অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ দল। কিন্তু ৪৭ দিনের লড়াইয়ে হতাশা নিয়ে দেশে ফিরে গেছে মাশরাফি বাহিনী। সঠিক পরিকল্পনার অভাব, ইনজুরি সহ বেশ কয়েকটি কারণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি বাংলাদেশ।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে দলের কয়েকজন ক্রিকেটার পুরোপুরি ফিট ছিলেন না। তাদের মধ্যে অন্যতম মাহমুদউল্লাহ। এ বছরের শুরুর দিকে নিউজিল্যান্ডে খেলতে গিয়ে কাঁধের ইনজুরিতে পড়েন তিনি। দেশে ফিরে কিছুটা সুস্থ হলেও বোলিং করার মতো অবস্থায় ফিরতে পারেননি। তাই আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের পাশাপাশি বিশ্বকাপে বোলার মাহমুদউল্লাহর সার্ভিস পায়নি বাংলাদেশ। ফিটনেসের ঘাটতির কারণে পুরো বিশ্বকাপেই তার ব্যাটিং ছিল অনুজ্জ্বল। মাশরাফি প্রায়ই আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘মাহমুদউল্লাহর বোলিং পেলেও দল উপকৃত হতো।’ কিন্তু বোলিং তো করতেই পারেননি, ব্যাটিংয়েও ছিলেন না ‘আপ টু দ্য মার্ক’।
মাহমুদউল্লাহর মতো অধিনায়ক মাশরাফিরও একই অবস্থা। মাশরাফি চোট নিয়ে নিয়মিতই খেলেন আসছেন। চোটকে কখনোই পাত্তা দেননি। ব্যথা সয়েও দলের জন্য আত্মনিবেদনের কারণে বরাবরই তিনি প্রশংসিত। কিন্তু আয়ারল্যান্ড সিরিজ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে ৬৪ দিনের লম্বা সফরে মাশরাফি খুব একটা স্বস্তি নিয়ে খেলতে পারেননি। পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে পা ফুলে যাওয়ায় খেলতেই চাননি! শেষ পর্যন্ত খেললেও পারফরম্যান্সের পরিবর্তন হয়নি। আগের ম্যাচগুলোর মতো শেষ ম্যাচেও তার হাতে সাফল্য ধরা দেয়নি।
মাশরাফি নতুন বলে প্রায়েই ব্রেক থ্রু এনে দেন দলকে। কিন্তু এবার মাশরাফি সহ অন্য পেসাররা নতুন বলের ব্যবহার ঠিকমতো করতে পারেনি। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ ম্যাচে ৫৬ ওভার বল করে ৩৬১ রান খরচ করে পেয়েছেন মাত্র ১ উইকেট। আলো ঝলমলে ক্যারিয়ারে এমনটা মাশরাফি আর দেখেননি। বলের গতি কমিয়ে লাইন-লেন্থ নিয়ন্ত্রণ করে সাফল্য পাচ্ছিলেন নিয়মিত। কিন্তু এবার ইনজুরি ও টানা খেলার ধকল সামলাতে না পেরে মুদ্রার উল্টা পিঠও দেখতে হলো বাংলাদেশের সফলতম অধিনায়ককে। মাশরাফির হতাশাজনক পারফরম্যান্সের প্রভাব পড়েছে পুরো দলের ওপরে।
বিশ্বকাপের বেশ কয়েকটি ম্যাচে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনার অভাবও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। এমনকি আবহাওয়া, উইকেট পর্যবেক্ষণের অদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে উইকেট পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি বলেই বাংলাদেশ স্কোরবোর্ডে পর্যাপ্ত রান তুলতে ব্যর্থ হয়েছে!
সেদিন ওভালে ব্যবহৃত উইকেটে খেলেছিল বাংলাদেশ। ওই ম্যাচের উইকেটে ২৬৫/২৭০ রান হতো ফাইটিং স্কোর। কিন্তু বাংলাদেশ ৩০০ রানের পেছনে ছুটতে গিয়ে অলআউট হয়ে যায় ২৪৪ রানে। ড্রেসিংরুম থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছিল যে ৩০০ রান করো, নয়তো পারবে না! ভুল বার্তা পেয়ে মারতে গিয়ে আউট হয়ে যান ব্যাটসম্যানরা, আর বাংলাদেশ হেরে যায় ২ উইকেটে।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় ভুল— টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই জয়-পরাজয়ের হিসেব করে ফেলা! শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে যাওয়ার ছক কষেছিল দল। কিন্তু টুর্নামেন্টের আগে এমন ছক কাল হয়েছে শেষ পর্যন্ত। তিনটি জিতলেও বাকি ম্যাচে জয়ের মুখ দেখা হয়নি। তার ওপর ছিল বৃষ্টির বাধা।
অস্ট্রেলিয়া আর ভারতের বিপক্ষে লড়াই করলেও জয় ধরা দেয়নি। মানসিক প্রতিবন্ধকতাই হয়তো জিততে দেয়নি বাংলাদেশকে। এই দুটো ম্যাচ অবশ্য টুর্নামেন্ট শুরুর আগে জয়ের হিসেবের বাইরে ছিল।
অষ্টম স্থানে থেকে বিশ্বকাপ শেষ করার পেছনে দৃষ্টিকটু ফিল্ডিং আর ক্যাচ মিসও কম দায়ী নয়। পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচেও হারের জন্য বাজে ফিল্ডিং ও ক্যাচ মিসকে দায়ী করেছেন মাশরাফি।
নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনকে নিশ্চিত রান আউট করতে পারেননি মুশফিক। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডেভিড ওয়ার্নারের ক্যাচ মিস করেছেন সাব্বির। ভারতের সঙ্গে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ব্যক্তিগত ৯ রানে তামিমের সৌজন্যে ‘জীবন’ পেয়ে সেঞ্চুরি করেছেন রোহিত শর্মা। পুরো টুর্নামেন্টে অন্তত ৮টি ক্যাচ বাংলাদেশ ফিল্ডারদের হাত ফস্কে পড়েছে। এই ক্যাচগুলো নিতে পারলে কে জানে, এখন হয়তো সেমিফাইনালের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকতো টাইগাররা।
বিশ্বকাপে প্রায় প্রত্যেক ম্যাচ শেষে মাশরাফি বলেছেন, ‘বোলাররা সব সময় ফিল্ডারদের উজ্জীবিত করতে পারবে না। যখন বোলারদের কোনও কিছুই ঠিক মতো হবে না, তখন ফিল্ডাররা ভালো একটা ক্যাচ নিয়ে কিংবা ভালো ফিল্ডিং করে বোলারদের উজ্জীবিত করতে পারে। কিন্তু আমাদের ফিল্ডাররা যেন মাঠে নেতিয়ে পড়ে!’
এত নেতিবাচকতার মধ্যে বাংলাদেশের একজন কেবল রাজার আসনে বসে আছেন। পুরো টুর্নামেন্টে তাকে খানিকটা সাহায্য করতে পারলেই বাংলাদেশের সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্ন পূরণ হতো হয়তো। কিন্তু সাকিবকে সঙ্গ দিতে পারেননি সতীর্থরা। তাই শেষ চারে খেলার আশা বাদ দিয়ে মাশরাফির দল এখন দেশের মাটিতে।