতিবাদ জানাচ্ছি না, আমরা সরাসরি জড়িতদের শাস্তি দাবি করছি। নির্বাচন কমিশনকে আমরা অনুরোধ করেছি—এগুলো বেআইনি কাজ। যারা এসব বেআইনি কাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে অন্যরাও সতর্ক হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করতে সাহস পাবে না।”
নজরুল ইসলাম খান আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশন আমাদের জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন। তবে আমরা জানি না তারা কতটা উদ্যোগ নেবেন বা কী ধরনের ব্যবস্থা নেবেন। যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয় এবং যদি অন্যান্য দেশ থেকেও এ ধরনের খবর আসতে থাকে, তাহলে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে—যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।”
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ইসমাইল জবিহউল্লাহসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যও উপস্থিত ছিলেন।