নৈশভোজের টেবিলে জোট রাজনীতির হিসাব-নিকাশ কেমন হলো

সরকার গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় বিগত যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। এতে নেতাদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে নৈশভোজে অংশগ্রহণ করেন সরকারপ্রধান।

আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন, বিরোধী দলগুলোর রাজপথে চলমান আন্দোলন ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঘিরে হঠাৎ এ আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ কৌতূহল ছিল—ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এর মধ্য দিয়ে কী অর্জন করতে চায়? শরিকদের আমন্ত্রণের সংবাদ ঘিরে গত কয়েক দিন বিষয়টিকে একেকজন একেকভাবে মূল্যায়ন করতে থাকেন।

মতবিনিময় ও নৈশভোজের পর এমন প্রশ্নের অনেকটাই জবাব মিলেছে বলে মনে করেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার প্রধানের কাছে সরাসরি নিজেদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির কথা তুলে ধরতে পেরেছেন জোট নেতারা। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে তাদের নিয়ে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল, আর সরকার গঠনের পর তারা কী ধরনের আচরণ পাচ্ছেন—দলটির হাইকমান্ডকে সেসব কথা মনে করিয়ে দিতে পেরেছেন নেতারা। এটি তাদের জন্য এক ধরনের প্রাপ্তি। এ সুযোগে অনেকে নিজেদের সরকারের অংশীদার হিসেবে দেখার অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেছেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক শরিক দলের নেতার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

কীসের ইঙ্গিত দিলেন সরকারপ্রধান?

শরিকদের নিয়ে নৈশভোজ ও মতবিনিময় সভায় তাদের সঙ্গে আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে কথা বলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জোট নেতাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন। বিশেষ করে তাদের মান-অভিমানের কথা শোনেন।

নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখতে আমাদের যেকোনও মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কারণ জনগণের প্রত্যাশা আমাদের কাছে। জনগণ প্রত্যাশা নিয়ে আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছে। আসুন, আগে আমরা দায়িত্বটা পালন করি। তারপর আমরা নিজেদের নিয়ে ভাবি।’’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘বিগত দিনে আমরা-আপনারা অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়েছি। আল্লাহর রহমতে আমরা দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সফল হয়েছি। তাই সামনের দিকে আমরা একসঙ্গেই পথ চলতে চাই।’’

শরিকদের সঙ্গে হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর এমন আন্তরিকতাকে কীসের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, এমনটি জানতে চাইলে নৈশভোজে অংশগ্রহণকারী গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মূলত ঐক্যকে সুসংহত করার বার্তা দিয়েছেন। বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি একসঙ্গে সামাল দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। বিশেষ করে আমাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের কথা তিনি যেভাবে ধৈর্য ধরে শুনেছেন, এতে বোঝা যায় সামনের দিনে সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চান।’’

অভিমান ভাঙলো মান্নার?

বিগত দিনে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে সক্রিয় ছিল তিন দলের সমন্বয়ে গঠিত গণতন্ত্র মঞ্চ। অবশ্য তার আগে এ মঞ্চে ভিপি নূরের গণঅধিকার পরিষদসহ বেশ কয়েকটি দল ছিল। শেষ পর্যন্ত মঞ্চে টিকে ছিল মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, সাইফুল হকের বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও জোনায়েদ সাকীর গণসংহতি আন্দোলন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষ থেকে জোনায়েদ সাকীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ ও সাইফুল হককে ঢাকা-১২ আসনে জোটগত সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু মাহমুদুর রহমান মান্নাকে তার প্রত্যাশিত বগুড়া-২ আসনে ছাড় দেয়নি দলটি। তাই রাগে-ক্ষোভে বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে দেন তিনি। তখন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি নিজের রাজনীতিটা করতে চান। তাই বিএনপি সমর্থন না দিলেও নিজের দল থেকে নির্বাচন করবেন। সে অনুযায়ী দলীয় প্রতীক কেটলি নিয়ে বগুড়া-২ ও ঢাকা-১৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুটি আসনেই হেরে যান। আবার নির্বাচনের পরও বিএনপি সরকার গঠন করলে বিভিন্ন অসঙ্গতির সমালোচনা করেন। যদিও বিএনপির নৈশভোজে তাকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি সেখানে উপস্থিত হন।

আপনার অভিমান ভাঙলো কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন মান্না। তিনি জানান, এ অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিকভাবে দেখতে চান না। এক ধরনের সৌজন্যতা হিসেবেই দেখছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমার দিক থেকে সরকারের ভালো কাজে সমর্থন থাকবে। আর অসঙ্গতিপূর্ণ কাজের সমালোচনাও চলবে।’’

সরকারের অংশীদার হতে চান কেউ কেউ

নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে নিজেদের পাওয়া না পাওয়ার বেদনা ও ক্ষোভের কথা জানান জোটের কয়েকজন নেতা। তাদের দাবি, নির্বাচনের আগেই বিএনপি একসঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তাদের ভুলে গিয়েছে বিএনপি। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, গণফোরামের নির্বাহী কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী সরকারপ্রধানকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘‘বর্তমানে আমরা পরিচয় সংকটে ভুগছি। নির্বাচনের আগে আমাদের বলা হলো মিত্রদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। আর এখন আমাদের ঠিকানা হয়েছে রাস্তায়। আমরা যথাযথ সম্মান চাই।’’

মতবিনিময় অনুষ্ঠানে একই ধরনের বক্তব্য রেখেছেন ভাসানী জনশক্তি পার্টির সভাপতি শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু। তিনি বলেছেন, আগামী দিনে রাজনৈতিক কর্মসূচি বিএনপির সঙ্গেই থাকতে চান। সেক্ষেত্রে তারা নিজেদের যথাযথ মূল্যায়ন চান।

জাতীয় পার্টি (জাফর) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মোস্তফা জামাল হায়দার বলেছেন, ‘‘আমরা আর বিচ্ছিন্ন থাকতে চাই না। সরকারের ভালো কাজে নিজেরাও সম্পৃক্ত থাকতে চাই।’’

জমিয়তের নিবন্ধিত অংশের বর্জন, অংশ নিয়েছেন অনিবন্ধিতরা

বিএনপির যুগপতের শরিকদের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৪টি আসনে মনোনয়ন পেয়েছে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীর নেতৃত্বাধীন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। তবে তারা একটি আসনেও বিজয়ী হতে পারেনি। আর নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও তাদের মূল্যায়ন না করায় এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয় বলে জানা গেছে। তাই আমন্ত্রণ পেলেও তারা মতবিনিময় অনুষ্ঠানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ ব্যাপারে দলটির সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক বৈঠকের আগে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছিলেন— দলীয়ভাবে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে দলটির আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, অনিবন্ধিত অংশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণে তারা বর্জন করেছেন।

সেখানে একই নামের অনিবন্ধিত অংশের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরামসহ কয়েকজন নেতা বক্তব্য রাখেন। তারা জোটের সমন্বয়হীনতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

শিগগিরই রাজনৈতিক কর্মসূচি

নৈশভোজে জোট শরিদের বেশিরভাগ নেতাই বিএনপির রাজনৈতিক তৎপরতা কমে যাওয়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। অনেকে অভিযোগ করে বলেন, মনে হয় শুধু প্রশাসনিক কাজ নিয়েই ব্যস্ত রয়েছে বিএনপি। তাই সামনে যেকোনও উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তাদের বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেখানে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামনে কথা বলেছেন। এতে নির্বাচনের পর জোটের সমন্বয়হীনতা, রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকা, সংরক্ষিত নারী আসনে শরিকদের মূল্যায়ন না করাসহ এবং সরকারি নিয়োগে তাদের নেতাকর্মীদের সুযোগ না দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছি—রাজনৈতিক মাঠ কি জামায়াত ও এনসিপিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে? কেন কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে না, সে বিষয়টি জানতে চেয়েছি। তাছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কীভাবে হবে, সে বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছি। তবে বিষয়টি দেখবেন বলে জানিয়েছেন সরকারপ্রধান।’’ সাইফুল হক জানান, চলতি মাসেই জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয়বার্ষিকীর অনুষ্ঠান জোটগতভাবে করা হবে এবং সেখানে শরিক নেতারাও অংশগ্রহণ করবেন।

অংশগ্রহণ করেন যারা

প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজে বেশিরভাগ মিত্র দলের নেতারা অংশগ্রহণ করেছেন। উল্লেখযোগ্যরা হলেন—বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, জাতীয় পার্টি (জাফর) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মোস্তফা জামাল হায়দার, ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবলু, গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) সভাপতি ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) একাংশের সভাপতি খন্দকার লুৎফর রহমান।

‘পুরো এই উদ্যোগটি কীভাবে দেখছেন’, একসময় যুগপৎ আন্দোলনে থাকা রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সসন্বয়ক হাসনাত আব্দুল কাইয়ুমের কাছে জানতে তিনি চাইলে বলেন, বিগত দিনে আমরাও বিএনপির সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। তবে তাদের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় যাইনি। তাই হয়তো আমরা আমন্ত্রণ পাইনি। তবে আমি জানতে পেরেছি, এ আয়োজনের রাজনৈতিক তাৎপর্য তেমন কিছু নেই। কারণ যতটুকু জেনেছি—এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার চেয়ে শরিকদের দেনদরবারই বেশি ছিল। কারণ নির্বাচনে জোটের অনেক নেতা মূল্যায়ন পাননি। অনেকে মনোনয়ন পেলেও পাস করতে পারেননি। আবার নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও তারা বঞ্চিতই থেকেছেন। স্বভাবতই তারা আশাহত হয়েছেন। এ কারণে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তাদেরই আগ্রহ বেশি ছিল। হয়তো তাদের চাপেই বিএনপি ও সরকার এ উদ্যোগ নিয়ে থাকতে পারে। সামনের দিনে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে বলে তিনি জানান।