ফিরে দেখা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি

চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার ‘ঔদ্ধত্য’ ও এশিয়ানদের হতাশা

শুরুটা ১৯৯৮ সালে। আইসিসি নকআউট ট্রফি নামে শুরু করা প্রতিযোগিতাটি পরবর্তী সময়ে রঙ-রূপ যোগ করে এখনকার চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। জুনে উঠবে অষ্টম আসরের পর্দা। আগের সাত আসর কেমন ছিল, কার ঘরে উঠেছিল ‘মিনি বিশ্বকাপ’ খ্যাত এ প্রতিযোগিতার শ্রেষ্ঠত্ব- ইংল্যান্ডের আসর শুরুর আগে ফিরে দেখা যাক  একবার। ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এর এই বিশেষ আয়োজনের পঞ্চম পর্বে থাকছে ২০০৬ সালের আসর-

ফিরে দেখা-00আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পঞ্চম আসর শেষে ইংলিশ ক্রীড়া লেখক টিম ডি লিসলে বলেছিলেন- সবচেয়ে মজার টুর্নামেন্ট হয়েছিল সেবার, কারণ এটা ছিল ‘আনপ্রেডিক্টেবল’। পিচের ‘রহস্যময়’ ফাঁদে পড়েছিল সব দল, শুধু অস্ট্রেলিয়া ছাড়া সবাই ছিল পিছিয়ে। পুরো টুর্নামেন্টে অসিরা হেরেছে মাত্র এক ম্যাচ, আর বাকিরা প্রত্যেকে দুটি করে। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ১০টি দলীয় ইনিংসের ৫টিই হয়েছিল ওই আসরে। তবে ডি লিসলের মতে, ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ টুর্নামেন্ট বলার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ১৯৭৫ সালের বিশ্বকাপের পর প্রথমবার কোনও আইসিসির বড় প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে উঠেনি এশিয়ান কোনও দল। অথচ উপমহাদেশীয় কন্ডিশনে পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কা ছিল ফেভারিট। এশিয়ান ভক্তদের হতাশ করে সেবার অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল প্রথম চ্যাম্পিয়নস ট্রফি।

তবে টানা দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতে উদযাপনে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বৃষ্টি আইনে হারিয়ে ‘ঔদ্ধত্য’ দেখানোয় সমালোচিত হয়েছিল রিকি পন্টিংয়ের দল। এশিয়ানদের হতাশা ও পন্টিংয়ের সীমাহীন উদযাপনের সঙ্গে মাঠের বাইরের ঘটনাও হয়েছিল বিতর্কিত।

মাঠের বাইরের বিতর্ক : ২০০২ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আয়োজক হওয়ার কথা ছিল ভারতের। কিন্তু ট্যাক্স ফ্রি রাজস্ব আদায়ে সম্মতি না পাওয়ায় তারা আয়োজক সত্ত্ব দিয়ে দেয় শ্রীলঙ্কাকে। ২০০৬ সালের টুর্নামেন্টের ভেন্যু ঘোষণাও একই কারণে বিলম্বিত হয়েছিল। তবে দাবি পূরণ হওয়ায় ভারত শেষ পর্যন্ত পঞ্চম আসরের আয়োজক হয়। অবশ্য ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা বিসিসিআই খুব চেষ্টা করেছিল আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি বন্ধ করার। ওটাই যেন টুর্নামেন্টের শেষ আসর হয়, সেই সুপারিশ তারা করেছিল আইসিসির কাছে। তারা জানায়, এ টুর্নামেন্টের আয়োজক হওয়া মানে ‘আর্থিক বোঝা’ চাপানো। আইসিসির উচিত শুধুমাত্র একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা, আর সেটা হলো বিশ্বকাপ। যদিও এপ্রিলে বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট শারদ পাওয়ার জানান, চ্যাম্পিয়নস ট্রফি চালু রাখতে সর্বসম্মতিক্রমে যদি আইসিসি রাজি থাকে, তবে তাদের সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানাবে তারা।

২০০৬ সালের জুলাইয়ে মুম্বাইয়ে বোমা হামলার পর টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছিল শঙ্কা। তারপরও কোনও দল তাদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়নি প্রতিযোগিতা থেকে।

৬ বছরে প্রথমবার ভারত ফিরেছিলেন হার্শেল গিবস। ২০০০ সালের ভারত সফরে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় গ্রেফতারের ভয়ে আগের সফরগুলোয় যাননি দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা।

টুর্নামেন্টের ঠিক কয়েকদিন আগে পাকিস্তানের দল গেল বদলে। নিয়মিত অধিনায়ক ইনজামাম উল হক নিষিদ্ধ হলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তানের চতুর্থ টেস্টে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার খেসারত দেন তিনি। টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানো ইউনিস খানকে আবার ফেরানো হলো অধিনায়কত্ব দিয়ে।

পাকিস্তানের জন্য আরও বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছিল। ১৬ অক্টোবর তাদের প্রথম ম্যাচের একদিন আগে দুই পেসার মোহাম্মদ আসিফ ও শোয়েব আখতার ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়েন এবং তারা নিষিদ্ধ হন এক ও দুই বছর। যদিও পরে আবেদন করে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পান তারা।

ডোপপাপে নিষিদ্ধ হন মোহাম্মদ আসিফ ও শোয়েব আখতারপন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার ঔদ্ধত্য : ১৯৯৯ ও ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ জিতে ওই সময় অস্ট্রেলিয়া যেন উড়ছিল। প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে উঠে তারা পাত্তা দেয়নি ক্যারিবিয়ানদের। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৩৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে ৪৮ রানে জেতে অস্ট্রেলিয়া। ২৮.১ ওভারে তারা ২ উইকেটে করেছিল ১১৬ রান। বৃষ্টি আইনের হিসাব-নিকাশে দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য ছিল ৩৫ ওভারে ১১৬ রান। পুরো টুর্নামেন্টে অসিদের একমাত্র হার ছিল এই ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে। ১০ রানের ওই হারের শোধ তুলে অতি উচ্ছ্বাস দেখায় পন্টিংরা। আয়োজক ভারত যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছিল টুর্নামেন্টের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া ওই বির্তকিত ঘটনায়।

চ্যাম্পিয়নস ট্রফির শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর মাঠে বাধভাঙা উদযাপনে মেতেছিলেন পন্টিং-ওয়াটসনরা। আর পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে সেটা হয়ে গেল সীমাছাড়া। মুম্বাইয়ের ব্রাবোর্ন স্টেডিয়ামের পুরস্কারের মঞ্চে ওঠার সময়ই অসহিষ্ণু পন্টিং আঙুল দেখিয়ে শারদ পাওয়ারকে তাদের হাতে ট্রফি দিয়ে তাড়াতাড়ি সরে যেতে বলেন। সাদা চোখে ধরা পড়েছিল ওই দৃশ্য। যখন শিরোপা তাদের হাতে দেওয়া হলো তখন অস্ট্রেলিয়ার ড্যামিয়েন মার্টিন মৃদু ধাক্কা দিয়ে পাওয়ারকে মঞ্চ থেকে নেমে যেতে বলেন।

পুরো ভারত চটে গিয়েছিল এই কাণ্ডে। যদিও পাওয়ার বোঝাতে চেয়েছিলেন ঘটনা ‘অনিচ্ছাকৃত’। শচীন টেন্ডুলকার ও নিখিল চোপড়া একহাত নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ানদের। মুম্বাইয়ের রাজনৈতিক দল এনসিপির কর্মীরা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। অবশ্য বিসিসিআই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কাছে কোনও অভিযোগ করেনি। পাওয়ারের কাছে পন্টিং ক্ষমা চেয়ে এ ইস্যুর ইতি টানেন।

দলীয় সর্বোচ্চ :  আগের আসরগুলোয় যেখানে রানের পাহাড় গড়েছিল কয়েকটি দল, সেখানে পঞ্চম আসরে সর্বোচ্চ দলীয় রান হলো শ্রীলঙ্কার করা ৮ উইকেটে ৩০২। মোহালিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে এ স্কোর করেছিল লঙ্কানরা।

ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস ছিল ক্রিস গেইলেরব্যক্তিগত সর্বোচ্চ : ২০০৬ সালের প্রতিযোগিতায় ৮ ম্যাচে ৩ সেঞ্চুরিতে ৪৭৪ রান করেছিলেন ক্রিস গেইল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তারকাই হয়েছিলেন সর্বোচ্চ রান করা ব্যাটসম্যান। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গেইলের করা ১৩৩ রানের অপরাজিত ইনিংস ছিল ওই আসরের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত। ১৩৫ বল খেলে ১৭ চার ও ৩ ছয় মেরেছিলেন তিনি।

সেরা বোলার : শীর্ষ বোলারের মর্যাদাও পেয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়। ৭ ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে সবার সেরা ছিলেন জেরম টেলর। এক ইনিংসে সেরা বোলিং ফিগার ছিল পারভেজ মাহরুফের। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৯ ওভারে ২ মেডেনসহ ১৪ রান দিয়ে শ্রীলঙ্কার এ পেসার নেন ৬ উইকেট।

/কেআর/