ব্যাটিং না পাওয়া ছেলেটির ব্যাটেই খুললো ২০ বছরের গেরো

দক্ষিণ আফ্রিকা সফর মানেই বাংলাদেশের ব্যাটারদের অসহায় আত্মসমর্পণ। আগের ছয় টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটারদের এমন পরিণতিই হয়েছিল। প্রোটিয়াদের পেস আক্রমণের সামনে দাঁড়াতেই পারতো না বাংলাদেশের ব্যাটাররা। তবে দৃশ্যপট পাল্টেছে। বাংলাদেশের ব্যাটাররা শিখে গেছেন পাল্টা আক্রমণ করতে। এই যেমন মাহমুদুল হাসান জয়। ডারবানে তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমে তুলির আঁচড়ে রাঙালেন! কেশভ মহারাজের শর্ট বল পয়েন্টে পাঠিয়ে দুই রানের জন্য ছুটলেন। ৯৮ রান থেকে একশোতে পৌঁছাতেই ইতিহাস লিখলেন জয়। ২০০২ থেকে ২০২২- তাতে দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০ বছরের গেরো খুললো এই সেঞ্চুরিতে।

অথচ একটা সময় পাড়ার ক্রিকেটে ব্যাটিং-ই পেতেন না তিনি! বড়রা দলে নিলেও কেবল ফিল্ডিং করাতেন। ব্যাটিং না পাওয়া জয় পণ করেছিলেন একদিন বড় ব্যাটার হয়ে দেখিয়ে দেবেন! বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে বহুবার সেটি দেখিয়েছেন। আর শনিবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরি করেই বড় ভাইদের অবহেলার ‘জবাব’টা দিয়েছেন! দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে যা করতে পারেননি তামিম-মুশফিক-আশরাফুল-সাকিবের কেউ, সেটাই করলেন তিনি। আর তাতেই হয়ে গেলেন ইতিহাসের অংশ। এদিন প্রোটিয়াদের বিপক্ষে পচেফস্ট্রুমে করা মুমিনুলের ৭৭ রান টপকে যান জয়।

ভারতীয় ক্রিকেটার ‘দ্য ওয়াল’ খ্যাত রাহুল দ্রাবিড় জয়ের প্রিয় ক্রিকেটার। তার মতোই দলের প্রাণভোমরা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। ডারবান টেস্টে দলের বিপদের সময় বাংলাদেশের ‘দ্য ওয়াল’ হয়েই থাকলেন ডানহাতি এই ব্যাটার। তার অনবদ্য এক সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশ দল লিড নিতে না পারলেও ব্যবধান কমাতে পেরেছে। বাংলাদেশের টপ অর্ডার ব্যাটাররা যখন মুখ থুবড়ে পড়েছিল, তখনই ত্রাতার ভূমিকাতে জয়। ঠাণ্ডা মাথায় সময়ের দাবি মিটিয়ে খেলেছেন দারুণ এক ইনিংস। শেষ ব্যাটার হিসেবে আউট হওয়ার আগে ১৩৭ রান যোগ করেন চাঁদপুর থেকে উঠে আসা এই তরুণ। ৪৪২ মিনিট ক্রিজে থেকে ৩২৬ বল খেলে জয় নিজের ইনিংসটি সাজিয়েছেন।

নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের প্রথম টেস্টে বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলতে নেমে ৭৮ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। ডারবানে একই মানসিকতা নিয়ে খেলেছেন। ১৭০ বলে প্রথম হাফসেঞ্চুরির দেখা পান। দ্বিতীয় পঞ্চাশ তুলতে খেলেন আরও ৯৯ বল। সব মিলিয়ে ২৬৯ বলে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে এই ওপেনার মেরেছেন ১০ বাউন্ডারির সঙ্গে এক ছক্কা। সেঞ্চুরিতে পৌঁছার কিছুক্ষণের মধ্যেই মিরাজ আউট হয়ে গেলে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দেন। সেটাই কাল হয়েছে জয়ের জন্য। শেষ পর্যন্ত লিজাড উইলিয়ামসের ভেতরে ঢোকা গুডলেন্থের বল খেলতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জয়ের এমন কীর্তি হয়তো দেখাই যেত না, যদি না জয় রাঙামাটি বেড়াতে যেতেন! মাহমুদুলের এক আঙ্কেল চাকরি করেন বিজিবিতে, তার পোস্টিং ছিল সেখানে। ১৩ বছর বয়সে মাহমুদুলকে নিয়ে তার বাবা আবুল বারেক রাঙামাটি ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে সেই আঙ্কেলের কাছে ছেলের নামে বিচার দেন মাহমুদলের বাবা, পরবর্তীতে সেই আঙ্কেলই মাহমুদুলকে ক্রিকেট কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। এরপর ২০১৩ সালে চাঁদপুর ক্লেমন ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন জয়। সেখানে শামীম ফারুকীর কাছেই শুরু হয় জয়ের ক্রিকেট দীক্ষা।

শনিবার টিভির পর্দায় শিষ্যর ব্যাটিং মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন শামীম ফারুকী। বাংলা ট্রিবিউনকে সেই অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘জয় তো বরাবরই শান্ত ছেলে। ওর মাথাটা খুব পরিষ্কার। দক্ষিণ আফ্রিকায় যেভাবে খেলেছে, ওর ব্যাটিং দেখে আমি গর্ববোধ করছি। আমার বিশ্বাস জয় অনেক দূর যাবে।’

এখন তো ক্রিকেটপ্রেমী জনতাও বিশ্বাস করেন, জয় অনেক দূর যাবে! তবে আরও ১০ বছর আগে জয়ের ব্যাংকার বাবা আবুল বারেকের স্বপ্ন ছিল ছেলে পড়ালেখা শেষ করে তার পেশাই বেছে নেবে। শেষ পর্যন্ত ছেলেন কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। জয়ের এমন কীর্তির দিনে ছেলের ব্যাংকার না হওয়া নিয়ে আক্ষেপ থাকার কথা নয় আবুল বারেকের। হয়তো সবার আগে টিভির সামনে বসে হাততালিটা তিনিই দিয়েছিলেন!