বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে—এমন খবরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রপক্ষসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন বিবৃতি ও বিক্ষোভের মাধ্যমে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে।
তবে বিষয়টিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের সমালোচনার মুখে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও একে অপতথ্য হিসেবে উল্লেখ করে এ বিষয়ে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বর্তমানে এনটিআরসিএর সুপারিশ ছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ নেই। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে শূন্য পদের বিপরীতে নিবন্ধনধারীদের নিয়োগের সুপারিশ করে আসছে সংস্থাটি।
গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভার কার্যবিবরণীতে এনটিআরসিএ আর এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে না বলে সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়। একই সভায় ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জনকে তাদের পছন্দ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও বলা হয়।
তবে ১০ আগস্ট রাতে শিক্ষামন্ত্রীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে জানানো হয়, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ক্ষুব্ধ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি গতকাল সোমবার (১০ আগস্ট) দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। একই রাতে এক বিবৃতিতে ম্যানেজিং কমিটির পরিবর্তে এনটিআরসিএকেই শিক্ষক নিয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
‘কোটার চেয়ে বড় ক্যান্সার হবে ম্যানেজিং কমিটির নিয়োগ’
এনটিআরসিএর পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি নাজমুল হাসান। তিনি বলেছেন, শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা বাড়ানো হলে আবারও স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। ‘আমরা কোনোভাবেই এই ক্যান্সার ছাত্রসমাজের ওপর চাপিয়ে দিতে দেব না।’
ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বলেন, ‘কোটার চেয়ে বড় একটি ক্যান্সার হচ্ছে এনটিআরসির পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া। ২০১৫ সাল থেকে এনটিআরসির মাধ্যমে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিকভাবে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হচ্ছে। হঠাৎ করে এই প্রক্রিয়া পরিবর্তনের উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সভার প্রসঙ্গ তুলে নাজমুল হাসান বলেন, ‘গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল খালেকের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এনটিআরসি শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজে থাকবে এবং শিক্ষক নিয়োগে আর সুপারিশ করবে না। গতকাল শিক্ষামন্ত্রীর যে বক্তব্য আমরা শুনেছি, সেটি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। একটি সিদ্ধান্ত হওয়ার পর সেটিকে অস্বীকার করা জনগণের সঙ্গে দ্বিমুখী আচরণের শামিল। আমরা এই আচরণের নিন্দা জানাই।’
একইসঙ্গে ৩ আগস্টের ওই সভার সিদ্ধান্ত কীভাবে হলো এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত—তা খতিয়ে দেখে তদন্তের দাবি জানান নাজমুল।
‘ম্যানেজিং কমিটির হাতে মানেই ঘুষ-বাণিজ্যের পুনরুত্থান’
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা পুনরায় ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আকিব হাসান বলেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের যে প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা বাতিল করে পুনরায় ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মেধার মূল্যায়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে ঘুষ, তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির বাণিজ্য পুনরায় ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে স্পষ্ট প্রতারণা।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ মনে করে, শিক্ষক নিয়োগ কোনো ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন। একজন অযোগ্য ব্যক্তি অর্থ বা প্রভাবের মাধ্যমে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার কাছে শিক্ষা নেওয়া অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ক্ষতির বোঝা একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম বহন করতে বাধ্য হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, শিক্ষাকে দুর্নীতির বাজারে পরিণত করার যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ রাজপথে ও জনপরিসরে সোচ্চার থাকবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে আপস করে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে না। মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ চাই, ঘুষ-তদবিরের নিয়োগ নয়। শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আপস নয়।’
‘ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা পুনরায় স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাব্য আত্মঘাতী ও নীতিবিবর্জিত সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
তাদের মতে, দেশের শিক্ষাখাত যখন নানাবিধ সংকটে জর্জরিত, তখন নিয়োগ প্রক্রিয়াকে পুনরায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাতে সোপর্দ করার এই উদ্যোগ শিক্ষা ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার শামিল।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ বলেন, মূর্খ ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের সিদ্ধান্ত চাকরিপ্রার্থীদের জিম্মি করে ঘুষ নেওয়ার পথ খুলে দেবে, যা তরুণ প্রজন্মের স্বার্থবিরোধী।
তিনি আরও বলেন, ‘টেম্পুস্ট্যান্ড থেকে বিদ্যুৎ সব জায়গায় খাওয়ার বন্দোবস্ত শেষ করেছেন। এখন আমাদের ভবিষ্যৎ খেতে চান? অনতিবিলম্বে সরকারকে এনটিআরসি-এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীবিরোধী কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। অন্যথায়, আমরা ছাত্রদের নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলব।’
একইসঙ্গে অবিলম্বে এই আত্মঘাতী ও নীতিবিবর্জিত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষাখাত জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই খাতে এমন কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হবে না, যা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও মেধার অবমূল্যায়নের পথ উন্মুক্ত করে। শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থে সরকারকে অবশ্যই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে।’
‘গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার নয়’
এনটিআরসিএ নিয়ে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার অনুরোধ জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছিল, তখন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা এ বিষয়ে সরব হন। একপর্যায়ে গতকাল রাতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির সবাইকে গুজবনির্ভর অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নাছির উদ্দিন নাছির লিখেছেন, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) ২০০৫ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এনটিআরসিএর কার্যক্রম এবং শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন বিষয়ে পর্যালোচনা অব্যাহত রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রদানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। তাই এ সংক্রান্ত কোনো অপতথ্য, গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।