হামলাকারীরা ছিলেন সংঘবদ্ধ। সামনে রাজনৈতিক নেতাকর্মী। পাশেই পুলিশ। তবু থামেনি হামলা। নিরাপত্তার আশায় রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় ঢুকেও রক্ষা পাননি বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকরা। সার্কিট হাউসের ভেতরে ঢুকে গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা। অথচ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি—এমন অভিযোগ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)।
হবিগঞ্জের এই ঘটনা তাই নিছক রাজনৈতিক সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে সংঘবদ্ধ মব তৈরি এবং পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রেখে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে ভয় দেখানো বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হচ্ছে কিনা—সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এনসিপির অভিযোগ, সরকারি দলের নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা করেছেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকলেও হামলাকারীদের নিবৃত্ত করেনি। বরং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। বিরোধী দলের কর্মসূচি ও নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে হামলাকারীদের সামনে নীরব থাকা কার্যত তাদের সুরক্ষা দেওয়ার শামিল বলেও মনে করছেন দলটির নেতারা।
পুলিশ সদর দফতর বলছে, পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা হয়ে থাকলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ সারজিস
গত ২৮ জুলাই বিকালে হবিগঞ্জের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের গাড়িবহরে হামলা হয়। এনসিপির ভাষ্য, ছাত্রদলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা এ হামলা চালান।
হামলার মুখে সারজিস আলম কাছের সোনালী ব্যাংকের কার্যালয়ে আশ্রয় নেন। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়।
কিন্তু সেখানেও উত্তেজনা থামেনি। এনসিপির মিডিয়া টিমকে বহনকারী একটি মাইক্রোবাস সার্কিট হাউসে প্রবেশ করলে হামলাকারীরাও ভেতরে ঢুকে পড়েন। তারা গাড়িটি ভাঙচুর করেন। সাংবাদিক ও মিডিয়া টিমের সদস্যদের মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ভেতরে ঢুকে এমন হামলা নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। পুলিশ উপস্থিত থাকার পরও হামলাকারীরা কীভাবে সার্কিট হাউসে ঢুকলেন এবং কেন কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি, তার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে এনসিপি।
মব তৈরি করে দমনের অভিযোগ
এনসিপি নেতাদের ভাষ্য, হামলার সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা কোনও বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়; বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে মাঠে চাপে রাখার বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। সরাসরি প্রশাসনিক ব্যবস্থা ব্যবহার না করে দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে মব তৈরি করা হচ্ছে। পুলিশ সেই মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
তাদের অভিযোগ, এভাবে বিরোধী দলের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করা, নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম সীমিত করার চেষ্টা চলছে।
তবে সরকারি দল বিএনপি হামলার সঙ্গে দলীয়ভাবে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিএনপি কোনও হামলাকেই সমর্থন করে না। আমাদের দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সব সময় সহনশীলতার রাজনীতির কথা বলে আসছেন। তারপরও হবিগঞ্জের ঘটনায় কারা জড়িত, তা স্থানীয় প্রশাসন তদন্ত করে দেখবে।”
পুলিশ যা বলছে
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “পুলিশের উপস্থিতিতে যদি এমন হামলা হয়ে থাকে, তাহলে তা ঠিক হয়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে হবে। দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পুলিশ হামলাকারীদের বদলে এনসিপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করেছে—এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “পুলিশ জনগণের জানমালের সুরক্ষায় দায়িত্ব পালন করছে। কোথাও হামলা হলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করবে। এ বিষয়ে সদর দফতর থেকে বারবার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
তবে কোনও কোনও ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ জনতার উন্মত্ততা তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, “এ কারণে এনসিপি নেতাদের এমনটি মনে হয়ে থাকতে পারে। এরপরও পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখা হবে।”
পরিসংখ্যানে অব্যাহত মব সহিংসতা
সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে আসার দাবি করা হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরছে। রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা ও গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতার ২৬১টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হয়েছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে একই সময়ে মব সহিংসতায় ১১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩৮ জন, চট্টগ্রামে ২৭ জন, খুলনায় ১৫ জন, রাজশাহীতে ১২ জন, বরিশালে ১০ জন, ময়মনসিংহে সাতজন এবং রংপুর বিভাগে চারজন নিহত হয়েছেন।
দুই সংগঠনের হিসাবে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—মব সহিংসতা থামেনি। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই হতাহতের ঘটনা ঘটছে। আবার কোথাও পুলিশের উপস্থিতিতেও সংঘবদ্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। হবিগঞ্জের ঘটনা দ্বিতীয় ধরনের ব্যর্থতার অভিযোগকে সামনে এনেছে।
নিষ্ক্রিয়তা বাড়ায় হামলাকারীদের সাহস
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামলাকারীরা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ছাড় পেলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হবে। এতে আইনের শাসন দুর্বল হবে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও অনলাইন গুজবকে মব সহিংসতার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছেন তারা। তাদের মতে, শুধু মামলা করলেই হবে না। পুলিশ কেন আগাম তথ্য পায়নি, উপস্থিত থাকার পরও কেন হামলা ঠেকাতে পারেনি এবং হামলাকারীরা রাজনৈতিক প্রশ্রয় পেয়েছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মব ভায়োলেন্স কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে সহিংসতা আরও বাড়বে।”
মব সহিংসতা বন্ধে জনসচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, মানুষ আইন মেনে চললে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে। প্রতিটি ঘটনার পর মামলা, তদন্ত ও দোষীদের গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হবিগঞ্জের ঘটনায় শুধু হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্ত করলেই হবে না। দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা, সার্কিট হাউসের নিরাপত্তাবলয় ভাঙার কারণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হয়েছে কিনা—তাও তদন্তে আনতে হবে। অন্যথায় দলীয় মব তৈরি করে পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রেখে বিরোধী শক্তি দমনের অভিযোগ আরও জোরালো হবে।