কোন প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় লিঙ্গের কর্মী নিয়োগ করা হলে নিয়োগকারীকে কর রেয়াতের সুবিধা দেয়া হবে- আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এমন প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এমন প্রস্তাবনার জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইনটিন। অর্থমন্ত্রীর এই প্রস্তাব সমাজে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূলধারায় আনতে সহায়তা করবে এবং দেশের উন্নয়নে তারা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে সংস্থাটি।
রবিবার (৬ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক ফারুখ ফয়সল বলেন, ২০২১-২০২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছে- যদি কোনও প্রতিষ্ঠান তার মোট কর্মচারীর ১০ শতাংশ বা ১০০ জনের বেশি তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়, তবে ওই কর্মচারীদের পরিশোধিত বেতনের ৭৫ শতাংশ বা প্রদেয় করের ৫ শতাংশ, যেটি কম, তা নিয়োগকারীকে কর রেয়াত হিসেবে প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় বিধান সংযোজন করা হবে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে নেওয়া এই পদক্ষেপের ফলে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাধিত হবে। প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠী দেশের উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার পাশাপাশি তাদের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটবে।
সরকারি হিসাব মতে দেশে হিজড়ার সংখ্যা ১০ হাজার। তবে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতে এ সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ উল্লেখ করে ফারুখ ফয়সল বলেন, সরকার তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর বৈষম্য দূর করতে ও সমাজের মূলধারায় তাদের সম্পৃক্ত করাতে ২০১৩ সালে নভেম্বরে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৪ সালে ২৬ জানুয়ারি হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। সরকারিভাবে ৫০ ও ৫০ ঊর্ধ্ব বয়সী হিজড়াদের জন্য মাসিক ভাতা প্রদান, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি প্রভৃতি উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের মূল স্রোতধারায় আনার চেষ্টা করছে। তবে তা সকল কাঙ্খিত জনগোষ্ঠীর নিকট পৌঁছায়নি। ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব এখনও বিদ্যমান। তাদের অধিকার ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এই জনগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি সাধারণ মানুষের অবহেলা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং বৈষম্য লক্ষ্যণীয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার বলে মনে করেন ফারুখ ফয়সল। তবে পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি তিনি। কেননা একাডেমিক কোয়ালিফিকেশন তাদের জীবিকার ক্ষেত্রে, সুস্থ কর্ম বা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতা সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে চাকরির ক্ষেত্রে তাদের জীবন-জীবিকা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে চলে সে বিষয়টি তদারকি করতে হবে এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। চাকরিতে যোগদানের পর তারা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হলে সমাজের চোখে এই জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আরও একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এই প্রস্তাব প্রশংসার দাবি রাখলেও এটি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি দয়া বা অনুকম্পা নয় বলে মনে করে ফারুখ ফয়সল। তিনি বলেন, এটি তাদের ন্যয়সঙ্গত অধিকার। যা দেরিতে হলেও সরকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে এই উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসাবে তাদের শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল ক্ষেত্রে বাড়তি নজর দিতে হবে, যাতে তারা ক্রমান্বয়ে সক্ষমতা অর্জন করে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হবেন। সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।