করোনাকালে ক্রিকেট কোচদের আকুতি

একাডেমির কোচদের হাতেই গড়ে ওঠে আগামীর তারকাকরোনাভাইরাসের সংক্রমণে স্থবির হয়ে আছে গোটা বিশ্বের ক্রিকেটাঙ্গন। বাংলাদেশেও সব ধরনের ক্রিকেট বন্ধ। বিসিবির তত্ত্বাবধানে থাকা কোচ-ক্রিকেটাররা আর্থিক সহায়তা পেলেও একেবারে কিছুই পাচ্ছেন না বিভিন্ন জেলায় একাডেমি চালানো ক্রিকেট কোচরা। ভয়ঙ্কর করোনাভাইরাসের চেয়ে এই মুহূর্তে তাদের কাছে বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছে পরিবার চালানোর দুশ্চিন্তা।

গাজীপুর জেলার সাবেক ক্রিকেটার ও রাজেন্দ্রপুর ক্রিকেট একাডেমির কোচ রুহুল আমিন, বনশ্রীর ক্রিকেট একাডেমির কোচ রাজু আহমেদসহ বিভিন্ন একাডেমির কোচরা করোনাকালে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিসিবির কাছে বেঁচে থাকা আকুতি জানিয়েছেন।

রাজধানীতে বিসিবির তালিকাভুক্ত একাডেমি আছে ৮৬টি। অথচ সারাদেশে প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজারের বেশি একাডেমিতে ২ হাজার ক্রিকেট কোচ রয়েছেন। এছাড়াও রেজিষ্ট্রেশন ছাড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরও ১০০ থেকে ১৫০ একাডেমি। যেগুলো প্রাইভেটভাবে চলছে। কিন্তু সব বন্ধ থাকায় তাদের জীবনও হয়ে উঠেছে অতিষ্ঠ।

রাজেন্দ্রপুর ক্রিকেট একাডেমির কোচ রুহুল আমিনের সুযোগ হয়েছে জাতীয় পর্যায়ে কাজ করার। গাজীপুর জেলার বয়সভিত্তিক দলের সহকারী কোচ হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ঢাকা বিভাগের অনূর্ধ্ব-১৪ দলের ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

করোনার এই কঠিন সময়ে রাজেন্দ্রপুর একাডেমির এই কোচের আকুতি, ‘ক্রিকেটই আমার সব ধ্যান-জ্ঞান, ভালোবাসা। ক্রিকেট দিয়েই রুটি-রুজি, ক্রিকেটময় করে রেখেছি জীবনটা, তারপরও কেন এত অবহেলা? কাকে দোষ দেবো? না পেলাম প্রধানমন্ত্রীর উপহার, না পেলাম বিসিবি, ক্রিকেটার কিংবা ক্রিকেটারদের সুখে-দুঃখে সবসময় পাশে থেকে কাজ করে যাওয়া ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে (কোয়াব)। কেন, কী সমস্যা আমার, আমার মতো ছোট কোচদের?’

বর্তমান ক্রিকেটাররা অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় সাহায্য করলেও রুহুল আমিন হতাশ কোনও সহায়তা না পাওয়ায়। ‘মুশফিক, তামিম, সাকিব, মাশরাফির মতো গ্রেটরা নিলাম করে সাহায্য তুলে অসহায় ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন, বণ্টন করছেন কোটি টাকা। কই আমি তো একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে এক টাকাও পেলাম না। যদি সত্যিকারের ক্ষতিগ্রস্ত-অসহায় হয়ে পড়াদের জন্যই আপনাদের দান, তাহলে আমি কেন পাচ্ছি না?’- ক্রিকেটারদের কাছে প্রশ্ন রাখলেন রুহুল আমিন।

বনশ্রীর একটি একাডেমির দায়িত্বে থাকা কোচ রাজু আহমেদের কণ্ঠেও একই আকুতি, ‘দেশের মহা দুর্যোগের সময় করোনাভাইরাসের কারণে শতশত ক্রিকেট একাডেমির কাজ বন্ধ। অনেক একাডেমি কোচরা একাডেমি বন্ধ থাকায় খুব কষ্টে জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের এত উন্নতি হয়েছে, অথচ খেলোয়াড় গড়ার কাজে নিয়োজিত একাডেমির কোচরা অবহেলায় রয়ে গেল! তাই আমাদের প্রিয় অভিভাবক বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সম্মানিত সভাপতি মহোদয় আপনার কাছে আমাদের আকুল আবেদন সব ক্রিকেট কোচকে ন্যূনতম সাহায্য সহযোগিতা করা যায় কিনা ভেবে দেখবেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার এক একাডেমির কোচ বিসিবি ও সিনিয়র ক্রিকেটারদের ওপর আঙুল তুলেছেন। তার কথা, ‘পত্রিকায়, টিভিতে দেখছি বিসিবি ও ক্রিকেটাররা অসহায়দের সাহায্য করছে। কিন্তু সেই সাহায্য কোথায় যাচ্ছে। আমরা যারা ‍তৃণমূল ক্রিকেটারদের নিয়ে কাজ করছি, তাদেরকে কি সিনিয়র ক্রিকেটাররা কিংবা বিসিবি দেখে না? সব বন্ধ থাকায় মানবেতন জীবনযাপন করছি। এভাবে আর কত দিন বেঁচে থাকতে পারব, সত্যিই জানা নেই।’

বিসিবি ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট সবাইকেই কমবেশি আর্থিক সাহায্য করার চেষ্টা করছে। আগামীতেও সেই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী, ‘গত কয়েক মাস ধরে আমরা চলমান একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সবাইকে সহযোগিতা করছি। প্রতিটি জেলাতে বিসিবির সাহায্য পৌঁছে যাবে। যারা পায়নি তারও পেয়ে যাবেন।’

এদিকে ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল তাদের ফান্ডের অবস্থার ওপর ভিত্তি করেই একাডেমি ও একাডেমি কোচদের সাহায্য করার কথা জানালেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘সবার কষ্টের কথা চিন্তা করেই কিন্তু আমরা ফান্ড গঠন করেছি। এই ফান্ড গঠনের একমাত্র উদ্দেশ্য ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট কেউই যেন কষ্টে না থাকে। ইতিমধ্যে আমরা ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ৪৫ জন কোচকে সহযোগিতা করেছি। আপানারা জানেন পুরো বাংলাদেশে একাডেমির সংখ্যা অনেক। বর্তমানে ফান্ডের যা অবস্থা, তাতে করে আমাদের সবার কাছে সাহায্য পাঠানো সম্ভব নয়। আমাদের ফান্ডটা বাড়লেই আমরা এ ব্যাপারে পরবর্তী উদ্যোগ গ্রহণ করব।’