বড়দের ক্রিকেটে তো বটেই, ছোটরাও ভারতের সঙ্গে দারুণ লড়াই করলেও সাফল্য হাত ফসকে গেছে অনেকবার। গত দুই বছরে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের লড়াইয়ে বাংলাদেশের হার সেটাই প্রমাণ করে। ২০১৮ সালে যুব এশিয়া কাপ সেমিফাইনালে মাত্র ২ রানে হেরে যায় স্বাগতিক বাংলাদেশ। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ভারতকে ১৭২ রানে আটকে দিলেও তারা থামে ১৭০ রানে। আর গত বছর আগস্টে ইংল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে তো পাত্তাই পায়নি বাংলাদেশ। ২৬১ রান করে হারে ৬ উইকেটে। পরের মাস সেপ্টেম্বরে দুই দল মুখোমুখি হয় এশিয়া কাপ ফাইনালে। ভারতকে ১০৬ রানে অলআউট করেও ম্যাচটা জিততে পারেনি বাংলাদেশ। ১০১ রানে অলআউট হয়ে আরেকটি হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়। টানা তৃতীয় ফাইনালে ভারত গেরো কাটালো বাংলাদেশ, তাও আবার বিশ্বমঞ্চে।
আজ রবিবার দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে ১৭৭ রানে ভারতকে থামিয়েছিল বাংলাদেশ। তানজিদ হাসান ও পারভেজ হোসেনের উদ্বোধনী জুটিতে শুরুটা হয় প্রত্যাশামতো। কিন্তু ভারতের স্পিনার রবি বিশনয়ের ঘূর্ণিতে হঠাৎ ওলট-পালট বাংলাদেশ। ঘুরে-ফিরে আসছিল আবার না জানি ভারত জুজুতে পরাস্ত হয় তারা! হার মানেনি তারা, হাল ধরেন অধিনায়ক আকবর। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তাকে নিয়ে আশা জাগানিয়া এক জুটি গড়েন পারভেজ হোসেন। তাতেই যেন লড়াইয়ে ফেরে বাংলাদেশ। পারভেজ বিদায় নিলে আবার ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়। এবার আকবরকে উপযুক্ত সঙ্গ দেন রাকিবুল হাসান। এক প্রান্ত আগলে রাখেন তিনি। আর দলকে এগিয়ে নিতে থাকেন আকবর। সব বাধা পেরিয়ে তার ব্যাটেই অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে বাংলাদেশ। ম্যাচসেরাও হয়েছেন আকবর।
প্রথম থেকে শুরুটা ভালো ছিল বাংলাদেশের, ওই ওভারে দলের ১৩ রান সংগ্রহে তানজিদ দুটি চার মারেন। পরের ওভারে একটি বাউন্ডারি মারেন পারভেজ। নবম ওভারের দ্বিতীয় বলে একমাত্র ছয় মেরে দলকে পঞ্চাশের ঘরে নেন তানজিদ। কিন্তু দলীয় স্কোর হাফসেঞ্চুরি হতেই জুটি ভাঙে তাদের। রবি বিশনয়ের বলে কার্তিক ত্যাগীর ক্যাচ হন তানজিদ, ২৫ বলে করেন ১৭ রান।
এরপর বিশনয় আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। প্রথম ওভারে উদ্বোধনী জুটি ভাঙা ভারতীয় স্পিনার পরের ওভার কোনও উইকেট পাননি। নিজের চতুর্থ ও পঞ্চম ওভারে আরও দুই উইকেট নেন এ লেগ স্পিনার। তৌহিদ হৃদয় এলবিডাব্লিউ হন রানের খাতা না খুলে। পরের ওভারে শাহাদাত হোসেন স্টাম্পিং হন মাত্র ১ রান করে। ব্যাটিং সীমানার বাইরে ছিল তার পা, স্টাম্প ভেঙে দেন উইকেটকিপার ধ্রুব জুরেল।
৬৫ রানে ৪ উইকেটের সবগুলোই নেন বিশনয়। তার স্পিন দাপটের পর আকবরের সঙ্গে শামীম হোসেনের ২০ রানের জুটি ভাঙেন সুশান্ত মিশ্র। ১৮ বলে ৭ রান করে যশস্বী জয়সাওয়ালের ক্যাচ হন শামীম।
২৩তম ওভারে দুইবার জীবন পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি অভিষেক দাস। সুশান্তের দ্বিতীয় বলে তার শটে শূন্যে ভেসে বল ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে বিশনয়ের হাতের ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়ে। পরের বলে চার মেরেছিলেন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান। আরেকবার জীবন পান অভিষেক, এবার ক্যাচ ছাড়েন তিলক ভার্মা। ৩ বলের ব্যবধানে দুইবার জীবন পেয়েও পরের বলে হুক করতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগ থেকে দৌড়ে আসা কার্তিক ত্যাগীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। ৭ বলে মাত্র ৫ রান করেন অভিষেক।
তার বিদায়ের পর মাঠে নামেন রিটায়ার্ড হার্ট হওয়া পারভেজ। ১০২ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর আকবর আলী ও পারভেজের জুটিতে লড়াইয়ে ফেরে বাংলাদেশ। ৪১ রানে তাদের জুটি ভেঙে আবারও উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে ভারত। ৭৯ বলে ৭ চারে ৪৭ রানে যশস্বী জয়সাওয়ালের শিকার হন পারভেজ, আকাশ সিং তার ক্যাচ নেন।
সেট হওয়া আকবরের সঙ্গে দাঁড়িয়ে যান রাকিবুল হাসান। দুজনের ধীর ব্যাটে জয়ের পথে ছুটতে থাকে বাংলাদেশ। ৪১ ওভার শেষে বৃষ্টি নামলে তাদের দরকার ছিল ৫৪ বলে ১৫ রান। কিছুক্ষণ পর আবার মাঠে নামলে ডাকওয়ার্থ লুইসে কেটেছেঁটে দাঁড়ায় ৩০ বলে ৭ রান। ২৩ বল হাতে রেখেই লক্ষ্যে পৌঁছায় বাংলাদেশ। ৪৩তম ওভারের প্রথম বলে একটি সিঙ্গেল নিয়ে দেশকে বিজয় উৎসবে মাতান রাকিবুল। ১০.১ ওভারে ২৭ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ার পথে ৪৩ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। ৭৭ বলে চারটি চার ও একটি ছয়ে সাজানো তার ইনিংস। আর ২৫ বলে ৯ রানে খেলছিলেন রাকিবুল। ৪৬ ওভারে ১৭০ রানের লক্ষ্য বাংলাদেশ ৪২.১ ওভারে পূরণ করে ৭ উইকেট হারিয়ে।
এর আগে ভারতকে ৪৭.২ ওভারে ১৭৭ রানে অলআউট করে বাংলাদেশ। শরিফুল ইসলাম দলীয় ১৫৬ রানে জয়সাওয়ালকে ফেরানোর পর রানের লাগাম টেনে ধরে তারা। ২১ রানে শেষ ৭ উইকেট হারায় ভারত।
বাংলাদেশের পক্ষে অভিষেক দাস সর্বোচ্চ ৩ উইকেট নেন। দুটি করে পান তানজিম হাসান সাকিব ও শরিফুল।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ভারত: ৪৭.২ ওভারে ১৭৭ (জয়সাওয়াল ৮৮, সাক্সেনা ২, তিলক ৩৮, প্রিয়ম ৭, জুরেল ২২, বীর ০, আনকোলেকার ৩, বিশনয় ২, সুশান্ত ৩, কার্তিক ০, আকাশ ১; শরিফুল ২/৩১, সাকিব ২/২৮, অভিষেক ৩/৪০, রাকিবুল ১/২৯)
বাংলাদেশ: ৪২.১ ওভারে ১৭০/৭ (৪৬ ওভারে লক্ষ্য ১৭০) (পারভেজ ৪৭, তানজিদ ১৭, মাহমুদুল ৮, তৌহিদ ০, শাহাদাত ১, আকবর ৪৩*, শামীম ৭, অভিষেক ৫, রাকিবুল ৯*; বিশনয় ৪/৩০, সুশান্ত ২/২৫, জয়সাওয়াল ১/১৫)
ফল: ডি/এল এ বাংলাদেশ ৩ উইকেটে জয়ী
ম্যাচসেরা: আকবর আলী
টুর্নামেন্ট সেরা: যশস্বী জয়সাওয়াল
Bangladesh lift the ICC U19 World Cup trophy for the first time!#U19CWC | #INDvBAN | #FutureStars pic.twitter.com/h9Ol7Btdha
— Cricket World Cup (@cricketworldcup) February 9, 2020