মাশরাফির আবির্ভাবটা হঠাৎ করে নয়। ২০০১ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনূর্ধ্ব-১৭ এশিয়া কাপ দিয়ে তিনি প্রথমবার জানান দিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। কুয়েতের বিপক্ষে ২৭ বলে ৭৩ রানের একটি ইনিংস খেলে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিলেন তখন।
ওই বছরের জুন-জুলাইয়ের দিকে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্প চলছিল বিকেএসপিতে। সেই ক্যাম্পে অস্থায়ী বোলিং কোচের দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন অ্যান্ডি রবার্টস। ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই বোলিং কোচ মাশরাফিকে করেছেন আরও ধারালো। তার ইতিবাচক মন্তব্যেই ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর টেস্টে অভিষেক হয় মাশরাফির।
১৫ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে বল হাতে তিনি যেমন সফল, তেমনি সফল নেতৃত্বেও। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ আইসিসির ওয়ানডে র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের উন্নতি। অন্য সবার জন্য তার জীবনের গল্পটাও দারুণ অনুপ্রেরণার। দুই হাঁটুতে সাত-সাতটি অস্ত্রোপচারও তাকে পারেনি দমাতে। অদম্য মানসিকতা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন বারবার, লড়াই করেছেন বুক চিতিয়ে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে গেছেন সম্মানজনক এক উচ্চতায়।
আক্রমণাত্মক ও গতিময় বোলিং দিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে থাকতেই তিনি নজর কেড়েছিলেন সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফাস্ট বোলার অ্যান্ডি রবার্টসের, যিনি তখন ছিলেন দলটির অস্থায়ী বোলিং কোচের দায়িত্বে। রবার্টসের পরামর্শে মাশরাফিকে বাংলাদেশ ‘এ’ দলে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে মাত্র একটি ম্যাচ খেলেই জাতীয় দলের দরজা খুলে যায় মাশরাফির। ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে তার অভিষেক।
বৃষ্টির বাগড়ায় ম্যাচটি ড্র হলেও মাশরাফি অবশ্য অভিষেকেই তার জাত চিনিয়েছিলেন ১০৬ রানে ৪ উইকেট নিয়ে। মজার ব্যাপার হলো মাশিরাফির প্রথম শ্রেণির ম্যাচও ছিল এটি। ক্রিকেটের বিরল এই ঘটনার সাক্ষী হন তিনি ৩১তম খেলোয়াড় হিসেবে, যা ১৮৯৯ সালের পর তৃতীয়।
একই বছরের ২৩ নভেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেটে মাশরাফির অভিষেক হয় ফাহিম মুনতাসির ও তুষার ইমরানের সঙ্গে। অভিষেক ম্যাচে মোহাম্মদ শরীফের সঙ্গে বোলিং ওপেন করে তিনি ৮.২ ওভারে ২৬ রান দিয়ে নেন ২টি উইকেট। ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটে দুই ফরম্যাটেই গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার ছিলেন মাশরাফির প্রথম শিকার।
নিজের তৃতীয় টেস্ট খেলার সময় তিনি আঘাত পান হাঁটুতে। তাতে প্রায় দুই বছর ক্রিকেটের বাইরে থাকতে হয় তাকে। ফিরেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৬০ রানে ৪ উইকেট নেওয়ার পর আবার আঘাত পান হাঁটুতে। এ যাত্রায় তাকে মাঠের বাইরে থাকতে হয় প্রায় বছরখানেক।
ক্যারিয়ারের চলার পথে আঘাত এসেছে অনেক। কষ্টের অথৈ সাগরে পড়লেও কখনও ডুবে যাননি, সাঁতার কেটে ঠিকই উঠেছেন তীরে। সব কষ্টকে জয় করে ফিরেছেন বীরের বেশে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কার কথা যদি বলা যায়, তাহলে সেটা ২০১১ সালের বিশ্বকাপ খেলতে না পারা। নিজেকে সেবার ধরে রাখতে পারেননি মাশরাফি। মনের দেয়াল ভেঙে কষ্টের চোরাস্রোত সামনে এসে বয়েছিল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামসংলগ্ন একাডেমি মাঠে। চোখের জলে অন্য এক মাশরাফি ধরা দিয়েছিল সেদিন। যে দৃশ্যটা এখনও ভুলতে পারেননি অনেক সাংবাদিক।
যদিও সেই কষ্ট কিছুটা হলেও কমেছিল চার বছর পর। তাঁর নেতৃত্বেই যে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপে গিয়েছিল বাংলাদেশ। শুধু কি যাওয়া, তার অধিনায়কত্বে দেখা মেলে অন্য এক বাংলাদেশের। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ক্রিকেট এমন সাফল্য পায়নি কখনও। শুধু বিশ্বকাপে সাফল্য নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বদলে দেওয়াতেও তার ভূমিকা অনেক।
মাশরাফির নেতুত্বে ছুটছেই বাংলাদেশের জয়রথ। যে রথের চালকের আসনে মাশরাফি। যার নেতৃত্বে উঠেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন সূর্য। সামনে মাশরাফির নেতৃত্বে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ পাড়ি দেবে বাংলাদেশ।
আগামী ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ড সফর করবে টাইগাররা। বড় দল হয়ে উঠার প্রথম চ্যালেঞ্জটা শুরু এখানেই। মাশরাফি আছেন বলেই ক্রিকেট ভক্তদের স্বপ্ন-এই চ্যালেঞ্জটাও ঠিক উতরে যাবে বাংলাদেশ।
/কেআর/