সাদা পোশাকে রাজ্জাকের রঙিন প্রত্যাবর্তন

আব্দু রাজ্জাক‘বসন্ত এলো এলো এলো রে, পঞ্চম স্বরে কোকিল কুহরে, মুহু মুহু কুহু কুহু তানে, মাধবী নিকুঞ্জে পুঞ্জে পুঞ্জে, ভ্রমর গুঞ্জে গুনগুন গানে’- বসন্ত নিয়ে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের লেখা এই কবিতাটি চাইলে আবৃত্তি করতেই পারেন আব্দুর রাজ্জাক। বসন্ত আসতে চার দিন বাকি থাকলেও ফাগুনের সুবাতাসে মন জুড়িয়ে যাচ্ছে এই স্পিনারের। তা না হলে ৩৬ বসন্ত পেরোনো রাজ্জাকের প্রত্যাবর্তনটা এতটা রঙিন হয় কী করে!

বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে চার বছর পর প্রত্যাবর্তন ম্যাচটা মনের মতো রাঙিয়েছেন রাজ্জাক। লঙ্কানদের টপ অর্ডারের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। তার ঘূর্ণি জাদুর পর সফরকারীদের স্কোর ২২২ রানেই থেমে যায়।

চারটি স্পেলে রাজ্জাক বোলিং করেছেন। দিনের দ্বিতীয় ওভারেই মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে জুটি বাঁধেন ৩৬ বছর বয়সী এই স্পিনার। নিজের তৃতীয় ওভারেই উইকেট তুলে নেন রাজ্জাক। তার ডেলিভারি বেরিয়ে এসে চার্জ করতে গিয়ে দিমুথ করুণারত্নে স্টাম্পড হন লিটন দাসের হাতে। আর তাতেই চার বছর পর প্রথম আন্তর্জাতিক উইকেটের স্বাদ নেন এই বোলার।

দ্বিতীয় স্পেলে তো আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেন তিনি। এবার ৭ ওভারে ১ মেডেনে ৩৭ রান খরচায় তুলে নেন তিনটি উইকেট। দানুশকা গুনাথিলাকাকে নিয়ে কুশল মেন্ডিস ভালোই প্রতিরোধ গড়েছিলেন। রাজ্জাক সেটা ভেঙে দেন তার ষষ্ঠ ওভারে। মুশফিকের ক্যাচ বানিয়ে সাজঘরে ফেরত পাঠান ২৬ বলে ১৩ রান করা গুনাথিলাকাকে। পরের বলে দিনেশ চান্ডিমাল বোল্ড হলে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা তৈরি হয়। যদিও রোশেন সিলভার প্রতিরোধে শেষ পর্যন্ত হ্যাটট্রিক করতে পারেননি রাজ্জাক।

তৃতীয় ও চতুর্থ স্পেল মিলিয়ে মোট ৪ ওভার বোলিং করেছেন রাজ্জাক। সেখানে অবশ্য আর কোনও উইকেট তুলে নিতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ৫ উইকেট শিকারের আক্ষেপ নিয়েই থাকতে হয়েছে বাঁহাতি এই স্পিনারকে।

বৃহস্পতিবার এক ইনিংসে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করে নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। চার ওভার বোলিং করে ৬৪ রান খরচায় রাজ্জাক তুলে নিয়েছেন ৪ উইকটে। আগের সর্বোচ্চ উইকেট ছিল ৩/৯৩, ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ১৬-২-৬৩-৪, তার এই বোলিং ফিগারই জানান দিচ্ছে কতটা ভয়ঙ্কর ছিলেন তিনি।

অথচ এই রাজ্জাককে বাতিল ঘোষণা করেছিলেন নির্বাচকরা বেশ আগেই। নির্বাচকরা রাজ্জাককে ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলিয়ে অবসর নেওয়ার প্রস্তাবও করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচকদের এমন ‘অনৈতিক প্রস্তাব’ মেনে না নিয়ে বরং ঘরোয়া ক্রিকেটে মনোযোগী হয়েছিলেন তিনি। যার ফলাফল চার বছর পর টেস্ট খেলার সুযোগ।

এই সময়ে রাজ্জাক নিজেকে আরও ধারালো করেছেন। বাংলাদেশি প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তুলে নিয়েছেন ৫০০ উইকেট। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ টেস্ট খেলার পর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২২২ উইকেট নিয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক। কিছুদিন আগে শেষ হওয়ার ত্রিদেশীয় সিরিজে রাজ্জাককে সংবর্ধনা দিয়েছেন ক্রিকেটাররা। তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি লঙ্কানদের বিপক্ষেই টেস্ট খেলার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন তিনি।

অবশ্য সুযোগ তিনি পেতেন না যদি অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ইনজুরিতে না পড়তেন। তার ইনজুরির কারণেই জাতীয় দলের দরজা খুলে যায় রাজ্জাকের।

শুধু জায়গা পেয়েই ক্ষান্ত থাকেননি, নিজেকে প্রমাণ করলেন তিনি কতটা প্রস্তুত ছিলেন। ৩৬ বছর বয়সী এই স্পিনারের পারফরম্যান্স বন্ধু মাশরাফিরও ছুঁয়ে গেছে। অনুভূতি প্রকাশের সঙ্গে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে কিছু প্রশ্নও রেখেছেন বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক। তবে কার কাছে সেই প্রশ্নটা বোঝা না গেলেও বন্ধুর এতদিনের অপেক্ষাটা যে মোটেও ভালো লাগেনি, সেটা স্পষ্টই বোঝা গেছে। মাশরাফি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘৩৫ বছর ২৩৮ দিন এই বয়সটা অনেক প্রশ্নের উত্তর দিল, আর আমার উপলদ্ধি তোকে দেখে আরও কিছু করতে মন চায়, আর অভিজ্ঞতা বলে নিজেকে খুশি রাখ অন্যকে না। শুধু হাততালি না দিয়ে পারলে কিছু শিখ।…সাবাশ খান সাবাশ।’

মাশরাফির পোস্টের নিচে কমেন্ট করেছেন সাবেক পেসার সৈয়দ রাসেল। রাজ্জাকের সাফল্যে বাদ পড়া অভিজ্ঞরা নতুন স্বপ্নের সন্ধান পাবেন বলে তিনি মনে করছেন। রাসেল লিখেছেন, ‘নতুন এক অধ্যায়ের সৃষ্টি হলো তার হাত ধরে। এখন থেকে হয়তো অভিজ্ঞরা মূল্যায়ন করা শিখবে…।’