সিরাজুল আলম খানের ৮১তম জন্মদিন উদযাপিত

পাঠ্যবইয়ে জীবনী অন্তর্ভুক্ত করার দাবি বিশিষ্টজনদের

‘সিরাজুল আলম খান দাদা যদি জন্ম না নিতেন, তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হতো কিনা, এ নিয়ে সন্দিহান’ লেখক চিন্তক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘ তিনি যদি সত্যি সত্যি জন্ম না নিতেন, তাহলে ৭১ এ স্বাধীনতা হতো কিনা, তা নিয়ে আমি সন্দিহান।’

বৃহস্পতিবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে আয়োজিত সিরাজুল আলম খানের ৮১তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। ছোটভাইয়ের মেয়ে ব্যারিস্টার ফারাহ খান আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সিরাজুল আলম খান  যোগ দেননি। তার অনুপস্থিতিতেই রাজনীতিক ও বিশিষ্টজনেরা কেক কাটেন। বিকাল ৫টার দিকে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে সন্ধ্যায় সোয়া ৭টায় শেষ হয়।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, ‘সিরাজুল আলম খান রাজনীতির প্রতি মানুষকে আকর্ষণ করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যতগুলো আন্দোলন হয়েছে, প্রত্যেকটি আন্দোলনের সময় সাইকেলে ঘুরে-ঘুরে আন্দোলন সংগঠিত করেছেন। তার রাজনীতির ইতিহাস ছাত্রদের পড়ানো উচিত। তা না- হলে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ কমে যাবে।’

আলোচনায় লেখক-চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, ‘আগামী দিনে বাংলাদেশে নতুন রাজনীতির ইতিহাস তৈরি হবে।’

উপস্থিত তরুণ রাজনীতিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা নির্বাচন নিয়ে চিন্তা করবেন না। নির্বাচন করবে আমেরিকা, ইউরোপ। আগামী দিনের রাজনীতি কী হবে, তা ঠিক করতে হবে।’

সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক অবদান ইউনিক ও অনবদ্য উল্লেখ করে ফরহাদ মজহারের মন্তব্য— গণআন্দোলন কীভাবে সংগঠিত করতে হয়, তা তার কাছ থেকে শিক্ষণীয়।

একাত্তরের পর সিরাজুল আলম খানের বড় কাজ হচ্ছে ডিসেন্ট্রাইলাইজেশন উল্লেখ করে মজহার বলেন, ‘ডিসেন্ট্রালাইজেশনের জন্য ভূমিকা রেখেছেন সিরাজুল আলম খান।’ এসময় তিনি বলেন, ‘তত্ত্বগত ঐক্য দিয়ে হবে না। প্রোগ্রামভিত্তিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।’ এজন্য তিনি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেন।

আলোচনার একপর্যায়ে সিরাজুল আলম খানের ওপর মহিউদ্দিন আহমেদ রচিত ‘প্রতিনায়ক’ গ্রন্থটি নিয়ে কথা বলেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘প্রতিনায়ক কথাটা আমি পছন্দ করিনি। যারা সিরাজুল আলম খানকে এভাবে হাজির করেন, তখন মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করা হয়। অন্যায় হয়েছে কাজটা।’

নিজের রাজনীতির ‘মেন্টর’ উল্লেখ করে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘সিরাজুল আলম খান মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রাজনীতি করেননি। তিনি স্বাধীনতার ইতিহাস লিখলে মহাকাব্য হতো।’

‘১৯৭২ এর পর যারা সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, কার মদদে তিনি রাজনীতির পথ বদলেছিলেন। আমার প্রশ্ন, দিনের বেলায় ভোটের বদলে রাতের বেলায় করা কার মদদে হচ্ছে। দেশ স্বাধীন করার পর যা করেছেন, আজকেও আপনারা তাই করছেন।’ বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘ছাত্রজীবনে সিরাজ ভাই আমার নেতা।’ তিনি সিরাজুল আলম খানের মাধ্যমে উৎসাহিত, অনুপ্রাণিত বলেও উল্লেখ করেন অধ্যাপক মজুমদার। তিনি জানান, সিরাজুল আলম খানের সান্নিধ্যে এসেই চিন্তাশীল হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাধীনতায় সিরাজুল আলম খানের অবদান অস্বীকার করা মানে বাংলাদেশকে অস্বীকার করার সমান।’

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি তার আলোচনার একপর্যায়ে উল্লেখ করেন, ১৯৬৪-৬৫’র দিকে  স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গটি যখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আসে, এর নেপথ্যে বিশেষত তরুণদের সংগঠিত করার  ক্ষেত্রে সিরাজুল আলম খান অগ্রভাবে ছিলেন।’ জাতীয়তাবাদের যে ধারার নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ দিয়েছিল, তারমধ্যে গণমানুষের মুক্তির স্বপ্নের যে ধারা, এ ধারা সমাজ থেকে উত্থিত, সেই ধারা আওয়ামী লীগের মধ্যেও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, সেই ধারার নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান।’

তিনি বলেন, ‘সিরাজুল আলম খান বাংলাদেশে আগামী দিনের যে মুক্তির সংগ্রাম, মানুষের মুক্তির সংগ্রামে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবেন।’

অনুষ্ঠানে রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আবদুর রব, হাসানুল হক ইনু, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তারা আসেননি। তবে কোনও কোনও নেতা ফুল পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য— আবদুল মালেক রতন, ফরিদা আখতার, খালেকুজ্জামান, হুমায়ুন কবির হিরু, আবু সাঈদ খান, সিরাজ মিয়া, নুরুল হক নুর, ফেরদৌস আলম খান প্রমুখ।