৫০০ টি-টোয়েন্টির পোলার্ড

কাইরন পোলার্ড২০১০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। বয়স তখন তার মাত্র ২৩। একজন খেলোয়াড়ের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রবেশের সময়। ‍আর এই বয়সেই কিনা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করলেন কাইরন পোলার্ড! টি-টোয়েন্টিতে স্বাধীনভাবে খেলতেই ক্যারিবিয়ান অলরাউন্ডার নিলেন চোখ কপালে তোলার মতো সিদ্ধান্ত।

সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে কি আর সময় লাগে? মাইকেল হোল্ডিং যেমন বলেছিলেন, ‘সে খেলোয়াড়রই নয়।’ যে দৃষ্টিভঙ্গিতে ক্যারিবিয়ান সাবেক পেসার মন্তব্যটি করেছিলেন, সেটি পুরোপুরি ঠিক। পোলার্ড তখন কি-ইবা করেছেন। এখন ‍তিনি আসলে ক্রিকেটারের চেয়ে বেশি কিছু।  ক্রিকেটে একজন পথিকৃৎ, টি-টোয়েন্টির অগ্রপথিক। যখন কিনা টি-টোয়েন্টি শৈশবে বিচরণ করছিল এবং ভবিষ্যৎ ছিল অস্পষ্ট, তখনই সাহস দেখিয়েছিলেন বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি বাতিল করার। ক্রিকেটারের চেয়ে বড় কিছু না হলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব।

এই ধরনের ক্রিকেটারের সংখ্যা হাতে গোনা। মাত্র দুজন আছেন, যারা টি-টোয়েন্টিতেই ক্যারিয়ার সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একজন পোলার্ডের মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স সতীর্থ মিচেল ম্যাকলেনাহান, ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ান। অন্যজন সম্প্রতি বোর্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা আফগানিস্তানের ২০ বছর বয়সী পেসার নাভিদ-উল-হক। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ বেছে নেওয়ার জন্য পোলার্ডকে তারা ধন্যবাদ দিতেই পারেন!

হঠাৎ করে পোলার্ডের টি-টোয়েন্টি বিপ্লব নিয়ে এত আলোচনার কারণ অবশ্যই আছে। টি-টোয়েন্টি ঘিরে যিনি স্বপ্নের রাজ্য গড়েছেন, সেই পোলার্ড আজ (বুধবার) শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাল্লেকেলের ম্যাচ দিয়ে গড়েছেন অনন্য এক কীর্তি। তিনিই ৫০০ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলা প্রথম ক্রিকেটার। আরেকটি মাইলফলকও হাতছানি দিচ্ছে ক্যারিবিয়ান হার্ডহিটারকে। আর ৩৪ রান করলেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ক্রিস গেইলের পর ১০ হাজার রান পূরণ করবেন তিনি।

টি-টোয়েন্টিতে তার বর্ণিল ক্যারিয়ারের শুরুটা ২০০৬ সালে অ্যান্টিগার স্ট্যানফোর্ড টুর্নামেন্ট দিয়ে। ওই সময় প্রথম শ্রেণি, এমনকি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচও খেলার অভিজ্ঞতা ছিল না ৩২ বছর বয়সী অলরাউন্ডারের। ওই প্রতিযোগিতায় পোলার্ডের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ‘বিশেষ কিছু’। অবলীলায় যেমন ছক্কা হাঁকাতে পারেন, তেমনি বৈচিত্র্যময় পেস বোলিংয়ে ব্যাটসম্যানদের বোকা বানাতেও পারদর্শী। বাড়তি রসদ জোগান দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ে। সোজা কথায়, টি-টোয়েন্টির ‘পারফেক্ট প্যাকেজ’।

অ্যান্টিগার টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে মাত্র ৩৮ বলে ৮৩ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলে জানান দেন কতটা নির্দয় হতে পারেন তিনি বোলারদের ওপর। তিন বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগ টি-টোয়েন্টিতে আরও ভয়ঙ্কর পোলার্ড। হায়দরাবাদের ম্যাচে ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর জিততে ২৪ বলে দরকার ছিল ৫১ রান। পোলার্ড ঝড়ে (১৮ বলে ৫৪*) ৯ বল আগেই নিউ সাউথ ওয়েলসকে হারায় ক্যারিবিয়ান দলটি।

ক্রিকেট বিশ্বের মানচিত্রে নিজের নাম খোদাই করে দেওয়া পোলার্ডকে দলে টানতে ২০১০ সালে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স তাই খরচ করে সাড়ে ৭ লাখ ডলার। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে সে সময় ভাবা হয়েছিল মুম্বাইয়ের ‍সঙ্গেও সংসার বেশিদিন টিকবে না। কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমাণ ‍করে এখনও মুম্বাইয়ের জার্সি গায়েই আইপিএল মাতিয়ে যাচ্ছেন ৩২ বছর বয়সী অলরাউন্ডার। বিশ্বের সবচেয়ে জমজমাট টি-টোয়েন্টি আসরে দলবদল না করে এক ফ্র্যাঞ্চাইজিতেই খেলছেন, এমন ক্রিকেটারের সংখ্যা খুব বেশি নয়। মুম্বাই যেমন তাকে হাসিখুশি রেখেছেন, প্রতিদানে তিনিও আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছেন ফ্র্যাঞ্চাইজিটিকে। দলটির ২০১৩, ২০১৫, ২০১৭ ও ২০১৯ সালের ট্রফি জেতার পথে ক্যারিবিয়ান অলরাউন্ডারের অবদান অনেক।

রান তাড়া করতে নেমে জটিল সমীকরণ মিলিয়ে দেওয়ার অনেক উদাহরণ আছে পোলার্ডের। বোলিংয়েও তিনি কার্যকরী, যদিও এখন খুব একটা বল করেন না। এরপরও টি-টোয়েন্টিতে ৭ হাজার রান ও ২৫০ উইকেট পাওয়া একমাত্র ক্রিকেটার তিনিই। অঙ্কটা কমিয়ে যদি ৬ হাজার রান ও ২০০ উইকেট করা হয়,  সেখানেও তিনি ছাড়া মাত্র তিন ক্রিকেটার ডোয়াইন ব্রাভো, রবি বোপারা ও শেন ওয়াটসন।

পোলার্ড এবার ছুঁলেন আরেকটি মাইলফলক। ৫০০ টি-টোয়েন্টি খেলা প্রথম ক্রিকেটার।