আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একইদিন অনুষ্ঠিত হবে গণভোটও। জাতীয় এই সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসন থেকে প্রতিনিধিত্ব করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি দলের প্রার্থী। তবে দল আটটি হলেও মূলত ভোটের মাঠে লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই। এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন) এবং জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। ভোটাররা বলছেন ভোটের মাঠে দুই শফিকের মধ্যেই লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।
যদিও কে জিতবে বা কে হারবে তা বোঝা যাবে ভোটের পরেই বলছেন ভোটাররা। তারা বলছেন— যেই জিতবে, তিনি সহজ জয় পাবেন না। থাকবে টানটান উত্তেজনা। একই সঙ্গে তারা চান এমন একজন জনপ্রতিনিধি যিনি দল নয়, এলাকার মানুষের কথাই আগে ভাববেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মিরপুরের ৪, ১৩, ১৪ ও ১৬ ওয়ার্ড নিয়ে ঢাকা-১৫ আসন। আর এই আসনের মধ্যে পড়েছে মিরপুর-১০, মিরপুর-১৩, মিরপুর- ১৪, পূর্ব সেনপাড়া, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, কাফরুল, কচুক্ষেত এবং তালতলা এলাকা। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৬ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪ জন।
২০১৮ সালে এই আসনে ডা. শফিকুর রহমান জোটের হয়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচন করলেও এবার তিনি লড়ছেন নিজ দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ নিয়ে। ফলে দলের প্রধানের বিজয় নিশ্চিত করতে জামায়াতের পূর্ণ সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা। প্রচারণায়ও নেই কমতি। ব্যানার ফেস্টুনে ছেয়ে গিয়েছে পাড়া-মহল্লার গলি থেকে মূলসড়ক। পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি নারী কর্মীরাও ভোটার স্লিপ হাতে ঘরে ঘরে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতের আমিরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনও প্রচার-প্রচারণায় পিছিয়ে নেই কোনও অংশে। প্রচার-প্রচারণা, ব্যানার-ফেস্টুন টানানো, নেতাকর্মীদের উপস্থিতি সব ক্ষেত্রেই রয়েছে সরব উপস্থিতি। পাড়া-মহল্লার গলি থেকে মূলসড়কে শফিকুলের ব্যানার-ফেস্টুনও রয়েছে সমানে সমান। যা ভোটের মাঠে টানটান লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিএনপি ও জামায়াত ছাড়াও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আরও ছয়জন প্রার্থী। এরা হলেন— জাতীয় পার্টির মো. সামসুল হক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) আহাম্মদ সাজেদুল হক, বাংলাদেশ জাসদের মো. আশফাকুর রহমান, বাংলাদেশ সুপ্রীম পার্টির (বিএসপি) মোবারক হোসেন, জনতার দলের খান শোয়েব আমান উল্লাহ, আমজনতার দলের মো. নিলাভ পারভেজ।
ঢাকা-১৫ আসনের সরেজমিন চিত্র
সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুর ১০ নম্বরকে কেন্দ্র করে একপাশে তালতলা পর্যন্ত আরেক দিকে কচুক্ষেত পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচারণার ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে এলাকার অলিগলি থেকে মূল সড়কগুলো। পোস্টার না থাকলেও ব্যানারই যেন পোস্টারের কাজ করছে। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে কেবলই চোখে পড়ে নির্বাচনি ব্যানার-ফেস্টুন। তবে এই ব্যানার, ফেস্টুনের সিংহভাগই রয়েছে জামায়াত এবং বিএনপির প্রার্থীর দখলে। হাতেগোনা কয়েকটি জায়গায় চোখে পড়ে অন্য দলগুলোর ব্যানার, ফেস্টুন কিংবা বিলবোর্ড।
যেখানে মিরপুর ১০ নম্বরের গোলচত্তরের লাগানো ডিজিটাল মনিটরে কিছুক্ষণ পর পর ভেসে আসে জামায়াতের আমির এবং বিএনপি প্রার্থী দুই শফিকের ডিজিটাল নির্বাচনি প্রচারণা। সেখানে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সময়ে এই আসন জাতীয় পার্টির প্রার্থীর পক্ষে দুইবার মাইকিং করতে দেখা যায়। আর বাকি অন্যদলের কোনও ধরনের কার্যক্রম নজরে আসেনি।
ভোটারদের ভাষ্য
ঢাকা-১৫ আসনের ভোটার তানিয়া তানজিনা খান অনিমা। তিনি একজন গৃহীনী। তার কাছে এই আসনের নির্বাচনি অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ঢাকা-১৫ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। তবে আরও কয়েকটি দলের প্রার্থী থাকায় লড়াইটি একক নয়। জামায়াতের আমির প্রার্থী হওয়ায় দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও প্রচারণা বিনপির চেয়ে ভালো মনে হচ্ছে। তবে বিএনপির ‘কোর ভোটব্যাংক’ এখনও আছে, বিশেষ করে এলাকার পুরোনো বাসিন্দাদের মধ্যে। কিন্তু সংগঠনিকভাবে মাঠে তারা জামায়াতের মতো দৃশ্যমান নয় বলে আমার মনে হয়েছে।”
নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন একজন জনপ্রতিনিধি চাই যিনি দল নয়, এলাকার মানুষের কথা আগে ভাববেন। আমরা চাই নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ এলাকা। যানজটমুক্ত রাস্তা, ঠিকঠাক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি-গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ।” নির্বাচনের সংঘাতের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “বড় ধরনের সংঘাত হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনও নেই বললেই চলে।”
মিরপুরের বাইশটেকি এলাকার বাসিন্দা মো. আরশাদ বলেন, “আমার ধারনা আমার এলাকায় (বাইশটেকি) বিএনপি জিতবে কিন্তু পুরা আসনে জামায়াত জিততে পারে। কিন্তু হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কেউই সহজে জিততে পারবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমি এমন মানুষ চাই যে গরিব মানুষের দিকে থাকবে। তাদের জন্য কাজ করবে। কারন এই গরিবরাই রাস্তায় থাকে তারাই কিছু হলে দৌড়ে যায়। বড়লোকদের তো টাকার পাহাড়। তাদের কিছুতেই যায় আসে না। আমাদের হিসাব করতে হয় কখন কাজ পাবো, কিভাবে খেতে পারবো। তাই আমরা এমন মানুষ চাই যে গরিব মানুষের বন্ধু হবে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাজীপাড়ার এক বাসিন্দা বলেন, “শুনতেছি জামায়াতের আমির নাকি হারবে এই আসনে। সত্য মিথ্যা জানি না। আমার আগ্রহ নাই। কারন ভোটারদের কোন দাম নেই। এটা নিয়ে ভাবিও না। আমরা দেখি ছয়, তারা (প্রার্থী) দেখে নয়। পুরাই উল্টা। তাই আর ভোট নিয়ে ভাবি না।”
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে কাজীপাড়ার ফল ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ বলেন, “আমি এরশাদ সাহেবের সময় থেকে এই এলাকার ভোটার। অনেক নির্বাচনই দেখেছি, ভোট দিয়েছি। এবারের নির্বাচনেও ভোট দিতে যাবো। এখানে অনেক প্রার্থী দাঁড়ালেও আসলে শোনা যায় দুইজনের নাম— দুই শফিক। একজন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান আরেকজন বিএনপির শফিকুল ইসলাম খান। এছাড়া অন্যদের তেমন আওয়াজ পাই না। আর মূলত নির্বাচনে ফাইট হবে এই দুইজনের মধ্যেই। কেউই সহজে জিততে পারবে না। তবে এটা বলতে পারি এই এলাকায় (কাজীপাড়ায়) বিএনপির জিতবে। এখানে বিএনপির সাপোর্টার বেশি। অন্য এলাকার কথা জানি না।” নির্বাচন নিয়ে কোন ভয় আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভয়ের কিছু দেখছি না। কোও ঝামেলা হবে বলেও মনে হয় না।”
আরেক ব্যবসায়ী সোহেল খান বলেন, “ভোটে কি হবে, কে জিতবে জানি না। কিন্তু আমরা এমন প্রার্থী চাই, যারা এলাকাটা সুন্দর রাখবে। চাঁদাবাজি না হোক, সন্ত্রাসী না থাকুক। আমরা যাতে ভালোভাবে ব্যবসা করে খেতে পারি। কাউকে যেন চাঁদা দিতে না হয়।”
নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা মো. রানা বলেন, “এখন পর্যন্ত এই এলাকায় কোনও ঝামেলা হয়নি। পুলিশ-প্রশাসন ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে। আর বাকি আছে সাতদিন এর মধ্যে কিছু হবে কিনা জানিনা। তবে মনে হয় না আর কিছু হবে।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচন যে আসছে সেটার তেমন আমেজ দেখিনা। কেমন যেন নীরব লাগে সব। কিছুদিন আগে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম সেখানেও একই অবস্থা। নির্বাচনি আমেজ পাওয়া যায় না। তাও, যেমনই হোক ভোটটা যাতে ভালোয় ভালোয় হয়ে যায় সেটাই দোয়া করি। নতুন সরকার এসে ভালো করে কাজ শুরু করুক।”
পোস্টারের কাজ সারছে ব্যানারেই
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নতুন আচরণবিধি অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণায় পোস্টারের ব্যবহারে লাগাম টেনেছে। যদিও নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগে মোটামুটি সব দলই পোস্টার লাগিয়েছিল। যা এখন আর দেখা যাচ্ছে না। তবে পোস্টারের শূন্যতা পূরণ করেছে বড় বড় ডিজিটাল ব্যানার ও ফেস্টুন। সাদা-কালো ও রঙিন ব্যানারে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা।
তবে এসব প্রচারণার মধ্যে আধিক্য দেখা যায় বিএনপি এবং জামায়াত প্রার্থীর। এরপরের অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে সিপিবি ও জাতীয় পার্টি। আর বাকি চার প্রার্থীর ব্যানার-ফেস্টুন নেই বললেই চলে।
আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একইদিন অনুষ্ঠিত হবে গণভোটও। এদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত হবে ভোট গ্রহণ কার্যক্রম।
এই নির্বাচনে এবার দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন ও মহিলা ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন। চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ হয়েছে তাদের নিয়েই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রস্তুত করেছে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটি।
আর আসন্ন এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র স্থাপনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যার মধ্যে পুরুষদের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩৭টি এবং নারীদের জন্য ১ লাখ ২৯ হাজার ৬০২টি কক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট কক্ষের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি। তবে গণভোট ও সংসদ নির্বাচন একই দিনে হওয়ায় গোপন বুথের সংখ্যা বৃদ্ধি করবে সংস্থাটি।