তাসকিনের ব্যাটে রানের ফোয়ারা

বল হাতে দ্রুতবেগে এগিয়ে আসছেন, এরপর চমৎকার ইন সুইংয়ে স্টাম্প উপড়ে ফেললেন। তাসকিন আহমদের বলে এমন দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত সবাই। কিন্তু সেই তাসকিন ব্যাট হাতে চোখ জুড়ানো শটে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন, বিশ্বাস হতে কষ্ট হতে পারে। কিন্তু সত্যি এটাই। বাংলাদেশের পেসার তাসকিন জিম্বাবুয়ে সফরে গিয়ে কি তাহলে ব্যাটসম্যান হয়ে গেলেন?

হারারে টেস্টের দ্বিতীয় দিনে উজ্জ্বল আলোয় ভরিয়ে দিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। ১৬ মাস পর টেস্টে ফিরেই পেয়েছেন এই সংস্করণের পঞ্চম হাফসেঞ্চুরি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে তিনি যদি হন বাংলাদেশের ইনিংসের চালক, তাহলে তাসকিন তার ইঞ্জিন। তিনি ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠাতেই সফরকারীদের স্কোর ৪০০ ছাড়িয়ে আরও এগিয়ে যাওয়ার পথে।

কী কাভার ড্রাইভ, কী কাট কিংবা পুল- তাসকিন যেন পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান। টেস্ট ক্যারিয়ারে নিজের সর্বোচ্চ ইনিংস খেলে পেয়েছেন প্রথম হাফসেঞ্চুরি। এখানেই থামেননি, অসাধারণ ইনিংসটি এগিয়ে হেঁটে চলেছেন সেঞ্চুরির পথে। একই সঙ্গে নবম উইকেটে মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে গড়েছেন দেড়শ ছাড়ানো অবিচ্ছিন্ন জুটি।

১২০ ওভারে ৮ উইকেটে বাংলাদেশের রান যখন ৪৩৯, তাসকিন তখন অপরাজিত ৭৫ রানে। স্বপ্নের এই যাত্রায় তিন অঙ্কের ঘর ছুঁতে পারলে তাসকিন পূর্ণতা পাবেন নিঃসন্দেহে।

১৬ মাস পর ফিরেই মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরি

টেস্ট থেকে ছিলেন উপেক্ষিত। প্রত্যেক সিরিজের আগে আলোচনায় থাকতেন, কিন্তু স্কোয়াডে থাকতো না মাহমুদউল্লাহর নাম। এবার জিম্বাবুয়ে সিরিজের দলে সুযোগ হয় তাও দল ঘোষণার পরে। তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিমের চোট সমস্যার কারণে। এরপরও নিজেকে ‘লাকি’ ভাবতে পারেন মাহমুদউল্লাহ। অন্তত সুযোগটা তো হলো। ভাগ্যজোরে পাওয়া সুযোগটা কেন হেলায় নষ্ট করবেন তিনি! তাইতো ১৬ মাস পর টেস্ট ক্রিকেটে ফেরার উপলক্ষটা রাঙিয়ে নিলেন তিনি ঝলমলে সেঞ্চুরিতে।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে সবশেষ খেলেছিলেন টেস্ট ম্যাচ। এরপর আর নামা হয়নি টেস্ট জার্সিতে। খেলা তো দূরে থাক, স্কোয়াডেও জায়গা হচ্ছিল না এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের। তার মতো ক্রিকেটারের টেস্টে না থাকায় সমালোচনাও হয়েছে বেশ। তবে বিসিবির নির্বাচক কিংবা টিম ম্যানেজমেন্ট ‘বাতিলের খাতায়’ ফেলে দিয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহকে। সেই তিনিই হারারে টেস্টে বাংলাদেশকে টেনে তুলে নিয়ে গেছেন বড় সংগ্রহের দিকে।

সবশেষ কয়েকটি টেস্টে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ভুগেছে ব্যাটিংয়ে। ভবিষ্যতের জন্য দল গঠনে মনোযোগী হয়ে তরুণদের সুযোগ দেওয়ায় বাদ পড়েছেন মাহমুদউল্লাহ। সেই তিনি এবার সুযোগ পেলেন দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার তামিম ও মুশফিকের চোট সমস্যা থাকায়। তামিম খেলতে পারলে হয়তো হারারে টেস্টে নামাই হতো না মাহমুদউল্লাহর!

টেস্ট ক্যারিয়ারের পঞ্চম সেঞ্চুরি পূরণ করেছেন তিনি। রয় কাইয়ার বলে পরপর দুই বাউন্ডারি হাঁকিয়ে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছান মাহমুদউল্লাহ। ১৯৫ বলে শতক পূরণ করার পথে মেরছেন ১১ চারের সঙ্গে ১ ছক্কা।

মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরির পরপরই আবার ক্যারিয়ারের প্রথম হাফসেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন তাসকিন আহমেদ। নবম উইকেটে তাদের ১০০ ছাড়ানো জুটিতে বাংলাদেশর সংগ্রহ ৪০০ ছাড়িয়েছে। স্কোর ১০৪ ওভারে ৮ উইকেটে ৪০১ রান।

ব্যাটসম্যান তাসকিন!

আসল কাজ বোলিং। ফিটনেস সমস্যা ও চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরার পর থেকে সেই কাজটা দারুণভাবে করে যাচ্ছেন তাসকিন আহমেদ। জিম্বাবুয়ে সফরে বোলিং পরীক্ষায় নামার আগে এবার ব্যাটিংয়ে নিজের সামর্থ্য দেখিয়ে রাখলেন এই পেসার। হারারে টেস্টের প্রথম ইনিংসে তিনি হাজির হলেন পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান হয়ে!

প্রথম দিনের শেষ বিকেলে মেহেদী হাসান মিরাজের বিদায়ের পর ছিলেন না আর কোনও বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান। মাহমুদউল্লাহ থাকলেও সঙ্গী অভাবে তিনিও হয়তো স্কোর বেশিদূর নিতে পারবেন, এই ভাবনা ছিল দিন শেষে। কিন্তু দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশনে ভাবনা পুরো পাল্টে দিলেন তাসকিন। অসাধারণ সব শটে টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম হাফসেঞ্চুরির দেখা পেয়েছেন তিনি।

বিশেষ করে তার কাভার ড্রাইভ এককথায় অসাধারণ। ইতিমধ্যে তাসকিন তার টেস্ট ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ইনিংস গড়েছেন। এতদিন লাল বলের ক্রিকেট তার সর্বোচ্চ ছিল ৩৩ রান, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই স্কোর ছাড়িয়ে পেয়েছেন ফিফটির দেখা। ৬৯ বলে হাফসেঞ্চুরি পেতে মেরেছেন ৮ বাউন্ডারি।

৩০০ ছাড়িয়ে বাংলাদেশ

দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় ওভারেই ৩০০ ছাড়িয়েছে বাংলাদেশের স্কোর। আগের দিন অপরাজিত থাকা দুই ব্যাটসম্যান মাহমুদউল্লাহ ও তাসকিন শুরু করেছেন দিনের খেলা।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারারে টেস্টে প্রথম দিন অম্লমধুর কেটেছে বাংলাদেশের। টপ অর্ডারে ব্যর্থতার গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে প্রাপ্তির আনন্দও। দারুণ ব্যাট করেছেন অধিনায়ক মুমিনুল হক। টেস্টে তিনি বরাবরই দুর্দান্ত। তবে বাড়তি পাওয়া হলো লিটন দাস ও মাহমুদউল্লাহর ব্যাটিং। লম্বা সময় ফর্মহীনতার পর রানে ফিরেছেন লিটন, আর ১৬ মাস পর টেস্টে ফিরে নিজেকে চিনিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ।

লিটনের প্রাপ্তির আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে না পাওয়ার যন্ত্রণাও। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির দারুণ সম্ভাবনা জাগিয়েও পারেননি এই উইকেটকিপার। ৯৫ রানে আউট হয়ে যান দিনের শেষ ভাগে। তবে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেন মাহমুদউল্লাহ। দীর্ঘ দিন পর লাল বলের ক্রিকেটে ফিরেই হাফসেঞ্চুরি পান তিনি।

তার সঙ্গে প্রথম দিন শেষ করেন তাসকিন আহমেদ। এই দুজনই শুরু করেছেন দ্বিতীয় দিন। তাদের ব্যাটে এগিয়ে চলা বাংলাদেশের স্কোর ৮৭ ওভারে ৮ উইকেটে ৩১৬ রান।