কালকের হ্যাপিনেস কালকেই শেষ, ক্রিকেটারদের চ্যালেঞ্জ প্রতিদিনের: মৃত্যুঞ্জয়

মৃত্যুঞ্জয়ের বাবা তাহাজ্জত হোসেন চৌধুরী ক্রিকেটের পাঁড়ভক্ত। নিজে ওয়াসিম আকরামের বোলিংয়ে মুগ্ধ বলে ছেলেকেও ‘সুলতান অব সুইংয়ের’ মতো দেখার স্বপ্ন ছিল তার। বাবার স্বপ্ন পূরণে ২০১২ সালে আবাহনী মাঠ থেকে শুরু হয় মৃত্যুঞ্জয়ের লড়াই। সহজাত বোলিংয়ে দ্রুতই বয়সভিত্তিক দলের সিঁড়ি ভেঙে বড়দের সঙ্গে সমান তালে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২০ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলটার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও ছিলেন এই বাঁহাতি পেসার। কিন্তু ইনজুরির কারণে টুর্নামেন্টের মাঝপথে দেশে ফিরতে হয়েছিল তাকে।

ফলে গত দুই বছর বেশিরভাগ সময় ইনজুরির সঙ্গেই কাটাতে হয়েছে। কিছু দিন আগে বিসিএলে মধ্যাঞ্চলে ভালো খেলার পুরস্কার হিসেবে সুযোগ পেয়েছেন বিপিএলে। শনিবার প্রথমবার পা রেখে করে ফেলেছেন হ্যাটট্রিকও। দারুণ এই কীর্তি গড়ে মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী মুখোমুখি হয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের।

বাংলা ট্রিবিউন: বিপিএলের প্রথম ম্যাচেই বাজিমাত, রাতটা নিশ্চয়ই দারুণ কেটেছে?

মৃত্যুঞ্জয়: আলহামদুলিল্লাহ ভালোই। বিপিএলের মতো জায়গায় নিজের প্রথম ম্যাচে কিছু অর্জন করতে পেরেছি। এই অর্জন আমার কাছে স্পেশাল হয়েই থাকবে।

বাংলা ট্রিবিউন: বিপিএলে নিজের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামার আগে বিশেষ কোনও ভাবনা কি ছিল?

মৃত্যুঞ্জয়: মাথায় আসলে সিম্পল ভাবনাই ছিল। তবে একটা জিনিস নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। রাতের খেলা বলে এখানে প্রচুর রান হচ্ছিল। ব্যাটাররা খুব ভালো খেলছিল। আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম প্রথম ওভারটা খারাপ হয়ে গেলে কামব্যাক করাটা কঠিন হয়ে যাবে। তুলনামূলক প্রথম ওভারটা একেবারে খারাপ হয়নি। দ্বিতীয় স্পেলে যখন বোলিংয়ে এলাম, তখন পরিকল্পনা ছিল ডট বল করার। ওই চেষ্টা থেকেই হ্যাটট্রিকটা হয়ে যায়।

বাংলা ট্রিবিউন: ১৮তম ওভারে পর পর দুই বলে বাউন্ডারি হজমের পর বেশিরভাগ বোলারই এলোমেলো হয়ে যায়, আপনার মাথায় কী চলছিল?

মৃত্যুঞ্জয়: বোলিংয়ে গেলে আমার মধ্যে কখনোই চাপ কাজ করে না। আপনি আমাকে সবচাইতে চাপের মধ্যে বোলিং দেবেন, আমার মধ্যে সেই চাপ কখনও আসবে না। একেক জনের একেক রকম ব্যাপার থাকে, কেউ রিলাক্স থাকতে পছন্দ করে। আমিও তা-ই। প্রথম দুই বলে বাউন্ডারি হজমের পর এনামুল ভাইয়ের দুর্বল দিকটা মাথায় রেখে বোলিং করার চেষ্টা করেছি। 

বাংলা ট্রিবিউন: এনামুলকে ফেরাতে কী চিন্তা করেছিলেন?

মৃত্যুঞ্জয়: আমি ওই ওভারে লেগ ইয়র্কার ট্রাই করছিলাম। কিন্তু প্রথম দুই ওভারে পরিকল্পনা কাজ করেনি। ইয়র্কার মারতে গিয়ে হয়নি। তবে খেয়াল করছিলাম, উনি যেভাবে ব্যাটিং করছিলেন, তাতে করে ওনার জন্য লেগ সাইডে খেলা খুব সহজ হচ্ছিল। অফসাইডে মারতে গেলে ওনার জন্য টাফ হবে খুব। এই কারণে আমি রাউন্ড দ্য উইকেটে চলে আসি। চতুর্থ বলটি কাটার মারি। কাটার মারার উদ্দেশ্য ছিল হয়তো এক্সট্রা কাভারে, নয়তো কাভারে ফিল্ডারের হাতে যাবে। আমার পরিকল্পনা এখানে কাজ করেছিল।

বাংলা ট্রিবিউন: হ্যাটট্রিক বলটি করার আগের ভাবনাটা?

মৃত্যুঞ্জয়: হ্যাটট্রিক বলটি আমি ইয়র্কারই করতে চেয়েছিলাম, যাতে কোনও রান না হয়। ইয়র্কারটা খুব ফাস্ট ডেলিভারি ছিল। ওনার (রবি বোপারা) ইনটেনশই ছিল মারবেন, ফলে বোল্ড হয়ে যান। যদি সিঙ্গেল নেওয়ার চেষ্টায় থাকতেন, তাহলে হয়তো আউট হতেন না।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনাকে যোদ্ধা উল্লেখ করে শাহরিয়ার নাফীস ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। জবাবে আপনি বলেছিলেন, মাশরাফি-ই বড় যোদ্ধা। বিষয়টি নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। কী ভেবে মাশরাফিকে বড় যোদ্ধা বলেছেন?

মৃত্যুঞ্জয়: ক্যারিয়ারে মাশরাফি ভাই নিজের ইনজুরি নিয়ে যে যুদ্ধ করেছেন, সেই যুদ্ধ যেকোনও ক্রিকেটারের কাছে অনুকরণীয় হতে পারে। তার থেকে বড় যোদ্ধা তো কেউ হতে পারে না। আমি দুই বছর ইনজুরিতে ছিলাম। ফিরতে আমাকেও অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে। কিন্তু সেই যুদ্ধ মাশরাফি ভাইয়ের যুদ্ধের কাছে কিছুই নয়। এই মানুষটাই তো আসল যোদ্ধা।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার বাবা চেয়েছেন ওয়াসিম আকরামের মতো পেসার হন। এই কীর্তির দিনটিতে আপনার বাবা নিশ্চয়ই সবচেয়ে বেশি খুশি?

মৃত্যুঞ্জয়: গত রাতে বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি খুব খুশি। এমন একটি মুহূর্তের অপেক্ষা করছিলেন। কালকের (শনিবার) ম্যাচের পর পরিবারের সবাই খুব খুশি। আমার বড় ভাইতো বন্ধুর মতো, তার সঙ্গে সবকিছু নিয়ে কথা হয়। আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রেরণা দেয় বড় ভাই।

বাংলা ট্রিবিউন: প্রথম ম্যাচে এমন পারফরম্যান্স প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেয়, অনেক সময় চাপও বেড়ে যায়। এই বিষয়গুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?

মৃত্যুঞ্জয়: অনেকেই দেখি লিখছে, এক ম্যাচ ভালো খেলছে বলে মাথায় তোলা হচ্ছে! পরের ম্যাচে তো খারাপ খেলতে পারে। আমার মাথায় অবশ্যই বিষয়টি আছে, আজকের ম্যাচ ভালো খেলেছি বলে কিছু যায় আসে না। এটাই আমার শেষ নয়। আমি এখনও কোনও পর্যায়ে যেতে পারিনি। সামনের ম্যাচ খারাপ যেতেও পারে, তবে আমার লক্ষ্য হচ্ছে প্রসেসটা ঠিকমতো হচ্ছে কিনা। ওই প্রসেসে হয়তো কিছু দিন খারাপ হবে, কিন্তু একসময় না একসময় ভালো হবেই। এই যে গত দুই বছর আমি কোথাও ছিলাম না, সঙ্গের ক্রিকেটাররা কতটা নাম কামিয়েছিল। আমি হয়তো প্রসেস মেনটেইন করতে পারলে এক ম্যাচেই নাম কামিয়ে ফেলবো! কালকের (শনিবার) যে পারফরম্যান্স তার হ্যাপিনেস একদিনের জন্য। পরের ম্যাচে যদি ৪০-৫০ রান দেই, হ্যাপিনেস চলে যাবে। আমাকে সবাই ভুলে যাবে- এটাই স্বাভাবিক। একজন ক্রিকেটারকে প্রতিদিনই চ্যালেঞ্জ নিতে হয়। একদিনের চ্যালেঞ্জ জিতে ক্রিকেটাররা টিকে থাকতে পারে না।

বাংলা ট্রিবিউন: গত দুই বছরে ইনজুরি নিয়ে অনেক বেশি সংগ্রাম করতে হয়েছে। দিনগুলো কতটা কঠিন ছিল?

মৃত্যুঞ্জয়: বিশ্বকাপ থেকে আসার পর সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগছিল। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট এটাই। বিসিবিতে গেলেই ওদের (বিশ্বকাপ জয়ী দল) সবার ছবি দেখতাম ট্রফি নিয়ে। কিন্তু সেখানে আমি নেই। তখন খুব খারাপ লাগা কাজ করে। মাঝের সময়টাতে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। সবাই জানতে চাইতো কেন খেলছি না, কী হয়েছে? সবাই তো আর পুরো ব্যাপারটা বোঝে না। অনেকেই বলেছেন সামান্য ব্যথাতে এতদিন মাঠের বাইরে থাকতে হবে কেন? আশপাশে যারা ছিল, অনেক খোঁজ-খবর নিতো, তারাও দূরে সরে যাচ্ছিল। এসব নিয়ে হতাশ ছিলাম। সবচেয়ে কষ্টকর দিক ছিল, যখনই কামব্যাক করেছি তখনই আমার ইনজুরি। গত দুই বছর এভাবেই গেছে।