ফেরার বিমানে উঠেও ট্রফিতেই চোখ আকবরদের

ঘরে ফেরার বিমানে ওঠার আগে হোটেলের লবিতে বিশ্বজয়ীদের সেলফিমধুর, কিন্তু যন্ত্রণাময় অপেক্ষা। বিশ্বজয়ী যুবাদের আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। ট্রফি সামনে নিয়েই শরিফুল-রাকিবুলরা জোহানেসবার্গের হোটেলে বসে ছিলেন। স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে রাত ১০টার ফ্লাইটে দেশে ফিরবে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল। বুধবার বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভিড়বে বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটারদের বিমান।

বিশ্বকাপ শেষের পর দুটি দিন দক্ষিণ আফ্রিকাতেই কাটাতে হয়েছে বাংলাদেশের যুব ক্রিকেটারদের। রবিবারের ফাইনালের পরেরদিন সোমবার ছিল রিজার্ভ ডে। ম্যাচটি নির্ধারিত দিনেই হয়ে যাওয়ার কারণে সোমবার কেটেছে অলস সময়। যদিও দিনটি কাজেই লেগেছে। ফাইনালের ভেন্যু পচেফস্ট্রুম থেকে সোমবার সকালে জোহানেসবার্গে যায় আকবরের দল। সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আতিথেয়তার মধ্যেই চলেছে কেনাকাটা। কেউ কেউ স্টাইল করে চুল-দাড়ি কেটেছেন। চেহারাটাকে কি একটু বেশি চ্যাম্পিয়নসুলভ করে তোলা উচিত নয়!

শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে অধিনায়ক আকবর আলী খেলেছেন ম্যাচ জেতানো অপরাজিত ৪৩ রানের ইনিংস। ইস্পাত-স্নায়ুর এই ইনিংসের পর আকবরকে ‘আকবর দ্য গ্রেট’ বলা হচ্ছে। তবে দেশকে ট্রফি দিতে পেরেই গর্বিত আকবর। আজ সন্ধ্যায় বিমানে ওঠার আগে আকবর বাংলা ট্রিবিউনকে জানালেন গভীর তৃপ্তির কথা, ‘দেশকে কিছু দিতে পারাটা সব সময়ই বিশেষ কিছু। আমি গর্বিত যে আমার নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জিতেছে দল। তবে কৃতিত্ব আমার একার নয়। টিম ম্যানেজমেন্ট, খেলোয়াড়, বিসিবি- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সাফল্য। দেশবাসীকে খুশি করে, ট্রফি সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার আনন্দটা অন্যরকম।’

ক্রিকেটাররা এতটাই উচ্ছ্বসিত যে খেলার মধ্যে পাওয়া ব্যথা যেমন একেবারেই ভুলে গেছেন পেসার তানজিম হাসান সাকিব, ‘ভারতের বিপক্ষে জয়ে শরীরের ব্যথা-বেদনা সব চলে গেছে। আগের রাতটা বেশ আনন্দে কেটেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজ আমাদের দাওয়াত দিয়েছিল। ওখানে গিয়েছিলাম। এখন রুমে বসে অপেক্ষায় আছি বিমানে ওঠার। দেশে কখন ফিরবো, এর জন্য অস্থির লাগছে।’

দক্ষিণ আফ্রিকায় পুরো টুর্নামেন্টটাই ডাগআউটে বসে কেটেছে প্রান্তিক নওরোজ নাবিলের। মাঠে নামার সুযোগ না পেলেও ডাগআউটে বসেও ‘ভালো খেলেছেন’, ‘স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পর যেমন লাগে তেমন অনুভূতি। এই ভালো লাগা ভাষায় প্রকাশ করে বোঝানো যাবে না। তামিম-ইমন ভাই যেভাবে খেলেছে তাতে আমার ম্যাচ খেলার সুযোগ ছিল না। তাই বলে আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। আমি মাঠের বাইরে থেকে দায়িত্ব পালন করেছি। হয়তো আমার চিৎকার চেঁচামেচির জন্য কেউ ভুল করেনি!’ মামাতো ভাই রাজীব আল মামুনের কারণেই ক্রিকেটে আসা প্রান্তিকের। এমন অর্জনের সময়টাতে প্রিয় মানুষটির কথা ভুলে যাননি প্রান্তিক, ‘সময়টা কাজে লাগাচ্ছি। চুল কেটেছি। পুমা জুতো, রানিং জুতো কিনেছি। মামাতো ভাইয়ের মেয়ের জন্য শপিং করেছি, চকলেট কিনেছি।’

পায়ে ক্র্যাম্প হওয়ার পর মাঠ ছেড়ে গিয়েছিলেন পারভেজ ইমন। আর খেলতে পারেন কিনা, সেটি নিয়ে ছিল সংশয়। কিন্তু প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে আবারও মাঠে নেমে দলকে জয়ের অনেকটা কাছে পৌঁছে দিয়ে যান ইমন। তারপরও খানিকটা আক্ষেপ রয়ে গেছে চট্টগ্রামের ক্রিকেটারের, ‘ব্যথা নিয়ে দৌড়াতে পারিনি। মাঠে উদযাপনটা তাই ঠিকমতো করতে পারিনি। তবে ভালো লাগছে সবার খুশি দেখে। অনেক জায়গা থেকে শুভেচ্ছা পাচ্ছি। প্রবাসীরা আমাদের সঙ্গে ছবি তুলছে, খুব ভালো লাগছে। নিজেদের চ্যাম্পিয়ন চ্যাম্পিয়ন মনে হচ্ছে।’

কঠিন সংগ্রাম করে ক্রিকেটে আসা শাহাদাত হোসেনের। ফাইনালে তার ব্যাট না হাসলেও আগের তিনটি ম্যাচে দুর্দান্ত খেলেছেন। তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পেছনে মা ফেরদৌস বেগম, বড় ভাই আবুল হোসাইন এবং বড় ভাইয়ের বন্ধু সুদীপ্ত দেবের জন্য ‘সারপ্রাইজ’ নিয়ে যাচ্ছেন শাহাদাত। ট্রফি জয়ের পাশাপাশি এটাও শাহাদাতকে কম রোমাঞ্চিত করছে না, ‘দেশে ফেরার জন্য অস্থির লাগছে। সারাক্ষণ ট্রফির সামনে থাকতে ইচ্ছে করছে। কিছু কেনাকাটা করেছি, সবাইকে সারপ্রাইজ দেবো!’

ফিল্ডিং কোচ ফয়সাল হোসেন ডিকেন্সের সঙ্গে অধিনায়ক আকবর আলীদক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে একাদশে ছিলেন হাসান মুরাদ। তার বাঁহাতি স্পিন বেশ বেগ দিয়েছে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের। তার কাছে বিশ্বজয় এখনও কেমন যেন অলীক ব্যাপার, ‘কি বলবো, অন্যরকম অনুভূতি। এখনও মাঝেমধ্যে চিমটি কেটে দেখি, স্বপ্ন কি না। যখনই ট্রফিটা দেখি, কেমন যেন লাগে।’

চাঁদপুর থেকে উঠে এসেছেন শামীম হোসেন। শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল শেষের অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়ে শাস্তি পেয়েছেন তিনি। তবে এসব তাকে এতটুকু বিচলিত করতে পারেনি গত দুটি দিনের আনন্দময় মুহূর্তগুলোর কারণে, ‘শাস্তি নিয়ে আমি হতাশ না। বাংলাদেশকে একটা ট্রফি দিতে পেরেছি, এটাই আনন্দের। জীবনে এমন অনুভূতি কখনও হয়নি।’

বাংলাদেশ দলের অন্যতম বোলিং স্তম্ভ শরিফুল ইসলাম। বাসায় যেতে তর সইছে না পঞ্চগড়ের বাঁহাতি পেসারের। ভারতকে হারিয়েছে বলেই শরিফুলের মনে আনন্দ ডানা মেলেছে সবচেয়ে বেশি। গত দুই বছরে তিনবার যে ভারতের কাছে হারতে হয়েছে, তাদের হারানোর আনন্দই যে আলাদা, ‘কখন বাসায় যাবো সেই চিন্তায় আছি। ট্রফি জিততে দুই বছর খুব কষ্ট করেছি। ভারতকে হারিয়ে ট্রফি জেতার আনন্দই অন্যরকম। ভালো লাগার অনুভূতিটা আসলে প্রকাশ করতে পারবো না।’

গ্রুপ পর্বে পাকিস্তানের সঙ্গে বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত ম্যাচটিতেই খেলেছিলেন অভিষেক। কিন্তু ফাইনালে টিম ম্যানেজমেন্ট অভিষেকের ওপরই আস্থা রেখেছে। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে জার্মানির মারিও গোটসে বদলি নেমে গোল করে হারিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে। হাসান মুরাদের বদলে ফাইনালে ‍সুযোগ পাওয়া অভিষেককে গোটসের উদাহরণ টেনে অনুপ্রাণিত করেন অধিনায়ক। সত্যিই অনুপ্রাণিত হতে পেরেছিলেন অভিষেক, ‘গত দুইদিনে অনেকের কাছ থেকে শুভেচ্ছা পেয়েছি। ফাইনালের আগে অধিনায়ক আমাকে আর্জেন্টিনা-জার্মানি ফাইনালে গোটসের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। ফাইনাল জিততে পেরেছি, দারুণ ব্যাপার। এখন অপেক্ষা, কখন বাড়ি ফিরবো!’

শামীম-তৌহিদের মতোই শাস্তি পেয়েছেন রাকিবুল। ফাইনালে তার ব্যাট থেকেই এসেছে বাংলাদেশের জয়সূচক রান। ট্রফির দিকে তাকিয়েই শাস্তিটা ভুলে যাচ্ছেন টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি, ‘ট্রফি নিয়েই সময় কাটছে। কতটা ভালো লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না। এক কথায় অবিস্মরণীয় অর্জন।’