শ্রীলঙ্কার স্পিনাররা যেভাবে টার্ন পেয়েছেন উইকেট থেকে, তাতে বাংলাদেশের স্পিনারদের জন্যও অপেক্ষা করছিল দারুণ কিছু। আর সেটি একেবারে শুরু থেকেই পেলেন তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ। ফলে ব্যাটিং ব্যর্থতায় জমাট বাঁধা হতাশার মেঘ কেটে কিছুটা হলেও স্বস্তি নিয়ে দিন শেষ করতে পেরেছে বাংলাদেশ।
ক্যান্ডি টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ১৭ রান তুলতে ২ উইকেট হারিয়েছে শ্রীলঙ্কা। ২৪২ রানে এগিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করা স্বাগতিকরা লিড নিয়েছে ২৫৯ রানের। চতুর্থ দিন শুরু করবেন দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান দিমুথ করুণারত্নে (১৩) ও অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজ (১)।
আউট হয়েছেন ওপেনার লাহিরু থিরিমানে ও ওয়ান ডাউনে নামা ওশাডা ফার্নান্ডো। ব্যাটিংয়ে হতাশ করা বাংলাদেশকে বোলিংয়ে প্রথম সাফল্য এনে দেন মিরাজ। এই অফস্পিনারের হালকা বাঁক নেওয়া বল থিরিমানের ব্যাটে চুমু দিয়ে জমা পড়ে স্লিপে থাকা নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে। ফেরার আগে প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান করেন মাত্র ২ রান। ওশাডা তো রানের খাতাই খুলতে পারেননি। তাইজুলের বল ডাউন দ্য উইকেটে খেলতে এলে লিটন দাসের স্টাম্পিংয়ের শিকার তিনি।
বাংলাদেশের ২৫১
এর আগে শ্রীলঙ্কা ৭ উইকেটে ৪৯৩ রানে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করলে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে অলআউট হয় ২৫১ রানে। প্রবীণ জয়াবিক্রমার ঘূর্ণিতে দিশেহারা বাংলাদেশ ফলোঅন এড়াতে পারেনি। যদিও সফরকারীদের ফলোঅন না করিয়ে ২৪২ রানে এগিয়ে থাকা শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নামে।
ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে জয়াবিক্রমা ৯২ রান দিয়ে নিয়েছেন ৬ উইকেট। বাংলাদেশকে ধসিয়ে দিতে ২টি করে উইকেট শিকার রমেশ মেন্ডিস ও সুরঙ্গা লাকমালের। তাদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে সামনে, বিশেষ করে জয়াবিক্রমার ঘূর্ণিতে ভেঙে পড়ে মিডল ও লোয়ার অর্ডার। মুমিনুল হকের বিদায়ের পর একে একে ব্যর্থতার মিছিলে যোগ দেন লিটন দাস (৮), মেহেদী হাসান মিরাজ (১৬), তাইজুল ইসলাম (৯), তাসকিন আহমেদ (০), শরিফুল ইসলাম (০)।
বিপদ শুরু মুশফিকের বিদায়ে
বিপদের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল আসলে মুশফিকুর রহিমের আউটের পর। ক্রিজে এসেই খেলছিলেন তিনি সেট ব্যাটসম্যানের মতো। সময় গড়ানোর সঙ্গে আরও গুছিয়ে নেন সবকিছু। তাতে বড় ইনিংসের ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কার রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত ‘সর্বনাশ’ ডেকে আনলো তার। আম্পায়ার এলবিডাব্লিউয়ের আবেদনে সাড়া না দিলে লম্বা আলোচনার পর রিভিউ নেয় লঙ্কানরা। তাদের সেই সিদ্ধান্ত সঠিক হওয়ায় কপাল পোড়ে মুশফিকের। আউট হয়ে যান ৪০ রানে।
প্রবীণ জয়াবিক্রমার বল মুশফিকের পায়ে আঘাত করলে ওঠে জোরালো আবেদন। কিন্তু সাড়া দেননি আম্পায়ার। লঙ্কান খেলোয়াড়রা বেশ খানিকটা সময় নিজেদের মধ্যে আলোচনার পর একেবারে রিভিউ নেওয়ার টাইম শেষ হওয়া মুহূর্তে সিদ্ধান্তের চ্যালেঞ্জ জানান। থার্ড আম্পায়ারের কাছে যাওয়া সিদ্ধান্তের রায় শ্রীলঙ্কার পক্ষেই আসে। এলবিডাব্লিউর শিকার হওয়ার আগে মুশফিক ৬২ বলের ইনিংসটি সাজান ৭ বাউন্ডারিতে।
মুশফিকের বিদায়ে এমনিতেই চাপ তৈরি হয়েছিল। সেখানে চা বিরতির পর দ্রুত ২ উইকেট হারিয়ে বিপদে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কার দুই স্পিনার প্রবীণ জয়াবিক্রমা ও রমেশ মেন্ডিসের ঘূর্ণিতে পথ হারিয়েছে সফরকারীরা। প্রথম আঘাতটা মেন্ডিসের। ডানহাতি স্পিনারের বলে এলবিডাব্লিউর ফাঁদে পড়েন মুমিনুল। ইয়র্কার লেন্থের বল সরাসরি আঘাত করে বাংলাদেশ অধিনায়কের পায়ে। আম্পায়ার আউটের সংকেত দিলে ৪৯ রানে শেষ হয় মুমিনুলের ইনিংস। ১০৪ বলের ইনিংসটি তিনি সাজান ৭ বাউন্ডারিতে।
ওই ধাক্কা কাটিয়ে উঠবে কী, উল্টো বিপদ বাড়ে লিটনের বিদায়ে। জয়াবিক্রমার বাঁক নেওয়া বল তার ব্যাটে লেগে জমা পড়ে স্লিপে দাঁড়ানো লাহিরু থিরিমানের হাতে। তাতে শেষ হয় লিটনের ৮ রানের ইনিংস।
তামিমের দারুণ ইনিংসেও আক্ষেপ
এর আগে দারুণ এক ইনিংস খেলে শক্ত ভিত গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন তামিম। যদিও গোটা পথ লাইনে থেকে তীরে এসে তরী ডুবাচ্ছেন তামিম ইকবাল। তা নয়তো কী! দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরির কাছে গিয়েও যন্ত্রণার আগুনে পুড়তে হচ্ছে এই ওপেনারকে। আগের টেস্টেও দুটি সম্ভাবনার ‘মৃত্যু’ হয়েছিল। দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে আরেকটু কাছে গিয়ে থামতে হলো তামিমকে। আউট হয়েছেন ৯২ রানে।
আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরির দিকে ছুটছিলেন বাঁহাতি ওপেনার। লাঞ্চের পর কিছুটা লাগাম টানলেও সেঞ্চুরির পথে ছিলেন। কিন্তু প্রবীণ জয়াবিক্রমার বলে ঘায়েল তিনি। স্লিপে লাহিরু থিরিমানের হাতে যখন ধরা পড়েন, সেঞ্চুরি থেকে ছিলেন মাত্র ৮ রান দূরে। চলতি সিরিজের তিন ইনিংসেই সেঞ্চুরি মিসের আক্ষেপে পুড়তে হলো তাকে। ১৫০ বলের ইনিংসটি তামিম সাজান ১২ বাউন্ডারিতে।
প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি করতে দেয়নি বৃষ্টি। পঞ্চম দিনে বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে ৭০ রানে অপরাজিত ছিলেন। এরপর আর ম্যাচ শুরু না হওয়ায় ব্যাটিংয়ের সুযোগ মেলেনি তামিমের। প্রথম ইনিংসে আবার গিয়েছিলেন আরও কাছে। দারুণ এক ইনিংস শেষ হয়েছিল তামিমের ৯০ রানে। ওই দুই ইনিংসের জ্বালা জুড়ানোর সুযোগ এবার পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কষ্ট আরও বেড়েছে ৯২ রানে আউট হয়ে।
ভালো শুরু ও ব্যর্থতা
উইকেট অক্ষত রেখে ভালো সংগ্রহ দাঁড় করিয়ে প্রথম সেশন শেষ করার অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ। ৯৮ রানেও ছিল উইকেটশূন্য। কিন্তু স্কোরে ১ রান যোগ করতেই বাংলাদেশ হারালো ২ উইকেট। ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে চলতি সিরিজে সাইফ প্রথমবার যেতে পেরেছেন দুই অঙ্কের ঘরে। আগ্রাসী তামিমকে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দাঁড়িয়ে যাওয়া ইনিংসটি টেনে নিতে পারেননি এই ওপেনার। ২৫ রানে প্রবীণ জয়াবিক্রমার বলে ফিরে যান প্যাভিলিয়নে। বাঁহাতি স্পিনারের বাঁক নেওয়া বল তার ব্যাট ছুঁয়ে গেলে দ্বিতীয় স্লিপে দাঁড়ানো ধনাঞ্জয়া ডি সিলভা ক্যাচ নিতে ভুল করেননি।
সাইফের বিদায়ের ধাক্কা কাটতে না কাটতেই আবার উইকেট হারায় বাংলাদেশ। এবার হতাশ করেন শান্ত। প্রথম টেস্টের সেঞ্চুরিয়ানের বিদায়টা আরও কষ্টদায়ক। লাঞ্চ বিরতিতে যাওয়ার আগের বলেই তিনি আউট! রমেশ মেন্ডিসের বাঁকানো বল তার ব্যাটে লেগে গেলে স্লিপে ক্যাচ নেন লাহিরু থিরিমানে। তখনও রানের খাতা খোলা হয়নি শান্তর।
মাঝের সময়টা ভালো কাটলেও আবারও ব্যর্থতার চোরাবালিতে আটকে যায় বাংলাদেশ। তাই ২৫১ রানে শেষ হয় প্রথম ইনিংস।