অভিজ্ঞ-পরিণত রাকিবুলের কাঁধেই বাংলাদেশের বড় দায়িত্ব

লেখাপড়ায় বিন্দুমাত্র মনোযোগ ছিল না রাকিবুল হাসানের। বই-খাতা মেলে বসে থাকলেও মন পড়ে থাকতো ক্রিকেটে। কিন্তু মা-বাবার কাছে তা বলার সাহসও ছিল না। তাদের কাছে স্বপ্নের কথা লুকিয়েই ২২ গজে স্বপ্নপূরণের পথে হাঁটা শুরু বাঁহাতি স্পিনারের। গৃহশিক্ষকের একমাসের টাকা ‘মেরে’ ভর্তি হন একটি ক্রিকেট একাডেমিতে। সেখানে কিছুদিন অনুশীলনের পর বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলকে আবিষ্কার করা কোচ ওয়াহিদুল গনির অঙ্কুর ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন তিনি। 

রাকিবুলের মন জুড়ে ছিল পেসার হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু শারীরিক গঠন ঠিক পেসারসুলভ না হওয়ায় তাকে স্পিনে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন কোচ। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রাকিবুল মেনে নেন। এরপর আর কখনোই পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ের অন্যতম কারিগর ছিলেন। এমনকি ট্রফি জয়ের ম্যাচে উইনিং রানও এসেছিল তার ব্যাট থেকেই। এবার তার কাঁধেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের আরও বড় দায়িত্ব। রাকিবুলের ভাবনা জুড়ে আরেকটি ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন। গত দুই বছর বড়দের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতাগুলো ক্যারিবীয় দ্বীপে ঠিকঠাক প্রয়োগ করার অপেক্ষায় তিনি।

আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ১৭ যোদ্ধাকে নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনে। আজ (৯ জানুয়ারি) থাকছে অধিনায়ক রাকিবুল হাসানের একান্ত সাক্ষাৎকার।

রাকিবুল হাসান

বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটে নিয়েই কেন স্বপ্ন দেখা?
রাকিবুল হাসান: ৯-১০ বছর বয়স থেকে বড় ভাইদের সঙ্গে টেপ টেনিস খেলতাম। স্কুলে ঠিকমতো যেতাম না। খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে ক্রিকেট নিয়েই মেতে থাকতাম। আমার বাসার পাশের মাঠ আর  স্কুলের মাঠে বড় ভাইরা ম্যাট বিছিয়ে ক্রিকেট খেলতো। এর বাইরে টিভিতে খেলা দেখতাম। ভাবতাম, আমিও যদি মতো খেলতে পারতাম! তখন স্বপ্ন দেখতাম ক্রিকেটার হবো।

বাংলা ট্রিবিউন: কতটা কঠিন ছিল ক্রিকেটার হওয়ার এই যাত্রাপথ?
রাকিবুল: ২০১২ সালের মাঝমাঝি অনুশীলন শুরু করবো ভেবেছিলাম। আমার কোচ ওয়াহিদুল গনি স্যারের সহকারী সোহেল ও জাহিদ ভাই আমাদের এলাকায় থাকতেন। তাদের কাছে গিয়ে ভর্তি হওয়ার পরিকল্পনা করি। কিন্তু টাকা পাবো কোথায়? পরিবার তো কিছু জানে না। পরে পরিকল্পনা করলাম, প্রাইভেট টিউটরের একমাসের বেতন না দিয়ে ওই টাকা দিয়ে ভর্তি হবো। যেই ভাবা সেই কাজ। 

বাংলা ট্রিবিউন: টাকা মেরে দেওয়া সেই গৃহশিক্ষকের সঙ্গে কি দেখা হয়?
রাকিবুল: বেতন মেরে দেওয়ার পর ওই স্যারের সামনে কখনোই আর যাইনি। আমি পড়তাম খিলগাঁও গভর্নমেন্ট স্কুলে। আমি তার কাছে ইংরেজি ও অঙ্ক পড়তে যেতাম। স্যারের টাকা মেরে ক্রিকেটে ভর্তি হওয়ার ঘটনা মনে পড়লে আব্বু-আম্মু এখনও হাসেন।

বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেট খেলতে এসে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে?
রাকিবুল: ক্রিকেটের জন্য পড়ালেখাই বাদ দিয়েছি। এক-দুই বছর আমার গ্যাপ গেছে। ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ দলে ছিলাম। তখন আমার এসএসসি দেওয়ার কথা ছিল। সিএবি’র সঙ্গে তখন হোম সিরিজ খেলছিলাম। আমি ছিলাম স্ট্যান্ডবাই। স্ট্যান্ডবাই ক্যাম্পের জন্য পরীক্ষা দেইনি। তখন ভাবছিলাম, হয়তো যেকোনও সময় ডাক পাবো। তাই ওইবার এসএসসির টেস্ট পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তো পেস বোলার হতে চেয়েছিলেন?
রাকিবুল: হ্যাঁ। ভর্তি হয়েই পেস বোলিং করার জন্য রানআপ নিতে গেলাম। তখন এত লম্বা ছিলাম না। কোচ আমাকে বললেন, ‘তুমি স্পিন বোলিং করো।’ ভাইদের কাছে তিন-চার মাস অনুশীলন করার পর ওয়াহিদুল গনি স্যারের অঙ্কুর ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হই ২০১৩ সালে। এরপর বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের পাশাপাশি প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ আর প্রিমিয়ার লিগেও কিছু ম্যাচ খেলেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপ জেতার পর দুই বছর কেটে গেছে, এই সময়টাতে নিজেকে কীভাবে গড়েছেন?
রাকিবুল: বিশ্বকাপ জেতার পর বড়দের সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে, লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে। বড়দের সঙ্গে একই ড্রেসিংরুম শেয়ার করার কারণে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আমার কোথায় কোথায় গ্যাপ আছে সেগুলো বোঝার চেষ্টা করেছি, সেগুলো নিয়ে কাজও করেছি। হয়তো কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তারপরও এসব জায়গায় কাজ করার সুযোগ আছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমি আগের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং পরিণত হয়েছি। আশা করি, বিশ্বকাপে সিনিয়রদের কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পেরেছি। 

বাংলা ট্রিবিউন: দলের প্রস্তুতি কেমন মনে হচ্ছে?
রাকিবুল: করোনার কারণে এবারের দলটি আগের দলের মতো প্রস্তুতি নিতে পারেনি এটা সত্যি। তবে আমাদের মতো বাকি দলগুলোও একই পরিস্থিতে পড়েছে। আমরা গত দুই-তিন মাসে কয়েকটা সিরিজ খেলেছি। আমি মনে করি এটাও খারাপ না। আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি হয়েছে। এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি বাদে আমাদের একেবারে খারাপ প্রস্তুতি হয়নি। সব মিলিয়ে আমি মনে করি, আমাদের দলটা বেশ ভালো। সবাই ইতিবাচকভাবে সবকিছুই ভাবছে। এশিয়া কাপের সেমিফাইনাল থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে। বিশ্বকাপে ভালো করার আত্মবিশ্বাস আছে আমাদের। ইতোমধ্যে ওই ম্যাচে আমাদের ভুলগুলো নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। আশা করি, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বিশ্বকাপের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবো।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ব্যাটেই যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে জয়সূচক রানটি এসেছিল। এবার আরেকটি বিশ্বকাপে বড় দায়িত্ব আপনার কাঁধে, কতখানি চ্যালেঞ্জিং?
রাকিবুল: আমি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি। চাপ তো কম বেশি থাকেই। সব ক্রিকেটারকেই সেটি নিতে হয়। অধিনায়কত্ব এখন উপভোগ করছি। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের দুটি মৌসুমে অধিনায়কত্ব করেছিলাম। কিছুটা অভিজ্ঞতা তো হয়েছেই। আশা করি, সবার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবো।

আগের বিশ্বকাপে সাধারণ একজন ক্রিকেটার হিসেবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছি। এবার আমার দায়িত্ব খানিকটা বেশি। অধিনায়ক হিসেবে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছি। কিন্তু দুই জায়গায় কোনও পার্থক্য দেখি না। আগে যেমন ক্রিকেটার হিসেবে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, এবারও অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করবো। এছাড়া গতবার যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি সেটাই দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে ভাগাভাগির চেষ্টা করেছি। আমাদের দলটাও ভালো আছে। আশা করি আমরা ভালো কিছু করবো।’

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে কি আকবর হচ্ছেন রাকিবুল?
রাকিবুল: না-না। রাকিবুল রাকিবুলই থাকছে। আর আকবর ভাই তো আকবর ভাই! তিনি অনেক ভালো মানুষ এবং ভালো অধিনায়ক। আমি আমার দর্শন-চিন্তাভাবনা দিয়ে অধিনায়কত্ব করতে চাই। আশা করি, আমাকে দেওয়া দায়িত্বটা খুব ভালোভাবে শেষ করতে পারবো।

বাংলা ট্রিবিউন: অধিনায়ক হিসেবে এবারও ট্রফি জেতার সুযোগ আপনার সামনে। কতখানি আত্মবিশ্বাসী আপনি?
রাকিবুল: দলগতভাবে আমরা যদি ভালো করতে পারি তাহলে অবশ্যই আমাদের হারানো যেকোনও দলের জন্য কঠিন হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এখনই অতদূর চিন্তা করতে চাই না। আগে গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো একটি একটি করে খেলতে চাই। নিজেদের সহজাত খেলা খেলতে পারলেই বিশ্বকাপে ভালো করা সম্ভব।

বাংলা ট্রিবিউন: বিশ্বকাপ খেলেই বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের পাট চুকিয়ে ফেলবেন। আপনার সতীর্থ অনেকেই জাতীয় দলে খেলে ফেলেছেন। জাতীয় দলে খেলা নিয়ে আপনারও নিশ্চয় স্বপ্ন আছে?
রাকিবুল: ওরা (শামীম হোসেন, শরিফুল ইসলাম, মাহমুদুল হাসান জয়) খেলছে, এটা দেখতে খুব ভালো লাগে। দোয়া করি, ওরা যেন আরও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আমি এখনও অনূর্ধ্ব-১৯ দলে আছি। আমার চিন্তাভাবনা এখন শুধুই এই দলকে ঘিরে। কীভাবে আমরা চ্যাম্পিয়নশিপ ধরে রাখতে পারবো, সেসব নিয়েই মূলত আমার ভাবনা।
অবশ্যই বিশ্বকাপ শেষে আমার বয়সভিত্তিক ক্রিকেট শেষ হবে। তখন হয়তো অন্য বিষয় নিয়ে ভাববো। সিনিয়র লেভেলে যে কয়টা ম্যাচ খেলেছি, ওখানে মোটামুটি ভালো করেছি। যতটুকু হয়েছে তাতে মনে হয়েছে, আমি আরও একটু পরিশ্রম করলে আপ টু দ্য মার্ক হতে পারবো। কখনও জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেলে আমার চেষ্টা থাকবে, দীর্ঘদিন জাতীয় দলকে সাপোর্ট দিয়ে যাওয়া। এখন আমার ফোকাস হলো, বিশ্বকাপে কীভাবে ভালো করতে পারি। বিশ্বকাপ খেলার পর জাতীয় দল নিয়ে ভাবতে হলে ভাববো।

বাংলা ট্রিবিউন: দলের ব্যাটিং শক্তি বাড়াতে ওপরের দিকে খেলার কোনও ইচ্ছে আছে?
রাকিবুল: দলের প্রয়োজনে ওপরে খেলতে প্রস্তুত আমি। আপাতত মনে হয় প্রয়োজন নেই। আমাদের দলে বেশকিছু অলরাউন্ডার আছে। তারাও খুব ভালো ব্যাটিং করতে পারে। সব মিলিয়ে তাই খুব প্রয়োজন অনুভব হচ্ছে না। তারপরও যদি দলের প্রয়োজনে আমাকে ওপরে ব্যাটিং করতে হয় তো আমি প্রস্তুত আছি। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী হয়তো অনেক কিছু নির্ভর করবে।

বাংলা ট্রিবিউন: এশিয়া কাপ খেলতে যাওয়ার আগে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে আপনাদের কথা হয়েছিল। বিশেষ কোনও বার্তা দিয়েছিলেন তিনি?
রাকিবুল: উনি (বোর্ড সভাপতি) আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতে ট্রফি জিতে আসার পর। এছাড়া বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। আমাদের ইতিবাচক থাকতে বলেছেন। প্রসেস অনুযায়ী ক্রিকেট খেলতে বলেছেন। 

বাংলা ট্রিবিউন: সাকিব-জাদেজা আপনার আইডল কেন?
রাকিবুল: ছোটবেলায় অনেকের খেলা ভালো লাগতো। যুবরাজ সিংকে ভালো লাগতো। তার ব্যাটিং, ফিল্ডিং অনেক ভালো লাগতো। বড় হওয়ার সঙ্গে বুঝতেও শুরু করলাম। তখন সাকিব আল হাসান ও রবীন্দ্র জাদেজার খেলা ভালো লাগা শুরু করে। তাদের বোলিং, ফিল্ডিং, ব্যাটসম্যানদের রিড করা, গেম সেন্স এগুলো খুব ভালো। ফলে তাদের আইডল মেনেই আমি এগিয়ে যাচ্ছি।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে রাকিবুল হাসান

প্রোফাইল
নাম: রাকিবুল হাসান
ডাকনাম:  রাকিব
জন্ম: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০২
জন্মস্থান: রূপসী, কুড়িপাড়া, ময়মনসিংহ
উচ্চতা: ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি
পড়াশোনা: অনার্স প্রথম বর্ষ
প্রথম ক্লাব:  অঙ্কুর ক্রিকেট একাডেমি
বর্তমান ক্লাব: শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাব  
ব্যাটিং স্টাইল: বাঁহাতি
প্রিয় শট: স্কুপ
বোলিং স্টাইল: বাঁহাতি স্পিনার
প্রিয় ডেলিভারি: আর্ম বল
প্রিয় মানুষ:  মা
প্রিয় ক্রিকেটার:  সাকিব আল হাসান, রবীন্দ্র জাদেজা
প্রিয় বন্ধু: সাকিব ও আরিফ
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: ২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কা সিরিজ চারদিনের ম্যাচে দুই ইনিংসে ৯ উইকেট নেওয়া। আর বিশ্বকাপ জেতা তো সবসময় বিশেষ কিছুই।