ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীর তেজগাঁও, হাতিরঝিল ও শেরেবাংলা নগর এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থীর লড়াই হচ্ছে। ১৫ জন প্রার্থী এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিন ‘সাইফুল’। নামের এই মিলের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমীকরণও এখানে বেশ জটিল হয়ে উঠেছে।
বিএনপির বিভক্তি ও বিদ্রোহী প্রার্থী
এই আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। তবে জোটগত সমঝোতায় আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তিনি এখন ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনি মাঠে আছেন। এর ফলে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলেও মাঠ পর্যায়ে দলটির বড় একটি অংশ তার পাশেই রয়েছেন।
এই আসনের ভোটার কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী কাওছার আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা বিএনপি সমর্থক হওয়া সত্ত্বেও কাকে ভোট দেবো তা নিয়ে দ্বিধায় আছি। একদিকে দল সমর্থিত জোটের প্রার্থী সাইফুল হক, অন্যদিকে বিপদে পাশে থাকা সাইফুল আলম নীরব। মাঝখান দিয়ে জামায়াতের প্রচারণা বেশ জমজমাট দেখা যাচ্ছে।”
জোটের প্রার্থীর চ্যালেঞ্জ
বিএনপি নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এখানে ধানের শীষের সমর্থনে লড়াই করছেন। নির্বাচনি আইনের কারণে তিনি নিজের দলীয় প্রতীক ‘কোদাল’ নিয়ে মাঠে নামলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় সমর্থন তার দিকে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় সাইফুল হক কিছুটা নাজুক ও অস্বস্তিকর অবস্থায় রয়েছেন।
তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার দোকানদার ও ঢাকা ১২ আসনের ভোটার রাব্বি মিয়া বলেন, “এটা আসলে নীরব ভাইয়ের এলাকা। প্রথমে ওনার নাম ঘোষণার পর এলাকা খুব জমজমাট হয়ে ছিল। কিন্তু জোটের প্রার্থী আসায় এখন সবাই চুপচাপ হয়ে গেছে। ভোট ভাগ হয়েছে দুই প্রার্থীর মাঝে।” এই বিভক্তির কারণে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলেও ফুটবল প্রতীকের নীরবকে হারানো কোনওভাবেই সহজ হবে না বলেও তিনি জানান।
গত এক সপ্তাহের নির্বাচনি প্রচারণার বিষয়ে রাব্বি মিয়া আরও বলেন, “বিএনপি নেতাকর্মীরা ভাগাভাগি হয়ে জোটের প্রার্থীর কোদাল আর বিদ্রোহী ফুটবলের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। তাদের কারও স্লোগান, ‘ধানের শীষের পক্ষ নিন, কোদাল মার্কায় ভোট দিন’ আবার কেউবা বলছেন, ‘ফুটবল, ফুটবল’।
ফুরফুরে মেজাজে জামায়াত প্রার্থী
অন্যদিকে ১০ দলীয় জোট তথা ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ মনোনীত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন বেশ ফুরফুরে মেজাজে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তার নির্বাচনি প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’। বিএনপির ভোট ভাগাভাগির সুযোগে তিনি এই আসনে জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন এবং নিবিড়ভাবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে হাতিরঝিলের বাসিন্দা কামাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এখানে ধানের শীষের ভোটারদের বিভক্তির মধ্যে দ্বিধায় পড়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের কেউ জোটের সাইফুলের পক্ষে আবার কেউ বহিষ্কৃত নেতা সাইফুলের পক্ষে। মাঝখান দিয়ে দশদলের সমর্থনে দাঁড়িপাল্লার সাইফুল এগিয়ে আছেন।”
ভোটারদের কণ্ঠে ‘সাইফুল’ বিভ্রান্তি
সরেজমিনে তেজগাঁও ও কাওরান বাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারদের মধ্যে নাম নিয়ে বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে। তেজগাঁওয়ের বাসিন্দা নাসিম শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সবাই এসে বলে ‘সাইফুল ভাইকে’ ভোট দিয়েন। আমাদের আবার জিজ্ঞেস করতে হয়— কোন সাইফুল? ফুটবলের সাইফুল ভাই না কি কোদালের সাইফুল ভাই? সবার মুখে সাইফুল ভাই, কিন্তু কোন সাইফুল তা আবার ক্লিয়ার করে জানতে হয়।”
এই আসনের ভোটার কাওরান বাজারের আরেক ব্যবসায়ী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “দফায় দফায় মিছিল হয়, আমার ভাই, তোমার ভাই— সাইফুল ভাই, সাইফুল ভাই। আমরা আগ্রহ নিয়ে দেখি, কোন সাইফুলের মিছিল হচ্ছে। এই আসনে তিন সাইফুলের কারণে সবার একটু বেশি ইন্টারেস্ট থাকে— কখন কোন সাইফুল আসে, কোন সাইফুল যায়।”
আরও যারা প্রার্থী
এই আসন থেকেই নির্বাচনি মাঠে লড়াই করছেন আমজনতার দলের মো. তারেক রহমানও। নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় তিনিও বেশ সক্রিয়।
আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণসংহতি আন্দোলনের নেত্রী তাসলিমা আখতার (মাথাল), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কল্লোল বণিক (কাস্তে), জাতীয় পার্টির সরকার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন (লাঙ্গল) এবং ইসলামী আন্দোলনের মাহমুদুল হাসান (হাতপাখা)।
এছাড়াও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মাদ শাহজালাল (মোমবাতি), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) মোমিনুল আমিন (সিংহ), জনতার দলের ফরিদ আহমেদ (কলম), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোছা. সালমা আক্তার (আপেল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) মুনতাসির মাহমুদ (ছড়ি), গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) আবুল বাশার চৌধুরী (ট্রাক), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি মোহাম্মদ নাঈম হাসান (কাঠাল) মার্কা নিয়ে ঢাকা-১২ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ঢাকা-১২ আসনের ভোটার পরিসংখ্যান
উল্লেখ্য, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ছয়টি ওয়ার্ড— ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩৫ এবং ৩৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসন। এই আসনের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৩ হাজার ৩৪৩ জন, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৬২ হাজার ৫৪৩ জন, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৪৬ হাজার ৭৩০ জন, ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে ৫৮ হাজার ৫১৯ জন, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৫৫ হাজার ৭৯২ জন এবং ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে ৪৬ হাজার ২১১ জন ভোটার রয়েছেন।
স্থানীয় ভোটার ও সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এই আসনে ধানের শীষের সমর্থকদের ভোট বিভক্তিই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।