তামিমের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নের বীজ বোনা শুরু হয়েছিল তৃতীয় শ্রেণিতে থাকতে। ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত বগুড়া জেলার হয়ে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে খেলেছেন। এরপর ২০১৭ সালে রাজশাহীর বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন। সাবেক ক্রিকেটার খালেদ মাহমুদ সুজন এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কোচ। সেখান থেকে উত্তরা ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগে অংশ নেন। এই ক্লাবের হয়ে লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ ছাড়াও খেলেছেন দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ । তবে সবকিছু ছাপিয়ে ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে ১১৩ বলে ১১৭ রানের ইনিংসের পর থেকেই আলোচনায় তিনি।
আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৫ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ থাকছে ওপেনিং ব্যাটসম্যান তানজিদ আহমেদ তামিমের একান্ত সাক্ষাৎকার−
বাংলা ট্রিবিউন: বাবা আপনাকে ক্রিকেটার হিসেবে দেখতে চাননি। তখন নিশ্চয়ই কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে আপনাকে?
তামিম: আব্বু সরকারি চাকরি করতেন। আমার পড়াশোনার কারণেই আমাদের দুই ভাই-বোনকে শহরে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে পড়ে থাকার কারণে আমার বাবা আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছিলেন। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। সারাদিন খেলাধুলা করে বাসায় ফেরার পর আব্বু অনেক বকাঝকা করে আমাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। আব্বু ভাবতেন এই খেলাধুলার কারণে আমি দুই কূলই হারাবো। এই কারণে আব্বু আমাকে বের করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোর মতো ছেলে আমার দরকার নেই। পড়াশোনার জন্য শহরে নিয়ে এসেছি, আর তুই খেলাধুলা নিয়ে পড়ে আছিস।’ তারপর যখন দেখলেন বিভাগীয় পর্যায়ে খেলে ভালো করছি, তখন থেকে ধীরে ধীরে সবকিছু ঠিক হয়ে যায়। তবে আম্মুর সমর্থন না পেলে কঠিন হয়ে যেতো ক্রিকেট খেলা।
বাংলা ট্রিবিউন: কীভাবে আপনার মা আপনাকে সমর্থন দিয়েছেন?
তামিম: আম্মুকে আমি বলতাম, ‘আম্মু দেখো খেলাটা আমার খুব ভালো লাগে।’ আম্মু তখন আস্তে আস্তে আব্বুকে বোঝান । তারপরেও আব্বু রাগত স্বরে আম্মুকে বলেছিলেন, ‘তোমার ছেলে তুমি যা বোঝো করো।’ বারবার বোঝানোর পর আব্বু রাজি হন।
বাংলা ট্রিবিউন: এ পর্য়ন্ত আপনার ক্রিকেট-জীবনের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে জানতে চাই…
তামিম: ছোট থেকেই স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হবো। আমি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে বগুড়া জেলা স্কুলে পড়ি। আমার রুমের পাশেই একটা খোলা জায়গা ছিল। ওখানে এক বড় ভাই নিয়মিত ক্রিকেট খেলতন, অনুশীলন করতেন। তাকে দেখে খুব ইচ্ছে হতো ক্রিকেট খেলার। আমি জানালা দিয়ে দেখতাম ভাইয়া কীভাবে খেলতন, ভাইয়ের নাম সজল। আমি যখন মাঠে যেতাম, সজল ভাই আমাকে শেখাতন। আসলে ওনার কাছেই আমার ক্রিকেটের হাতেখড়ি।
জেলা স্কুলে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পর ভাইয়ার সঙ্গে অনুশীলন করতে থাকি। এরপর বগুড়াতে অনূর্ধ্ব-১৪ এ ট্রায়াল হয়। প্রথমে বগুড়া জেলা দলের হয়ে খেলে বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ হয়। এভাবে বয়সভিত্তিক সব ধাপ পার হয়ে ২০১৭ সালে আমি ভর্তি হই বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট একাডেমিতে। ওখানে এক বছর কোচিং করার পর প্রথম বিভাগে উত্তরা ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে সুযোগ পাই। প্রথম বিভাগে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলাম। ১২ ম্যাচে ৬৩০-এর মতো রান করেছিলাম। এরপর চলতি বছর প্রথমবারের মতো প্রিমিয়ার লিগ খেলি, সেখানেও ভালো কাটে। সবকিছু ভালো হওয়াতেই এখন আমি বিশ্বকাপ দলে।
তামিম: শুরুটা তো হয়েছিল সজল ভাইয়ের পরামর্শে। উনি আমাকে বলতেন, ‘তুই বাঁ হাতে ব্যাট কর। বাঁ হাতে ব্যাট করলে তুই ভালো করতে পারবি, ভালো জায়গায় খেলতে পারবি।’ এর বাইরেও তামিম ভাইকে অনুসরণ করি। তার মতো পুল, কাট করতে পছন্দ করি। সব মিলিয়েই আসলে তার মতো পরিপূর্ণ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান হতে চাই।
বাংলা ট্রিবিউন: সামনেই বিশ্বকাপ, আপনার প্রস্তুতি কেমন?
তামিম: কন্ডিশন হিসাব করলে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাউন্সি উইকেটে আমাদের খেলতে হবে। আমরা ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডে খেলে এসেছি। ওই অভিজ্ঞতা আমরা এখানে কাজে লাগাতে পারবো। ওই কারণে আমি কিছুটা হলেও আত্মবিশ্বাসী। বিশেষ করে আমার ওই কন্ডিশনে ভালো সময় কেটেছে।
বাংলা ট্রিবিউন: সব মিলিয়ে দলের প্রস্তুতি কেমন?
তামিম: যেহেতু আমরা বাউন্সি উইকেটে খেলবো, তাই বগুড়ার মতো বাউন্সি উইকেটে আমরা অনুশীলন করেছি। এখন দক্ষিণ আফ্রিকাতে আছি, মূল টুর্নামেন্টের আগে যে কয়দিন পাবো নিজেদেরকে কন্ডিশনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। সবমিলিয়ে অনুশীলন অনেক ভালোভাবে হয়েছে, এখন আমাদের মাঠে প্রমাণ করার পালা।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে তো ক্রিকেটার বানানোর পরিকল্পনা ছিল না, পরিবারের কাছে জানতে চেয়েছিলেন আপনার নাম তামিম কেন?
তামিম: এটা পরিবার থেকে দেওয়া। যখন ক্রিকেট একটু একটু বুঝতে শুরু করি, তামিম ভাইকে চিনি তখন থেকে। তামিম ভাইয়ের নামের সঙ্গে আমার নামের মিল, বিষয়টা ভাবতেই ভালো লাগতো। তবে বাবা-মা এই ভেবে নাম ঠিক করেননি। এখন ভাবতে ভালো লাগে তামিম ভাইয়ের মতো আমিও বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। তিনিও ওপেন করেন, আমিও করি।
বাংলা ট্রিবিউন: ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট কোনটাকে বলবেন?
তামিম: ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে সুযোগ না পেলে আমার হয়তো ক্রিকেটার হওয়া হতো না। প্রথম বিভাগে পর পর দুটো সেঞ্চুরিই আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট।
বাংলা ট্রিবিউন: যুব বিশ্বকাপে ইয়ন মরগানের সর্বাধিক রানের (৬০৬) রেকর্ডটি সম্পর্কে জানেন নিশ্চয়ই? এরকম কোনো ইচ্ছে কি জাগে মনের মধ্যে যে, সর্বোচ্চ রান করবেন বা অন্য কোনও রেকর্ড?
তামিম: আমি ওভাবে চিন্তা করি না। আমি সব সময়ই ম্যাচ বাই ম্যাচ ভালো করার চেষ্টা করি। যদি ম্যাচ বাই ম্যাচ ভালো করতে পারি, তাহলে এমন কিছু হলেও হতে পারে।
প্রোফাইল
নাম : তানজিদ হাসান
ডাক নাম : তামিম
জন্ম: ১ ডিসেম্বর, ২০০০
জন্মস্থান : বগুড়া
উচ্চতা: ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি
পড়াশোনা: এইচএসসি
প্রথম ক্লাব: উত্তরা ক্রিকেট ক্লাব
বর্তমান ক্লাব: শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব
ব্যাটিং স্টাইল: বাঁহাতি
প্রিয় শটস: পুল, কাট
প্রিয় মানুষ: মা-বাবা
প্রিয় ক্রিকেটার: তামিম ইকবাল
প্রিয় বন্ধু: রাব্বি, ইশতিয়াক ও সাকিব
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: ইংল্যান্ডে গিয়ে পাওয়া সেঞ্চুরিটা আমার সেরা মুহূর্ত।
ছবি- সাজ্জাদ হোসেন।