নাফীসের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছে ইংল্যান্ডে ২০০৫ সালের ন্যাটওয়েস্ট ট্রফিতে। ওই টুর্নামেন্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুটো ইনিংসে দারুণ ব্যাটিং করে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছিলেন। অভিষেকে ১০ রানের ইনিংসের পরের ম্যাচেই গ্লেন ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি, জেসন গিলেস্পি, শেন ওয়াটসন, ব্র্যাড হগ ও অ্যান্ড্রু সায়মন্ডসদের নিয়ে গড়া অস্ট্রেলিয়ান বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে উপহার দেন ৪৭ রানের ইনিংস। পরে চতুর্থ ম্যাচে এই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই ক্যারিয়ারের প্রথম হাফসেঞ্চুরির দেখা পান। ইনিংসটি ছিল ৭৫ রানের। অথচ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতে নামার আগে ভয়ে খাওয়াই ভুলে গিয়েছিলেন তিনি।
করোনাকালে ক্যারিয়ার শুরুর এসব গল্পই তিনি শুনিয়েছেন নিজের ইউটিউব চ্যানেলে। ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির মাধ্যমে ফিরে গেলেন ১৫ বছর আগের স্মৃতিবহুল সেই ম্যাচগুলোতে, ‘বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে আমার অভিষেক হয় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নটিংহ্যামে। ওই ম্যাচটিতে খুব একটা ভালো করতে পারিনি, মাত্র ১০ রান করেছিলাম। আমরা বড় ব্যবধানে ম্যাচটি হেরে যাই। পরের ম্যাচ খেলার জন্য চলে যাই ম্যানচেস্টারে। আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া।’
প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হওয়ায় দল থেকে বাদ পড়ার ভয় ছিল নাফীসের। কিন্তু ডেভ হোয়াটমোরের কথায় ভয় কাটিয়ে পরের ম্যাচের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন। নাফীস আরও বলেছেন, ‘‘ডেভ হোয়াটমোর প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মিটিং করেন। আমরা কীভাবে খেলবো, আমাদের কৌশল কী হবে…।কোচ আমাদের নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি প্রথম ম্যাচ ভালো করতে পারোনি কোনও সমস্যা নেই। সামনে আমাদের আরও ম্যাচ আছে, সেখানে তুমি নির্ভার হয়ে খেলো। বাদ পড়ার কোনও চিন্তা করবে না। তোমার ওপর বিশ্বাস রাখছি।’’
ঠিকই প্রধান কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়েছিলেন নাফীস। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজের দ্বিতীয় ম্যাচে উপহার দেন ৪৭ রানের দারুণ এক ইনিংস। কিন্তু তারকা বোলারদের বিপক্ষে খেলার কথা চিন্তা করে তখন গলাই শুকিয়ে আসছিল তার। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলা। আমরা এর আগের ম্যাচেই ওদের হারিয়েছি (কার্ডিফে আশরাফুলের অতিমানবীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয়)। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়াও ফুঁসে ছিল। ম্যাচের দিন সকালে ওয়ার্মআপ করলাম, টেনশনে ওয়ার্মআপের সময় যেটা হয়েছিল, আমি প্রচণ্ড চিন্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম। আমার ভেতরটা খালি হয়ে আসছিল। কীভাবে খেলবো এরকম দলের বিপক্ষে। আবার শেষ ম্যাচ ভালো খেলিনি। প্রচণ্ড নার্ভাস ছিলাম।’
‘প্যাড আপ করলাম। আমার মনে আছে টেনশনে আমি সকালে কিছু খেতেই পারিনি। কীভাবে খেলবো এই বোলিং অ্যাটাকের বিপক্ষে…ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি, জেসন গিলেস্পিদের। নার্ভাসনেস নিয়ে আমি আর জাভেদ ভাই প্রস্তুত হলাম। প্রথম বল খেলি না দ্বিতীয় বল খেলি, সেটা ব্যাপার না। আমি আমার সঙ্গী জাভেদ ভাইকে আগে যেতে দেই। আমার ভেতরটা পুরোপুরি একদম খালি হয়ে যাচ্ছিল। এতো ভয়, এতো নার্ভাসনেস আমি অন্য কোনও ম্যাচে পাইনি’- বলেছেন শাহরিয়ার নাফীস।
ক্রিজে নামার পর নাফিস একে একে অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের কীভাবে খেলেছেন, সেসব অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে থাকেন এর পর ‘জাভেদ ভাই প্রথম বল খেললেন, পরে আমি গার্ড নিলাম। প্রথম বল ফেস করতে যাচ্ছি ব্রেট লির। টিভিতে আগে খেলা দেখেছি। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলার সে। সব বল ঘণ্টায় ৯০/মাইলের বেশি গতিতে করে। এর আগে এতো জোরে বল খেলার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। ভয় পাচ্ছিলাম খেলতে পারবো কি না, প্রথম বল খেলার পর বোলারের দিকে না তাকিয়ে বল কোথায় গেছে সেদিকে না তাকিয়ে বড় স্ক্রিনের দিকে তাকালাম। দেখি বলের গতি ওই ৯০/মাইল। তখন বুঝতে পারলাম বল তো দেখতে পারছি। পরের বল শর্ট ছিল। হাল্কা গ্লাইড করে থার্ড ম্যানে পাঠিয়ে এক রান নিলাম। রানের খাতা খুললাম। এভাবেই আমার ইনিংসটি শুরু হয়।’
ম্যাকগ্রাকে খেলার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নাফীস বলেছেন, ‘ব্রেট লিকে শেষ করার পর ম্যাকগ্রার ওভার আাসে। একদম ছোটবেলা থেকে ম্যাকগ্রার বোলিং দেখেছি। পেস ব্রেটলির মতো ছিল না। কিন্তু একদম অ্যাকুরেট বোলার। তাকেও সাহস করে খেলে ফেললাম। একটা বল খেললাম, দুইটা বল খেললাম, একটি সিঙ্গেল নিলাম। এভাবে আস্তে আস্তে কিছুটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হল।’
২৩ রানে দুই উইকেট হারিয়ে কোণঠাসা বাংলাদেশের হাল ধরেন নাফীস ও আশরাফুল জুটি। সেই মুহূর্ত নিয়ে নাফীস বলেছেন, ‘দুই উইকেট পড়ে যাওয়ার পর আসলো আশরাফুল। আমরা ছোটবেলায় ওয়াহিদ স্যারের কাছে একসঙ্গে কোচিং করেছি। আমাদের মধ্যে একটা ভালো বোঝাপড়া ছিল। দুইজন মিলে দারুণ একটি জুটি গড়ার চেষ্টা করেছিলাম।’
গিলেস্পিকে নিয়ে নাফীস বলেছেন, ‘ওর গতি ম্যাকগ্রার চেয়ে বেশি কিন্তু ব্রেট লির মতো না। তখন কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলাম। প্রথম বলেই মনে হয় থার্ড ম্যান দিয়ে চার মারি। এভাবেই খেলতে খেলতে ওই ম্যাচের সেরা শটটা পেয়ে যাই। একটা কভার ড্রাইভ করেছিলাম গিলেস্পিকে। দারুণ শটে চার হয়েছিল। ম্যাচে সেটা ছিল আমার ব্যক্তিগত পছন্দের ও সেরা শট।’
এভাবে একে একে অস্ট্রেলিয়ার সব বোলারকে খেলে একটু বেশিই আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় তার। যে কারণে অ্যান্ড্রু সাইমন্ডসকে মারতে গিয়ে নাফীসকে ফিরতে হয় সাজঘরে , ‘অ্যান্ড্রু সাইমন্ডসকে দেখে মনে হলো এতো ভালো ভালো বোলার খেলেছি। ওকে কেন-ই বা খেলতে পারবো না। একটি সিঙ্গেল নিলাম। ততক্ষণে আমার রান ৪৭-এ পৌঁছে গেছে। ৫৬ বলে ৪৭ রান। এরকম একটি পজিশনে থেকে মনে হল, এখন একটু হাত খুলে খেলা যায়। ওইটাই আসলে আমার কাল হয়ে দাঁড়ালো।’
অবশ্য এই ম্যাচে ম্যাকগ্রার করা এক ওভারে নাফীস ১০ রানও নিয়েছিলেন। ওই ওভারটিই বিশেষ কিছু হয়ে আছে নাফীসের ভাণ্ডারে, ‘সুনির্দিষ্ট করে যে ওভারটির কথা মনে থাকবে…গ্লেন ম্যাকগ্রার এক ওভারে আমি ১০ রান নিয়েছিলাম। প্রথমে একটি চার মেরেছিলাম ফ্লিক করে। স্কয়ার লেগ দিয়ে চার হয়েছিল। পরের বলটি গ্ল্যান্স করেছিলাম, ফাইন লেগ দিয়ে চার হয়েছিল। ওই ওভারে আরেকটি গ্ল্যান্স করে ফাইন লেগে পাঠিয়ে ২ রান। ১০ রান নেওয়ায় ওই ওভারটি সারাজীবন মনে থাকবে।’