একটা ছয়ই আমার জীবনের সবকিছু না: আফতাব

আফতাব আহমেদ। ১৮ জুন- এই দিনটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের স্মরণীয় একটি দিন। ২০০৫ সালের এই দিনটিতেই বিশ্বক্রিকেটে আধিপত্য বিস্তার করা অস্ট্রেলিয়াকে মাটিতে নামিয়েছিল আশরাফুল-আফতাবরা।

সেদিন কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্সে আশরাফুলের সেঞ্চুরির সুবাদে জয়ের ভিত পেয়েছিল বাংলাদেশ। পরে জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দলকে বন্দরে পৌঁছে দেয় আফতাব ও রফিকের দারুণ এক জুটি। অবিশ্বাস্য সেই ছক্কা মারায় আশরাফুলকে ছাপিয়ে জয়ের নায়ক বনে যান আফতাবই! যদিও এমন একটি জয়ে অবদান রেখেও কোনও কৃতিত্ব নিচ্ছেন না অবসরে চলে যাওয়া এই ক্রিকেটার। 

অথচ ১৫ বছর আগে ক্রিকেট বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত ছিল এই জয়। অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার হারানোর পার্শ্বনায়ক আফতাব আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হয়েছিলেন বৃহস্পতিবার। স্মৃতির ভেলায় চড়ে ফিরে গেলেন ১৫ বছর আগের সেই ম্যাচ ডেতে।

শেষ ওভারে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৭ রান। স্ট্রাইকে ছিলেন আফতাব, অপর প্রান্তে মোহাম্মদ রফিক। শেষ ওভারে জ্যাসন গিলেস্পির করা প্রথম বলটিই আফতাব মিড-উইকেটের ওপর দিয়ে সীমানা ছাড়া করেন। অভাবনীয় ছক্কার পরের বলে ১ রান নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ।

জয়ের পর আফতাবের উল্লাস। তখন গিলেস্পির মতো বোলারের বিপক্ষে ঠিক কী পরিকাল্পনা ছিল আফতাবের? উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘গিলেস্পি অভিজ্ঞ একজন বোলার। ওর হাতে এই সব ম্যাচ বের করা কোনও ব্যাপারই না। সবচেয়ে বড় কথা ওই সময় অস্ট্রেলিয়া এমন একটা দল, একরান থাকতেও ওরা ছাড়তে চায় না। শেষ ওভারে আমার পরিকল্পনা ছিল আমি যদি প্রথম ১/২ বলে কিছু করতে না পারি, ঠিকই ওরা ম্যাচটি বের করে ফেলবে। যা করার ১/২ বলের মধ্যেই করতে হবে। আমার শটটাও একদম পারফেক্ট ছিল। একজন ফিল্ডার যখন মিডউইকেটের বাইরে ছিল, আমি বুঝতে পেরেছিলাম স্লোয়ার মারার সম্ভাবনা আছে। কেননা থার্ডম্যান, ফাইনলেগ সার্কেলের ভেতরে থাকাতে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, স্লোয়ার মারবে। তখন আমি অফস্ট্যাম্পে রুম করে শটটা খেলি। আর যা হওয়ার হয়ে যায় (হাসি)।’

আফতাবের ব‌্যাট থেকে আসা সেই ছক্কায় ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিলেন গিলেস্পি। ক্রিকইনফোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অজি পেসার বলেছিলেন, ‘দারুণ শট ছিল। শেষ ওভারের প্রথম বলে ছক্কা খেয়ে ঘোরের মধ‌্যে ছিলাম। কিন্তু সত‌্যি বলতে আমি খারাপ বল করিনি।’

তারকা একজন বোলারের এমন উপলব্ধিতে তৃপ্তি পান আফতাব নিজেও। কিন্তু ক্যারিয়ার বেশি লম্বা হয়নি বলে অতৃপ্তি ছুঁয়ে যায় তাকে, ‘এগুলো অনেক অনেক বেশি তৃপ্তি দেয়। ক্যারিয়ারটা আরও লম্বা হলে তৃপ্তিটা বেশি লাগতো। কোচের চোখ দিয়ে যখন নিজের ব্যাটিংটা দেখি, তখন হতাশ হয়ে পড়ি। ভাবি, আমি একটু চেষ্টা করলে আরও অনেক বছর বাংলাদেশ দলকে সার্ভিস দিতে পারতাম। পুরোটাই আমার দোষ। তার পরও যে সকল দলের বিপক্ষে ভালো ইনিংস খেলতে পেরেছিলাম, সেগুলো মনে পড়লে তৃপ্তি পাই।’

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচটিতে আফতাব খেলেছিলেন অপরাজিত ২১ রানের ইনিংস। অথচ এই ম্যাচ ছাড়াও জিম্বাবুয়ে, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার দারুণ কিছু ইংনিস রয়েছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওই ২১ রানের ইনিংসটাই সবার হৃদয়ে গেঁথে আছে এখনও। আফতাবের কাছেও ওই ম্যাচটি বিশেষ কিছু, ‘ওই ম্যাচটির কথা মনে পড়লে ভালো লাগে। সত্যিই দারুণ অনুভূতি, মনে হয় এইতো সেইদিনের কাহিনী। ১৫ বছর হয়ে গেছে, এটা ভাবতেই অবাক লাগে। মনে হচ্ছে এইতো কদিন আগে ম্যাচটা শেষ করে ড্রেসিংরুমে গেলাম। সেলিব্রেট করলাম, ফ্রেশ হলাম। কিন্তু চোখের নিমিষেই ১৫ বছর হয়ে গেছে। পুরো ক্যারিয়ারে অনেকগুলো ভালো ইনিংস আছে। কিন্তু এই ম্যাচটির কথাই কেবল শুনি। অন্য ভালো ইনিংসগুলোর কথা কেউই বলে না।’

এটা নিয়ে আক্ষেপ আছে কিনা, জানতে চাইলে আফতাব লুকোচুরি করলেন না, ‘অবশ্যই আক্ষেপ আছে। একটা ছয়ই আমার জীবনের সবকিছু না। অনেকগুলো দলের  সঙ্গে ভালো ইনিংস আছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২১ রানের এই ইনিংসটির কথাই সবাই বলে। অবশ্য অস্ট্রেলিয়ার ওই দলটিতে ৯/১০ জন লিজেন্ডারি ক্রিকেটার ছিলেন। ওই সময় ওদের মতো দলকে হারানো আমাদের জন্য অনেক বড় একটা পাওয়া। এমন বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে আমাদের ব্যাটসম্যানদের লড়াকু পারফরম্যান্সের কারণেই ম্যাচটি সবার কাছে বিশেষ হয়ে আছে।’