রাগবেনই বা না কেন, এই একটি মানুষই তো তছনছ করে দিল ইংলিশদের সব। প্রথমে ব্যাট হাতে, পরে জাদুকরী বোলিংয়ে। আর সব মিলিয়ে দুর্দান্ত অধিনায়কত্বে। বাটলারের অমন আচরণ তো বেরিয়ে আসবেই ভেতর থেকে!
বাটলারের আউটের পরই যেন ঠিক হয়ে গিয়েছিল ম্যাচের নিয়তি। বাংলাদেশের উদযাপনের চিত্রটা দেখলে সেটা বুঝতে বাকি থাকার কথা নয়। যদিও ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৩৮ রান করা বাংলাদেশ ম্যাচটা যে এত সহজে ৩৪ রানে জিতে যাবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবার কথা নয় ইংল্যান্ডের ব্যাটিং শুরুর আগে। অথচ না ভাবা বিষয়টাই মিরপুরের ২২ গজে মঞ্চায়িত করল বাংলাদেশ ইংলিশদের ৪৪.৪ ওভারে ২০৪ রানে অলআউট করে। তাতে প্রথম ম্যাচে হারা বাংলাদেশ সিরিজে ফেরাল সমতা।
মাশরাফি। দিনটা যেন ছিল শুধুই তার। যা করতে চেয়েছেন, পেয়েছেন তা-ই। ম্যাচটা তাই দলীয় পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ জিতলেও হয়ে থাকবে শুধুই মাশরাফির। প্রথমে ব্যাট হাতে (২৯ বলে ৪৪) ইংলিশ বোলারদের নাকের পানি-চোখের পানি করলেন এক, এর পর বল হাতে (২৯ রানে ৪ উইকেট) ব্যাটিং লাইনের মেরুদণ্ড ভাঙলেন অসাধারণ সব ডেলিভারিতে। তাই সহজ গন্তব্যটাও সফরকারীদের জন্য হয়ে গেল দুর্গমগিরি।
শুরু থেকেই ইংল্যান্ডকে চেপে ধরে বাংলাদেশের বোলাররা। প্রথম উইকেট পেতেও খুব একটা অপেক্ষায় থাকতে হয়নি, ইনিংসের ২২তম বলে মাশরাফি ফেরান জেমস ভিন্সকে (৫)। ইংলিশ ওপেনার ধরা পড়েন মোসাদ্দেক হোসেনের হাতে। এর পরই আবার আঘাত সাকিব আল হাসানের। এই অলরাউন্ডারের ঘূর্ণি বল বুঝতেই পারেননি বেন ডাকেট। সরাসরি বোল্ড হয়ে ফিরেছেন রানের খাতা খোলার আগেই।
আরেকটি মাশরাফি-জাদু, আরেকটি উইকেট-কথাটা এভাবে বললে ভুল হবে না। ভিন্সের পর আরেক ওপেনার জেসন রয়কেও যে আউট করেছেন তিনি। এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলে এই ওপেনারকে ফেরান ১৩ রানে। এখানেই শেষ নয় মাশরাফি-জাদু, পরের ওভারেই সরাসরি বোল্ড আউট করেন বেন স্টোকসকে (০)। ২৬ রানে নেই ৪ উইকেট। কঠিন চাপে পড়া ইংল্যান্ড ওই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল জশ বাটলার-জনি বেয়ারস্টোর জুটিতে। তাদের ব্যাটে বিপর্যয় কাটিয়ে ইংল্যান্ডের স্কোর ছাড়ায় ১০০ রান। বাংলাদেশও যেন ঝিমিয়ে পড়ে একটু, ঠিক সেই মুহূর্তেই তাসকিন আহমেদের আঘাত। সেট হয়ে ভয়ঙ্কর হতে যাওয়া বোয়ারস্টোকে (৩৫) উইকেটরক্ষক মুশফিকুর রহিমের গ্ল্যাভসবন্দি করে ম্যাচ আবার বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন তাসকিন। সেটা আরও পাকাপোক্ত হয় নিজের এক ওভার পর এই পেসার বাটলারকে আউট করলে। প্রথম ওয়ানডেতে বিধ্বংসী রূপে হাজির হওয়া বাটলার দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন এই ম্যাচেও, পূরণ করেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১২তম হাফসেঞ্চুরি। যদিও টেকেনি তার প্রতিরোধ, তাসকিনের বলে এলবিডাব্লিউ হয়ে ফেরেন ইংলিশ অধিনায়ক। জোরালো এলবিডাব্লিউয়ের আবেদনে আম্পায়ার সাড়া না দিলে রিভিউ নেয় বাংলাদেশ, আর সেটা আসে স্বাগতিকদের পক্ষেই। ৫৭ রান করা বাটলারের ফেরার আগেই মঈন আলীকে (৪) সাকিবের দুর্দান্ত ক্যাচে ফিরিয়েছিলেন নাসির হোসেন।
সেখানেই আসলে একরকম নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের জয়। যার আনুষ্ঠানিকতা সেরেছেন সেই মাশরাফি।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নেমেছিল জয়ের মন্ত্র জপে। হারলেই যে সিরিজ শেষ! এমন সমীকরণ সামনে রেখে শুরু করা বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচ হারার চাপটা নিতে পারেনি বলেই কিনা অনেক দিন পর ধস নামে ব্যাটিংয়ে। এর পরও ৫০ ওভার শেষে ৮ উইকেটে ২৩৮ রান যে করতে পেরেছে, তা ওই মাহমুদউল্লাহর অসাধারণ হাফসেঞ্চুরির সঙ্গে শেষ দিকে মাশরাফি বিন মর্তুজার ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে। অনেক দিন পর একাদশে সুযোগ পাওয়া নাসির হোসেনও জবাব দিয়েছেন নির্বাচকদের আস্থার।
অথচ বাংলাদেশের স্কোর ২০০ হবে কিনা, সেটাই একটা ছিল গভীর সংশয়ে। ১৬৯ রান তুলতেই যে হারিয়েছিল ৭ উইকেট। সেখান থেকে দলকে এত দূর পর্যন্ত নিয়ে গেছেন মাশরাফি। লোয়ার অর্ডারের থাকা ব্যাটসম্যানরা রান পান না, এ নিয়ে আগের ম্যাচে আলোচনা হয়েছিল খুব। বাংলাদেশ অধিনায়ক নিজেও জানিয়েছিলেন, নিচ দিকের ব্যাটসম্যানরা সাহায্য না করলে জেতা কঠিন হয়ে যাবে। দায়িত্বটা তাই নিজের কাঁধেই নিলেন মাশরাফি। ইংলিশ বোলারদের ওপর দিয়ে ঝড় বইয়ে দিয়ে ২৯ বলে ২ চার ও ৩ ছ্ক্কায় করেছেন ৪৪ রান। যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন নাসির। দীর্ঘদিন পর একাদশে জায়গা পাওয়া নাসির অপরাজিত ছিলেন ২৭ রানে।
তাদের আগে ব্যর্থতার ভিড়ে আলাদা ছিলেন কেবল মাহমুদউল্লাহ। ৩৯ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়া বাংলাদেশের হাল ধরেন তিনি। এক প্রান্ত আগলে রেখে পূরণ করেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১৬তম হাফসেঞ্চুরি। সেঞ্চুরির আশাও জাগিয়েছিলেন তিনি। দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরির দিকে এগোচ্ছিলেনও মাহমুদউল্লাহ। চাপ কাটিয়ে বাংলাদেশও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, সেই সময়েই আদিল রশিদের আঘাতে ফিরে যান মাহমুদউল্লাহ। এলবিডাব্লিউ হয়ে আউট হয়েছেন তিনি ৭৫ রান করে।
তিনি ছাড়া টপ অর্ডারের আর কোনও ব্যাটসম্যানই মেলে ধরতে পারেননি নিজেদের। আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান ইমরুল কায়েস ফেরেন শুরুতেই। ক্রিস ওকসের বলে ডেভিড উইলির হাতে ধরা পড়েন ১১ রানে। তার পর পরই ওই ওকসের শিকার হয়ে তামিম ইকবালও (১৪) পথ ধরেন প্যাভিলিয়নে। দুই ওপেনারকে হারানোর চাপটা আরও বড় আকার ধারণ করে সাব্বির রহমান আউট হলে। ব্যাটিং অর্ডার বদল করেও ব্যর্থ তিনি, মাত্র ৩ রান করে বোল্ড হয়ে ফেরেন জেক বলের শিকার হয়ে। ওই বিপর্যয়টা কাটিয়ে উঠার ইঙ্গিত দিয়েছিল মাহমুদ-মুশফিকের জুটি। মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে জুটিটা দাঁড়ও করিয়ে ফেলেছিলেন মুশফিক। তাতে নিজের চেনা ছন্দে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। যদিও ইনিংসটা বড় করতে পারেননি তিনি। ২১ রান করে ফিরে গেছেন প্যাভিলিয়নে। জেক বলকে পুল করতে গিয়ে ফাইন লেগে ধরা পড়েন মঈন আলীর হাতে।
খানিক পর তার পথ ধরেন সাকিবও। ফর্মের তুঙ্গে থাকা এই অলরাউন্ডার আউট হয়েছেন বাজে বলে। বেন স্টোকসের বলটা ওয়াইড হতো নিশ্চিত, অথচ সেই বলটাই খোঁচা মেরে উইকেটরক্ষক জশ বাটলারের গ্ল্যাভসে ধরা পড়েন তিনি ৩ রান করে। মোসাদ্দেক হোসেন অবশ্য আগের ম্যাচের হতাশা ঝেড়ে সাবলীল ব্যাটিংয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বড় ইনিংস খেলার। শুরুটাও হয়েছিল ভালো, যদিও ২৯ রান করে দুর্বল শটে ফেরেন প্যাভিলিয়নে। এর পরই মাশরাফির সেই ঝোড়ো ইনিংস।
ব্যাটের পর বল হাতেও ঝড় তুললেন ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’। যার গতিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল ইংলিশ সাম্রাজ্য। পতনের বেদনা কতটা যন্ত্রণাময়, সেটা বাটলারের অমন আচরণই তো বলে দেয়!