তৃতীয় রিভিউ নষ্ট করেছে বাংলাদেশ  

ব্যাট হাতে টানা কর্তৃত্বের পর বল হাতেও নিউজিল্যান্ডকে চাপে রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় সেশনে তুলে নিয়েছে অধিনায়ক টম ল্যাথাম ও ডেভন কনওয়ের উইকেট। পাশাপাশি তৃতীয় সেশনে নষ্ট করেছে তৃতীয় ও শেষ রিভিউ। প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ ২ উইকেটে ৯২ রান। ক্রিজে আছেন রস টেলর (১৭) ও উইল ইয়াং (৪১)। কিউইরা পিছিয়ে আছে ৩৭ রানে।

লাঞ্চ ব্রেকের ২০ মিনিট আগে বাংলাদেশকে ৪৫৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর ব্যাট করতে নেমেছিল নিউজিল্যান্ড। দ্বিতীয় সেশনে দুই ওপেনার আট ওভার পার করে দিয়েছিলেন। কিন্তু নবম ওভারে টম ল্যাথামের উইকেট তুলে নেন তাসকিন আহমেদ। তাসকিনের শর্টার লেংথের বল ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। ল্যাথাম ছেড়ে দিলেও পারতেন, কিন্তু ডিফেন্ড করতে গিয়ে ডেকে আনেন বিপদ। ইনসাইড এজ হয়ে বল আঘাত হানে স্টাম্পে। তাতে টানা দুই ইনিংসে ব্যর্থ ল্যাথাম ফিরেছেন ১৪ রান করে।

ল্যাথামের বিদায়ের পর প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেন আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান কনওয়ে ও উইল ইয়াং। বেশি দূর যেতে পারেনি এই জুটি। গতির ঝড় তুলে কনওয়েকে সাজঘরে পাঠিয়েছেন এবাদত। টানা নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়েরই পুরস্কার পেয়েছেন এই পেসার। কনওয়ের ব্যাট-প্যাড হয়ে বল জমা পড়েছিল সাদমানের হাতে। শুরুতে অনফিল্ড আম্পায়ার সাড়া না দিলে রিভিউ নেয় বাংলাদেশ। পরে দেখা যায় বল ব্যাটে লেগেছিল কনওয়ের। ৪০ বল খেলা কনওয়ে ফেরেন ১৩ রান করে। পরের ওভারে মিরাজের ঘূর্ণিতে ইনসাইড এজ হয়েছিলেন ইয়াং। কিন্তু লিটন তা গ্লাভসে জমাতে পারেননি। এর পর শুরু হয় রিভিউ নষ্ট করার খেলা। চা পানের বিরতিতে যাওয়ার আগের ওভারে দ্বিতীয় রিভিউ নষ্ট করে বাংলাদেশ। এবাদতের বল রস টেলরের ব্যাটে লেগেছিল ভেবে রিভিউ নেন মুমিনুল। পরে দেখা বল ব্যাটেই লাগেনি।    

তৃতীয় ও শেষ রিভিউটি নষ্ট হয় তৃতীয় সেশনে। ৩৭তম ওভারে তাসকিনের ইয়র্কার লেংথের ব্লক করেছিলেন টেলর। পায়ে লাগছে ভেবে অযথা রিভিউ নিয়ে সেটি নষ্ট করেছেন মুমিনুল।

আধিপত্য দেখিয়ে তৃতীয় দিন কাটানোর পর চতুর্থ দিনের শুরুটাও ভালো ছিল বাংলাদেশের। ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে খেলেছেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও ইয়াসির রাব্বি। তাতে লিড ছাড়ায় শতরান। কিন্তু মিরাজ-ইয়াসির সাজঘরে ফিরলে ইনিংস গুটিয়ে যেতেও সময় লাগেনি। কিউইদের ৩২৮ রানের পর প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ করেছে ৪৫৮ রান। লিড পেয়েছে ১৩০ রানের।

এবারের সফরে গিয়ে প্রথম টেস্টের তিন দিনেই বলতে গেলে বাংলাদেশ কর্তৃত্ব দেখিয়েছে। যে ব্যাটিং সবচেয়ে দুশ্চিন্তার জায়গা ছিল, মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে সেখানেই বাজিমাত করেছেন মুমিনুলরা।

তবে শতকের সম্ভাবনা জাগিয়েও পারেননি মুমিনুল হক ও লিটন দাস। মুমিনুল আউট হয়েছেন ৮৮ রানে, আর লিটন ফিরে যান ৮৬ রানে। মাহমুদুল হাসান জযের ব্যাট থেকে আসে ৭৮ রান। ব্যর্থ হয়েছেন মুশফিকুর রহিম, ১২ রানে আউট অভিজ্ঞ ব্যাটার।

দ্বিতীয় দিনে আলো ছড়িয়ে ওপেনার জয় প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তৃতীয় দিন নড়বড়ে ব্যাটিংয়ের মাশুল দেন। অফ স্টাম্পের বাইরের বল অযথা খেলতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন গালিতে। তাতে দিনের শুরুতে উইকেট পতনে ব্যাকফুটে চলে যায় বাংলাদেশ।

জয় মাঠে নেমেছিলেন আগের দিনের ৭০ রান নিয়ে। সঙ্গে ছিলেন টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল। নিল ওয়াগনারের বাইরের বলটা ছেড়ে দিলেও হতো। কিন্তু ফুটওয়ার্ক না করে খেলতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনেন জয়। ক্যাচ নিয়ে নেন হেনরি নিকোলস। তাতে ২২৮ বলে ৭৮ রানে শেষ হয় জয়ের দুর্দান্ত একটি ইনিংস। তারপর মুমিনুলও ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন কাইল জেমিসনকে। কিন্তু কিউই পেসার তা হাতে জমাতে পারেননি।

নতুন বল নেওয়ার আগের ওভারে তো ভাগ্যের পরশে বেঁচে যান মুমিনুল! আবারও ওয়াগনারের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়েছিলেন। কিন্তু থার্ড আম্পায়ার পায়ের ‘নো’ ডাকায় জীবন পান বাংলাদেশ অধিনায়ক।

তারপর অবশ্য মুশফিক-মুমিনুল মিলে সতর্ক থেকেই পার করার চেষ্টা করেন কিছুটা সময়। কিন্তু মনোযোগ ধরে রাখতে না পারায় থিতু হতে পারেননি মুশফিক। লাঞ্চ ব্রেকের তখন ২০ মিনিট বাকি। বোল্টের ফুলার লেন্থের বল বুঝতেই পারেননি অভিজ্ঞ ব্যাটার। ভুল লাইন ধরে খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়ে ফিরেছেন ১২ রানে। তার ৫৩ বলের ইনিংসে ছিল একটি চার।

তৃতীয় দিনের শুরুতে উইকেট হারালেও একপ্রান্ত আগলে রেখে রানের চাকা বাড়িয়ে নিয়েছেন মুমিনুল। ব্যক্তিগত প্রাপ্তিতে নতুন আরেকটি অর্জন যোগ করতে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ট্রেন্ট বোল্টের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে শেষ তার ইনিংস। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি। ৮৮ রানে আউট হয়ে যান তিনি। ২৪৪ বলের ধৈর্যশীল ইনিংসটি বাংলাদেশ অধিনায়ক সাজান ১২ বাউন্ডারিতে।

মুমিনুলের বিদায়ে ভাঙে লিটনের সঙ্গে তার ১৫৮ রানের জুটি। সঙ্গীকে হারিয়ে লিটনও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। অথচ নান্দনিক সব শটে মুগ্ধ করা ইনিংসে টেস্ট ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরির পথে হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু বোল্টের বাইরে ফেলা বল ব্যাটের কানায় লেগে জমা পড়ে উইকেটকিপার টম ব্লান্ডেলের গ্লাভসে। ফলে ৮৬ রানে শেষ হয় লিটনের ইনিংস। ১৭৭ বলের ইনিংসটি তিনি সাজান ১০ বাউন্ডারিতে।

তার বিদায়ের পর আর বিপদ বাড়েনি। দিনের বাকিটা সময় পার করে দেন দুই অপরাজিত ব্যাটার মেহেদী হাসান মিরাজ ও ইয়াসির আলী । সেই দু’জনই ব্যাট করতে নামেন চতুর্থ দিন। স্বস্তিতেই নিউজিল্যান্ড পেসারদের সামলে যাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু টিম সাউদির বলে হঠাৎ ধৈর্য হারিয়ে বসেন মিরাজ। সাউদির সুইং করা অফস্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গেলে গ্লাভসবন্দি হন টম ব্লান্ডেলের। ৮৮ বল খেলা মিরাজের দুর্ভাগ্য, ৩ রানের জন্য হাফসেঞ্চুরি পাননি।

মিরাজকে হারিয়ে সঙ্গী ইয়াসিরেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটে দ্রুত। ফ্লিক করতে গিয়ে মিরাজের মতো গ্লাভসবন্দি হন এই ব্যাটার। ৮৫ বল খেলা ইয়াসির সাজঘরে ফেরেন ২৬ রানে। তার পর লেজ ছেঁটে দিতে সময় লাগেনি নিউজিল্যান্ডের। তানকিন আহমেদকে (৫) লেগ বিফোরে বিদায় দেন টিম সাউদি। শরিফুল ইসলামকে (৭) ট্রেন্ট বোল্ট বোল্ড করলে ৪৫৮ রানেই শেষ হয় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস। লাঞ্চ ব্রেকের তখন ২০ মিনিট বাকি। 

অবশ্য চতুর্থ দিনের শুরুতেই রাচিন রবীন্দ্রের ঘূর্ণিতে লেগ বিফোরের আবেদন উঠেছিল। তখন ব্যাটিং প্রান্তে ছিলেন মিরাজ। রিভিউ নিলে বেঁচে যান তিনি। বল তার গ্লাভস লেগেছিল। তখন তৃতীয় নতুন বল নিতে বাকি আর এক ওভার। পুরনো বলের শেষ ওভারে নিল ওয়াগনারও এলবিডাব্লিউতে বিপদে ফেলার চেষ্টা করেন মিরাজকে। অনফিল্ড আম্পায়ার আঙুল তুলে দিলেও মিরাজ রিভিউ নিয়ে আবার বেঁচেছেন। দেখা গেছে বল হালকা ব্যাটে লেগেছিল।

কিউই বোলারদের মধ্যে ৮৫ রানে ৪ উইকেট নিয়েছেন বোল্ট। ১০১ রানের বিনিময়ে ৩ উইকেট নিয়েছেন ওয়াগনার। ১১৪ রানে দুটি টিম সাউদি ও ৭৮ রানে একটি উইকেট নিয়েছেন জেমিসন।