চার বছর পেরিয়ে বাংলা ট্রিবিউন

সামান্য ক্রিকেট কথা

জালাল আহমেদ চৌধুরীবাংলাদেশের ক্রিকেট গানে এখন কেবলই আরোহী সুর। সদ্য আমাদের টেস্ট র‌্যাংকিং আটে পৌঁছেছে। এক দিবসী পর্যায়ে তো আরেকটু এগিয়ে। বাকি যেটা বিশ-বিশ, সেটা আমরা তেমন একটা চর্চা করি না বলেই সামান্য তলানিতে থাকাটা তেমন ধর্তব্য নয়। সরল কথায় আমরা উঠছি। সামান্য ত্রিশ বছর সময় আমাদের বিশ্ব বলয়ে কুলীন স্বীকৃতির। এর মধ্যে বাংলাদেশের ক্রিকেট যতটা এগিয়েছে, তাকে উল্লেখযোগ্য অগ্রযাত্রার মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করার কোনও কারণ দেখি না।


অবশ্য সামান্য পুলক নিয়ে যে এসব কথা বলছি, এর উপলক্ষ শুধু ওই টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে একটু এগোনো নয়। আমাদের প্রারম্ভিক বিবর্ণ চেহারাটা মনে পড়লে বর্তমান শাণিত মুখাবয়বকে একটু সমীহ জাগানো মনে হয় যে! ইংরেজি ‘মিনোস’ শব্দটার যথার্থ বাংলা একশব্দে প্রকাশ কষ্টকর মনে হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও হীনবল, ধর্তব্য নয় বা দুধভাত ইত্যাকার ভাবাতে শব্দটা ব্যবহৃত হয়। তা ওই শব্দে আমাদের চিহ্নিত করেছে বিশ্ব ক্রিকেটের রাঘববোয়ালরা বহুদিন। আমাদের স্বপ্নাতুর কালে শব্দটা অত্যন্ত কর্কশ ও অপমানকর হিসেবে বাজতো। আমাদের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের বরেণ্যরা অনেক শ্লেষাত্মক কথা বলে শ্রোতাদের বিনোদিত করেছেন। আমাদের স্পর্শকাতর চামড়া পুড়িয়েছেন। এখন তারা আর সে সব কথা বলেন না। শুধু ‘বলেন না বললে’ ভুল হবে। বাস্তবতার খাতিরে ধীরে ধীরে সত্য উচ্চারণে ব্রত হয়েছেন। এখন একটু গলা খুলেই স্বীকার করেন, বাংলাদেশ একটা সমীহ জাগানো দল। তবে এখনও একটু কিন্তু রাখেন, বলেন ঘরের মাঠে এবং প্রশংসার মাত্রাটা ওয়ানডেতেই বেশির ভাগ বাঁধা থাকে। এই যে বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে বিশ্বভাষ্যের সুর বদল, এটাকে র‌্যাংকিংয়ের উন্নতির চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর বলে আনন্দের মনে হয়।
এই যে সময়ের গতিকে বাগে রেখে আমাদের প্রতি বিশ্ব ক্রিকেটের ধারণা বদল, সেটা তো কারও সমবেদনাপ্রসূত নয়। আমাদের ক্রিকেটারদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানোন্নয়নের পালাবদল এটা ঘটিয়েছে। পাঠক আপনি নিবিষ্ট ক্রিকেটমনষ্ক বলেই এ পর্যন্ত পড়েছেন। আপনার কাছে এগিয়ে আসার কথা বিস্তারিত বলা মায়ের কাছে মামা বাড়ির গল্প বলার শামিল। তাই মোটা দাগে বলছি, আমরা কোনও না কোনও ফরম্যাটে পরাজিত করিনি এমন দল তো নেই। ক্রিকেটের অনিশ্চয়তার বরে নয়, ধারাবাহিকতার স্পর্শে ধন্য আমাদের এসব অর্জন। সামান্য সামান্য ভাগ্যের অপ্রসন্নতায় আরও চকচকে সাফল্য থেকে হয়েছি বঞ্চিত। আমাদের ব্যক্তি খেলোয়াড়রা দাপুটে প্রভাব রাখছে বৈশ্বিক ক্রিকেট আলোচনায়, একজন সাকিব আল হাসান বা একজন মোস্তাফিজের কথাই শুধু বলছি না।
ইতিহাস নন্দিত অধিনায়ক স্যার ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের মতো মানবিক মহানায়কদের সঙ্গে তুলনায় আমাদের মাশরাফি বিন মুর্তজা আলোচনায় আসছে। আমাদের উঠোনে স্পিন জুজুর ভয়ে কাতর বাঘা বাঘা দলগুলো। ঘরের মাঠে ফায়দা আদায়ে আমরা পারঙ্গম হয়ে উঠেছি। ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া সাফল্য অর্জনে আমরা ক্রমশই প্রভাবসঞ্চারী। আর এসব নিয়ে একটা অদৃশ্য মাইলফলকে পৌঁছানোর কথা বলার জন্যই এত আপাত অবান্তর কথা বলা।
এখন আমরা যে অবস্থানে পৌঁছেছি, সেখানে অবস্থান দৃঢ় করে আরও এগিয়ে যাওয়ার পথটা আগের চেয়ে অনেকটাই কঠিন। প্রতিপক্ষ দুর্বল হবে আর আমরা এগোবো, এমন ভাবনায় থাকাটা হবে চরম বোকামি। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, আমাদের চেয়ে যারা এগিয়ে, তারা আরও শক্তি অর্জনে তৎপর। পেছন থেকেও শক্তিমান ধাবমানতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এখন আমাদের সময় অনেক শক্ত দাবি মেটানোর মুখাপেক্ষী। কী করণীয়, তা বলার জন্য, বোঝার জন্য পেশাদার লোক আছেন। তারা বুঝবেন, করবেন। আমি এখানে সাধারণ পাবলিক, আলোচনা সূত্রে প্রাপ্ত একটি বোধের কথা বলতে চাই।
আমজনতা আমাদের ক্রিকেট পাগল। হাততালি দিতে দিতে তারা খানিকটা ক্রিকেট বোঝে। তাই টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে উন্নতির খবরে আর মিছিল বের করে না। ভাবতে বসে কী করে আগে বাড়া যাবে। সেই ভাবনার ফসল বলে একটি সহজ সরল কথা। এখন আমরা দল নির্বাচন করতে গেলে ভাবনা-চিন্তা না করেই এক নিশ্বাসে পাঁচটি নাম বলতে পারি। তাও আবার সব ফরম্যাটের জন্য নয়। টেস্ট বলেন, ওয়ানডে বলেন অথবা টি-টোয়েন্টি, উন্নতি করতে হলে সব জায়গায় ওই স্থায়ী খেলোয়াড়দের সংখ্যা সুবিবেচ্য সময়ের জন্য বাড়াতে হবে। র‌্যাংকিংয়ে উন্নতি করতে হলে ও উন্নত অবস্থান ধরে রাখতে হলে আমাদের এ রকম একটা অবস্থানের দিকে যেতে হবে।
টেস্ট র‌্যাংকিংয়ের কথাই ধরুন। এই মুহূর্তে আমরা অষ্টম অবস্থানে আছি। এহেন পরিপার্শ্বে আমরা সম্ভাব্য একাদশে কী আটজনের নাম করতে পারবো, যাদের ওপর ন্যূনতম বিবেচ্য সময়ের জন্য আস্থা রাখতে পারি! ভাবতে পারি, তাদের সবাই প্রতিপক্ষ বিচেনায় সাফল্য অভিযানে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এদের স্থলাভিষিক্ত করার কাজটা এরাই করে তুলবে সুকঠিন। এরকম প্রতিযোগী আবহ তৈরি হলে আমরা শিগগিরই এগিয়ে যাব।
এগিয়ে যাওয়ার কাজটা ক্রিকেটারদেরই করতে হবে। তবে কথা আছে। খেলোয়াড়দের তৈরি হওয়ার পরিবেশটা সংশ্লিষ্ট সবাই মিলেই করে দিতে হবে। টেস্ট ক্রিকেটে তরতরিয়ে এগিয়ে যাব অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘ পরিসরের খেলার প্রতি উদাসীন থাকব, এরকম হলে তো হবে না। ওহ, আরেকটি কথা। বিশ্ব বিজয়ী দল বা খেলোয়াড় তৈরি করতে হলে ব্যক্তি খেলোয়াড়ের প্রস্তুত হওয়ার পথটা অবশ্যই নৈতিক আলোকে উজ্জ্বল করে রাখতে হবে। আতঙ্কে ভুগে বা ক্ষমতাবানদের বিবেচনার কাঙ্গাল না হয়ে তাকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর পরিশ্রমে মেধা যেন ক্ষয় না করতে হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
আর হ্যাঁ, আমাদের পাবলিক চায় কিছু শব্দদূষণ থেকে আমাদের ক্রিকেট বেঁচে থাকুক। সবই আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট ঘিরে, বাতাসে কান পাতলে শোনা যায় ওই সব শব্দ- সরকারি দল, টার্গেট দল, অমুক ঘরানা, তমুক ঘরানা, কোপানো, রিমোট কন্ট্রোল ম্যাচ, পিকনিক ক্রিকেট ইত্যাদি। এসব শব্দ বিলুপ্ত হোক। ঘর অন্ধকার করে বাইরে আলো ছড়ানো দুরূহ। আমাদের আগামী পথ চলা শুভময় হোক।