অভিজ্ঞ মুশফিকের অনভিজ্ঞ অধিনায়কত্ব!

258888টেস্ট ক্রিকেটে ভারত এক নম্বর দল। এই ধরনের দলের বিপক্ষে জয় পেতে হলে হাফচান্সগুলোকে ফুলচান্স বানাতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ হাফচান্সগুলোকে ফুলচান্স বানানোতো দূরের কথা; ফুলচান্সগুলোই কাজে লাগাতে পারেনি। ফিল্ডারদের ব্যর্থতায় টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে তাই ব্যাকফুটে বাংলাদেশ।

তবে বৃহস্পতিবার সকালটা ঠিক যেভাবে শুরু হয়েছিল ঠিক তেমনটা দ্বিতীয় দিন শেষে আর থাকেনি। ব্যাট হাতে বাংলাদেশের বোলারদের শাসন করতে থাকেন মুরালি বিজয়, চেতেশ্বর পূজারা, বিরাট কোহলি, ঋদ্ধিমান সাহারা। ভারতের প্রথম ইনিংসে অসহায়ই থেকে গেলেন বাংলাদেশের বোলাররা। আর কোহলির ডাবল সেঞ্চুরি, মুরালি বিজয় ও ঋদ্ধিমান সাহার সেঞ্চুরিতে রান পাহাড়ে চড়ে ভারত। ছয় উইকেটে ৬৮৭ রান তুলে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে স্বাগতিকরা।

জবাবে দিনশেষে বাংলাদেশ হাতে ৯ উইকেট রেখে পিছিয়ে রয়েছে ৬৪৬ রানে। শুরু আর শেষে কতটা অমিল-এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কিছুই হতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকের কথাই ফলে গেল! ম্যাচের আগেরদিন সংবাদ সম্মেলনে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কোহলি-অশ্বিন বাংলাদেশের জন্য হুমকি কি না। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘শুধু কোহলি-অশ্বিন নয়, পুরো দলই হুমকি।’ হয়েছেও তাই। ভারতের সব ব্যাটসম্যানই পেয়েছেন রানের দেখা। এবার পালা বোলারদের।

কিন্তু এর মাঝেও নানা সময়ে নানা সুযোগ সামনে এসেছে। তার কিছুই লুফে নিতে পারেনি বাংলাদেশের ফিল্ডাররা।  বিশেষ করে মুশফিকের অধিনায়কত্ব ও উইকেটকিপিং নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠে গেছে! এই প্রশ্নটা বেশ আগেই ছিল। তবে হায়দরাবাদ টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে ধরা দিল। মুশফিকের সঠিক সময়ে সঠিক বোলার বাছাইয়ে অপারদর্শিতা, রক্ষণাত্মক মানসিকতার কথাই বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে।

দলের খারাপ সময়ে অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে ব্যতিক্রম প্রমাণ করতে এখন পর্যন্ত ব্যর্থ মুশফিক! অভিজ্ঞ ক্রিকেটার হয়েও অধিনায়কত্বে ছাপ রাখছেন অনভিজ্ঞতার। এই টেস্টেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বিশেষ করে তার উইকেট কিপিংই বেশি হতাশার ছিল। গত বছর থেকেই ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দিতে মুশফিককে কিপিং ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মুশফিক কিপিং চালিয়ে যাবেন বলেই ঘোষণা দিয়েছিলেন।

অথচ এই টেস্টে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্টাম্পিং মিস করেছেন তিনি। ১০৬ রানের হার না মানা ইনিংস খেলা ভারতীয় ব্যাটসম্যান ঋদ্ধিমান সাহা ফিরতে পারতেন ৪ রান করেই। কিন্তু তার সহজ সুযোগ হাতছাড়া করার খেসারতও দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

স্পিনার তাইজুল ইসলামের দারুণ একটি ডেলিভারি হাতে পেয়েও প্রথম অবস্থায় স্টাম্পে ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন মুশফিক। দ্বিতীয় চেষ্টাতেও মুশফিকের গ্লাভস স্টাম্প ছুতে পারেনি। তৃতীয়বার যখন স্টাম্প ভাঙলেন, ততক্ষণে ঋদ্ধিমান পৌঁছে গেছেন নিরাপদ জায়গায়।

শুধু কি ঋদ্ধিমান; বিরাট কোহলিও ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করার আগেই ফিরতে পারতেন। ভারতের অধিনায়ক তখন ব্যাট করছিলেন ১৬৫ রানে। তাইজুল ইসলামের একটি ডেলিভারি খেলতে ব্যর্থ হন কোহলি। বেরিয়ে আসেন পপিং ক্রিস থেকেও। এবারও সহজ সুযোগ হাতছাড়া করে সবাইকে হতাশ করেন বাংলাদেশ টেস্ট অধিনায়ক।

মুশফিকের ব্যর্থতার দিনে বাংলাদেশের ফিল্ডাররা নিউজিল্যান্ড সিরিজের ফিল্ডিং ব্যর্থতা টেনে এনেছেন হায়দরাবাদের ২২ গজেও। ভারত প্রথম ইনিংসে দেড় দিনের কিছু সময় বেশি ব্যাটিং করেছে। সেখানে অসংখ্য গ্রাউন্ড ফিল্ডিং মিস হয়েছে। হাত ফসকে বাউন্ডারি লাইনে পৌঁছে গেছে বহু বল। যেখানে এক রানও হয় না, সেখানে দুই রান নিতে দেখা গেছে।

বড় দলগুলোর বিপক্ষে ফলাফল নিজেদের পক্ষে আনতে গেলে হাফচান্সগুলোকে ফুল চান্স করতে হয়। বাংলাদেশ সেখানটাতে প্রায় পুরোপুরি হয়েছে ব্যর্থ। যদিও মেহেদী একটি হাফচান্সকে ফুল চান্স বানিয়ে রাহানেকে ফেরান। তবে বেশকিছু হাফচান্স ক্যাচ তালুবন্দী করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশের ফিল্ডাররা।

এমনকি বেশকিছু ফুলচান্সও মিস করেছেন ফিল্ডাররা। প্রথমদিনে মিরাজ নিশ্চিত একটি রান আউট মিস করেছেন নিজের ভুলে।

তবে সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে মুশফিকের অধিনায়কত্ব। প্রথম দিন থেকেই অপারদর্শিতা দেখিয়ে আসছেন। সঠিন সময়ে সঠিক বোলার বাছাই করতে ব্যর্থ হচ্ছেন তিনি। এমনকি প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের সুযোগ দিতেও কার্পণ্য করেননি! ফিল্ডারদের ছড়িয়ে দিয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন ফিল্ডিং সাজাতেও বিন্দুমাত্র ভুলে করেননি! বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ ভারতের। সেই দলটির বিপক্ষে মুশফিক তার বোলারদের নিজেদের দায়িত্বটুকু বোঝাতেও ব্যর্থ হয়েছেন।

তবে এদিন ভারতের তিন উইকেট নেওয়া তাইজুল দারুণ বোলিং করেছেন। দ্বিতীয় দিনে বিকালের দিকে তাইজুলের বোলিংয়ের বিপক্ষে ধুঁকতে হয়েছিল ভারতের ব্যাটসম্যানদের। কিন্তু শুক্রবার এর আগে তাকে আনতে যেন ভুলেই গেলেন মুশফিক। লাঞ্চ বিরতেতে যখন উইকেট পড়ছিল না, তখনো মুশফিকের মাথায় ঢোকেনি যে তার একজন মাহমুদউল্লাহ আছে। যদিও অনেক পরে রিয়াদকে ব্যবহার করেছেন।

নতুন ব্যাটসম্যানরা যখন ক্রিজে, তখন কোনও পেসারের হাতে একবারের জন্যও বল তুলে দেননি মুশফিক। এমনকি পুরনো বলে রাব্বি বেশ কার্যকরী রিভার্স সুইং করতে পারেন। তার কথাও পুরোপুরি ভুলে গেছেন তিনি।

ব্যাটসম্যান হিসেবে মুশফিকুর রহিম যতটা কার্যকর, উইকেট কিপার হিসেবে ততটা নয়। অধিনায়ক হিসেবে সম্প্রতি একেবারেই অকার্যকর। তার অধিনায়কত্ব চলছে গদ বাঁধা কিছু নিয়মের মধ্যে থেকেই। এখান থেকে বের হতে না পারলে মুশফিকের অধিনায়কত্বে দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্য পাওয়া হয়তো কঠিনই হবে!

/আরআই/এফআইআর/