লংমার্চে বিরোধী দলের অর্জন কী

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস-সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করার দাবিতে প্রথমবারের মতো ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

তাদের দাবি, ঢাকা টু চট্টগ্রাম লংমার্চ কর্মসূচি জনসমর্থনের মধ্য দিয়ে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই লংমার্চের মধ্যে দিয়ে কী অর্জন করেছে ১১ দলীয় ঐক্য? কেউ বলছেন, এই লংমার্চের মধ্য দিয়ে কোনও অর্জন নেই, কেবল অর্থ অপচয় ও জনদুর্ভোগ হয়েছে। আবার কেউবা বলছেন, লংমার্চের মধ্য দিয়ে সরকারকে চাপে রাখতে সক্ষম হয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য।

এদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চ কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এবার রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং সবশেষ সিলেট বিভাগে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে যদি দাবি আদায় না হয়, তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে‌। সেটি হতে পারে ঢাকায় মহাসমাবেশ।

লংমার্চ সফল দাবি ১১ দলীয় ঐক্যের

১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ হয়েছে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, ‘‘গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী শান্তিপূর্ণ লংমার্চ সফল হয়েছে। এর জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

তিনি বলেন, ‘‘লংমার্চ সফল করতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের লালদিঘির ময়দান পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষ রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে গাড়িবহরকে অভিবাদন জানিয়েছে, যা তাদের প্রাণের দাবি আদায়ের জন্য ত্যাগকে তুলে ধরে। পথসভাগুলোতে হাজার হাজার লোকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে ১১ দলীয় ঐক্যের দাবি কোনও দলীয় দাবি নয়, এটি জনগণের প্রাণের দাবি।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ের আগামী দিনের কর্মসূচিতে দেশবাসী আরও বেশি সম্পৃক্ত হবেন বলে আশা করছি আমরা। লংমার্চ কর্মসূচির কারণে সাময়িক ভোগান্তির জন্য দেশবাসীর কাছে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি আমরা। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর একইভাবে ঢাকা থেকে রংপুর লংমার্চ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।’’

১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের মধ্য দিয়ে সরকারকে জনগণের দাবি আদায়ের বিষয়ে চাপ দিতে সক্ষম হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘লংমার্চের মধ্য দিয়ে আমরা জনগণের কাছে গিয়েছি। জনগণের দাবি আদায়ে সরকারের ওপর প্রেসার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি।’’

সংসদে অবস্থান ও রাজপথে আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘সভা সমাবেশ আমাদের মৌলিক অধিকার। সংসদে থাকলে রাজপথে থাকা যাবে না এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত গণবিরোধী। আমরা সেসব সিদ্ধান্তের বিষয়ে সংসদে যেমন বিরোধিতা করেছি, তেমনই রাজপথেও করছি। তাছাড়া সংসদে তো সব বিষয়ের সমাধান হচ্ছে না। গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা স্পষ্ট।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমরা লক্ষ করছি সরকার সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা করছে। অনেকে আমাদের আন্দোলনকে নেতিবাচকভাবে দেখতে চায়। স্পষ্টভাবে বলতে চাই, জনবিরোধী যেকোনও পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমরা সব সময় সোচ্চার থাকবো। আমরা যেকোনও মূল্যে আমাদের দাবি আদায় করে ছাড়বো। এর জন্য ধাপে ধাপে যেসব কর্মসূচি করা দরকার সেসব বাস্তবায়ন করবো।’’

লংমার্চে একদফার ইঙ্গিত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা নিজেদের প্রথম লংমার্চ কর্মসূচিতে বিভিন্ন জায়গায় জনসভা ও পথসভায় জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে সরকার পতনের জন্য ‘এক দফার’ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তারা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে ‘বাধ্য’ করার কথা জানিয়েছেন।

বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান চট্টগ্রামের লালদিঘির লংমার্চের সমাবেশে বলেছেন, ‘‘এ আন্দোলন জনগণের দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন। জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলন। জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা আদায় করে ছাড়বো। প্রস্তুত থাকুন। বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসবে। জনগণের যখন প্রয়োজন হবে তখনই ডাক আসবে। এ লড়াইয়ে জনগণের বিজয় হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আজকের লংমার্চ সরকারকে সতর্ক করার জন্য। বাকিগুলো এমন হবে না। আমাদের বাধ্য করেছেন রাজপথে আসতে। আমরা চেয়েছিলাম সংসদে ফয়সালা হবে।’’

অপরদিকে লংমার্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘‘আমরা লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে পালন করবো। যদি সরকার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে— তাহলে এই লংমার্চের ছয় দফা একদফাতে পরিণত হবে।’’

লংমার্চ কেবল অর্থ অপচয় ও জনদুর্ভোগ

১১ দলীয় ঐক্যজোটের লংমার্চ কর্মসূচি কেবল অর্থ অপচয়, জনদুর্ভোগ ও ভোগান্তি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘এই লংমার্চে কোনও জনকল্যাণ নেই। এখানে কেবল অর্থ অপচয় হয়েছে, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার গঠনের পর থেকেই জামায়াত বিরোধী দল হিসেবে পদে পদে ব্যর্থতার প্রমাণ দিচ্ছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে লংমার্চ সাধারণত চূড়ান্ত কর্মসূচি হয়। সে জায়গায় সরকারের ছয় মাসের মাথায় বিরোধী দল এই কর্মসূচি দিয়েছে। শুনলাম, এমন আরও কর্মসূচি দেবে। তাহলে তো লংমার্চের যে ভার, সেটাও নষ্ট করবে। ভবিষ্যতে এই লংমার্চ নাম শুনলেই ছেলেখেলা মনে হবে। তারা বোধহয় ভবিষ্যতে চূড়ান্ত কর্মসূচি হিসেবে পথসভা দেবে।’’

রাশেদ খাঁন বলেন, ‘‘জামায়াত জোটের এটা লংমার্চ নয়, লং ড্রাইভ। তারা ছয় মাসেই বোল্ড আউট হয়ে গিয়েছে। তারা লংমার্চের নামে কেবল সরকারের বিরোধিতা করেছে। তাও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গাড়িতে চড়ে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এই লংমার্চের অর্থায়ন কি আওয়ামী লীগ করেছে? তারা কিন্তু এখন কোথাও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয় না। তাদের বক্তব্যে কেবল সরকারের বিরোধিতা।’’

১১ দলীয় জোটের লংমার্চ কর্মসূচি সম্পর্কে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘হঠাৎ এ ধরনের কর্মসূচির কারণ কী বা যৌক্তিকতা কতটুকু, এটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। এই লংমার্চে জনসম্পৃক্ততা নয়, বরং দামি দামি গাড়ির বহর লক্ষ করা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে দেশে যখন জ্বালানি সংকট চলছে, তখন বিরোধী দল জ্বালানি হাওয়ায় উড়িয়েছে। তাদের এ ধরনের কর্মসূচি মোটেও প্রত্যাশিত নয়।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘বিরোধী দলেরও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। অথচ তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো। তাছাড়া তারা বক্তব্য দিয়েছে ডিসেম্বরের মধ্যেই সরকারের পতন ঘটাবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটা সরকারের ছয় মাস না যেতেই বিরোধী দলের এমন বক্তব্য কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত। তাদের মনে রাখা উচিত, বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের মতো জনবিচ্ছিন্ন নয়। বিএনপি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তাই বিরোধী দলের উদ্দেশে একটা কথা বলবো, আপনাদের বক্তব্য মার্জিতভাবে দেবেন। নয়তো আমরা যেকোনও অপশক্তিকে মোকাবিলায় প্রস্তুত।’’

১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন, জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘‘লংমার্চের নামে শত শত গাড়ি দিয়ে একদিনের এমন সফর এর আগে কখনও দেখা যায়নি। এটা লংমার্চের নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। বিগত সময়েও বিভিন্ন দাবিতে লংমার্চ হয়েছে। সেসব দেখলে জামায়াতের এই লংমার্চকে খুবই হাস্যকর মনে হবে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকার গঠনের পর থেকেই বিরোধী দল মারমুখী অবস্থান থেকে কর্মসূচি করছে। তারা কেবল মিডিয়ার আলোচনায় থাকতে চায়। বিরোধী দলের সত্যিকার অর্থে যে ভূমিকা, তারা সেটি পালনে ব্যর্থ।’’ তিনি বলেন, ‘‘বিরোধী দল হিসেবে বিভিন্ন সংকট ও সমস্যায় সরকারকে বিকল্প পন্থা দেখানো উচিত। যেটা অন্য আরও যেসব রাজনৈতিক দল আছে, বা বাম দল যেটা করছে, সেরকম কিছু করা দরকার। কিন্তু বর্তমান বিরোধী দল তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ দিয়ে আসছে।’’