সরিয়ে না দিলে ভোটে থাকবো: প্রধানমন্ত্রীকে ড. কামাল

সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল হোসেনজাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘নির্বাচন থেকে সরিয়ে না দিলে শেষ পর্যন্ত আমরা নির্বাচনে থাকবো।’ ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে ভোটের মাঝপথে মাঠ থেকে সরে যেতে পারে, প্রধানমন্ত্রীর এমন আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় নির্বাচন পূর্ববর্তী নানা প্রসঙ্গ নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে ঐক্যফ্রন্টের অবস্থান তুলে ধরেন ড. কামাল হোসেন।

শনিবার (২৯ ডিসেম্বর) বিকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের প্রসঙ্গে কামাল হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি বহুবার বলেছি। আবারও পরিষ্কারভাবে বলছি, তারা সরিয়ে না দিলে আমরা নিজে ভোট থেকে সরে যাবো না।’

ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে– প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই।’ এ সময় পাশে থাকা বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘তিনি আমাদের নেত্রী নন। তার কথায় কিছু যায় আসে না।’

বিদেশি গণমাধ্যমকে আপনি বলেছেন, জামায়াতকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হবে জানলে আপনি ঐক্যফ্রন্টে যেতেন না। তফসিল ঘোষণার পরে আপনি কোনও প্রচারণায়ও যাননি। এতে কি প্রমাণ হয় না আপনাদের মধ্যে বিভেদ রয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেন, ‘এতে প্রমাণ হয় না আমাদের মধ্যে বিভেদ আছে। আমাদের মধ্যে বিভেদের কোনও প্রশ্নই আসে না। আমাদের মধ্যে ঐক্য আরও মজবুত হয়েছে।’

মানুষ ভোট দিতে পারলে কি ঐক্যফ্রন্ট বিজয়ী হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে এই সংবিধান প্রণেতা বলেন, “কোনও দুই নম্বরি না হলে ঐক্যফ্রন্ট বিজয়ী হবে। কারণ, আপনারা রাস্তায় গিয়ে মানুষকে জিজ্ঞাসা করুন, তারা খুব জোর দিয়ে বলবে, ‘আমরা পরিবর্তন চাই।’ এতে প্রমাণ হয় মানুষ ভোট দিতে পারলে আমরা জয়ী হবো।”

তার নিরাপত্তা নিয়ে কোনও শঙ্কা আছে কিনা জানতে চাইলে ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক বলেন, ‘আমি সারা জীবনে নিরাপত্তার জন্য পুলিশ চাইনি। আমি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কাও দেখছি না। তবে দেশে যেসব ঘটনা ঘটছে, তাতে স্বাভাবিকভাবে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থাকতেই পারে।

বিএনপি নেতাদের ফোনালাপ ফাঁস প্রসঙ্গে চানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমাদের দুই নেতা কথা বলেছেন, সেটা ফাঁস হয়ে গেল। আপনার বউয়ের সঙ্গে কী বলছেন, সেটাও হয়তো কয়েক দিন পরে ফাঁস হয়ে যাবে। দুই নেতার ফোনের কথাগুলো খেয়াল করলে দেখবেন তারা ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বলেছেন। মওদুদ আহমদ ও তার স্ত্রীর কাছে ওবায়দুল কাদের নির্বাচনে কয়েকবার পরাজিত হয়েছেন। এখন তিনি মওদুদ আহমদকে ঘর থেকেও বের হতে দিচ্ছেন না। এই ক্ষোভের কথা তাদের ফোনালাপে দেখা গেছে।’

তিনি আরও বলেন, দেখুন, ‘তারা দুজন কিন্তু নির্বাচন থেকে সরে যাননি এবং যাবেনও না।’

লিখিত বক্তব্যে আগামীকালের ভোট প্রসঙ্গে ড. কামাল বলেন, 'রাত পোহালেই ভোট। দেশে এখন উৎসবের আবহ থাকার কথা। কিন্তু মানুষের মনে এখনো সংশয়-সন্দেহ। এ সংশয় দূর করা খুবই জরুরি। আমি ভোটারদের অনুরোধ করবো, আপনারা সকাল সকাল কেন্দ্রে যান। ভোট দিন। আপনারা ভয় পাবেন না। আপনারা ভোটকেন্দ্রে গেলে দুর্বৃত্তরাই ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে। জনগণের শক্তির সঙ্গে তারা পারবে না। ‘

তরুণ ভোটারদের উদ্দেশে ড. কামাল বলেন, “তোমরা যারা তরুণ, প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছো, তারা সময়মতো ভোট দিতে যাবে। মনে রাখবে ‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ/ যদি তুমি ঘুরে দাঁড়াও, তবেই বাংলাদেশ’।”

প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের উদ্দেশে ড. কামাল বলেন, 'প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারসহ যারা ভোটগ্রহণের দায়িত্বে আছেন আপনারা সম্মানিত মানুষ। আপনার ওপর যে দায়িত্ব তা সততার সঙ্গে পালন করলে আপনাদের সম্মান বাড়বে। ভোটারের মুখের হাসির ওপরই নির্ভর করছে আপনাদের দায়িত্ব পালনের সফলতা ও তৃপ্তি।

সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার, ভিডিপি, টিডিপি, কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে জড়িতদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক বলেন, ‘আপনারা অতীতের মতো গৌরবময় ভূমিকা পালন করুন। বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষায় আপনাদের ভূমিকা প্রশংসিত হচ্ছে। সেই প্রশংসার ফলে সারা বিশ্বে আপনাদের সুযোগ বেড়েছে। কোনও অবস্থাতেই যাতে তা ব্যাহত না হয়, সে ব্যাপারে আপনারা সতর্ক থাকবেন।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন, এর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার– আপনারা জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করুন। যদি কারও অধিকার হরণ করেন তাহলে মনে রাখবেন, অন্য কেউ আপনার মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তানের অধিকার হরণ করবে। এটা করলে জনগণ, ইতিহাস, আইন আপনাদের ক্ষমা করবে না।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা কোনও দলের নয়, জনগণের সেবক। জনগণ দেশের মালিক। দেশের মালিকদের তাদের ভোটের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করবেন না। কোনও অন্যায় নির্দেশ মানবেন না।’

প্রবাসীদের উদ্দেশে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘প্রবাসী ভাইবোনেরা এবং নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের জন্য যারা ভোট দিতে পারবেন না, আপনারা স্বজনদের ভোট দিতে যেতে বলুন। তারা যদি ভোট দিতে পারেন তাহলে সেই আনন্দের অংশীদার আপনারাও হবেন।’

লিখিত বক্তব্যে সর্বশেষ তিনি জনতাকে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আসুন আমরা ভোট দিই। আপনার ভোট খুবই মূল্যবান। কেননা, আপনি দেশের মালিক।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু, কেন্দ্রীয় নেতা জগলুল হায়দার আফ্রিক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।