১৮ ইঞ্চির শাহীনের স্বপ্ন পূরণ করলেন তামিম

আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শুরু হচ্ছে শনিবার থেকে। তার আগে আজ (শুক্রবার) সন্ধ্যায় টিম হোটেল গ্র‌্যান্ড সিলেটের লবিতে ট্রফি উন্মোচন করেছেন দুই দলের অধিনায়ক তামিম ইকবাল ও অ্যান্ডি বালবির্নি। তামিম যখন ট্রফি উন্মোচনে ব্যস্ত, তখন ১৮ ইঞ্চি উচ্চতার শাহীন ফকির স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায়। বরিশাল থেকে আসা শাহীন ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, তার জন্য এত বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছে।

বরিশালের মুলাদী উপজেলার বাসিন্দা শাহীন, জন্মের পর পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে যার শারীরিক বৃদ্ধি থেমে যায়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে তিনি এখন স্বাবলম্বী। নিজে মুদি দোকান চালিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। গত ১০ মার্চ দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি অনলাইনে ১৮ ইঞ্চি উচ্চতার শাহীনকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি জানান, তার জীবনের অন্যতম স্বপ্ন তামিমের সঙ্গে দেখা করা। প্রতিবেদনটি ওয়ানডে অধিনায়কের নজরে পড়ে যায়। 

s3

এরপরই তামিম শাহীনকে সিলেটে আসার আমন্ত্রণ জানান। দেশের সেরা ওপেনারের আমন্ত্রণ পেয়েছেন, যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না শাহীন। ভয় আর শঙ্কা নিয়েই তিনি পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে বরিশাল থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হন। তার আশঙ্কা ছিল এত বড় তারকার সাথে কি আর দেখা হবে? তামিম যখন ট্রফি উন্মোচন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন, ততক্ষণে গ্র‌্যান্ড সিলেটের ফটকের বাইরে অপেক্ষায় শাহীন। বিডি নিউজের স্পোর্টস এডিটর আরিফুল ইসলাম রনির মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে তাদেরকে হোটেলের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার অুনরোধ করেন।

শাহীনের জন্য যেন অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি। তার মনে হচ্ছিল যেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন! তামিমের হাত ছুঁয়েও যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না সেটা বাস্তব! ঘোর কাটতেই শাহীন গল্পের পসরা বসান। কীভাবে তিনি ক্রিকেট পছন্দ করছেন। কীভাবে তামিমের ভক্ত হয়ে উঠলেন। তামিম ছাড়া কার খেলা শাহীনের ভালো লাগে- নানা গল্প। মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে তামিম সেইসব শুনছেন। 

s4

এক পর্যায় শাহীনকে আরও সারপ্রাইজ দিতে মুশফিককে ডাকেন তামিম। সাবেক অধিনায়ক আসতেই তার সাথে গল্পে মেতে ওঠেন শাহীন। কোনও জড়তা নেই। মুশফিকের কাছে যাওয়ার আগে আবদার করেন ফোন নাম্বারের। মুশফিক এই আবদারও পূরণ করেছেন কিছুটা ভিন্নভাবে। টিম বয় নাসিরের নাম্বার দিয়ে বলেছেন, ‘যখন যেভাবে প্রয়োজন হবে নাসিরকে ফোন দিলেই আমার কাছে ম্যাসেজ চলে আসবে।’ গল্প-আড্ডা এগুতে থাকে। শাহীনকে তামিম খাবার খেতে বলেন। ট্রেতে সাজানো বেশ কিছু খাবার সামনে থাকলেও শাহীনের তাতে মনোযোগ নেই। তিনি তখনও ডুবে আছেন তামিমে! বাঁহাতি ওপেনার জানতে চান, জুস খাবেন কি না। শাহীনের ঝটপট উত্তর, ‘হুম। জুস আমার প্রিয়।’ কিছুক্ষণ পর জুস আসে, শাহীনের হাতে জুস তুলে দেন মুশফিক।

s6 

এভাবে গল্প আগাতে থাকে, গল্পে যুক্ত হন বরিশালের ক্রিকেটার শাহরিয়ার নাফিস। যিনি এখন ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের ম্যানেজার। কিছুক্ষণ পর যুক্ত হন বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমাম। যুক্ত হন টিম ম্যানেজার নাফিস ইকবাল। তামিম একে একে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেন। বড় ভাই নাফিসকে পরিচয় করিয়ে দিতেই শাহীন বলে ওঠেন, ‘আমি চিনি উনাকে। নাফিস ভাইয়ের খেলা আমি দেখেছি।’ গল্পের এক পর্যায়ে তামিম শাহীনসহ তার পরিবারের অন্যদের প্রথম ওয়ানডের ম্যাচের গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের পাঁচটি টিকিটের ব্যবস্থা করে দেন। রুম থেকে নিজের একটি জার্সি এনে শাহীনকে উপহার দেন তামিম। জার্সিতে লিখে দেন, ‘অনেক ভালোবাসা শাহীন।’

s2

শাহীন যেন কোনও কিছুই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সাথে আসা এক ভাগিনাকে শাহীন ডেকে বলেন ‘কেউ বিশ্বাস করবে না, আমি তামিম ভাইয়ের সাথে দেখা করেছি। কেউ একটু ভিডিও করো, ‘আমি সবাইকে ভিডিও দেখিয়ে বলবো, আমি আমার তামিম ভাইয়ের সাথে দেখা করতে পেরেছি।’’ এরপর কিছুক্ষণের জন্য আড্ডার ভিডিও চলে। সেখানে সাবেক দুই ক্রিকেটার ছাড়াও বর্তমান দুই ক্রিকেটার উপস্থিত ছিলেন। শাহীনের আড্ডা চলতে থাকে। এক পর্যায়ে বাড়ি থেকে কল আসে। কল রিসিভ করেই শাহীন বরিশালের ভাষায় বলতে থাকেন, ‘আমার সাথে তামিম ভাইয়ের দেখা হয়েছে। তামিম ভাই আমাকে অনেক যত্নআত্তি করেছেন। অনেক কিছু গিফট করেছেন। আমাকে জুস খাইয়েছেন। অনেক কিছু খেয়েছি। ছবি দেখাবো তোমাদের। অনেক সুন্দর ছবি তুলেছি।’

s7

আড্ডায় মজার অনেক অভিজ্ঞতার গল্প যেমন ছিল, তেমনই অভার আর অনুযোগের গল্পও ছিল। তামিম-মুশফিকরা সেই গল্প মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। এরপর ঠিকমতো চলাফেরা করতে না পারা শাহীনকে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা দুই ক্রিকেটার মিলে মোটরচালিত হুইল চেয়ার কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বরিশাল থেকে আসা-যাওয়ার খরচ বাবদ শাহীনকে বড় অংকের টাকা দিয়েছেন তামিম। দেশসেরা ওপেনারের কাছ থেকে টাকা পেয়ে রীতিমতো বিস্মিত শাহীন, ‘তামিম ভাইয়ের সাথে দেখা করতে পারবো, এটাইতো কল্পনাতে ছিল না। আর উনি আমাকে টাকা দিলেন, খাওয়ালেন, টিকিট দিলেন, হুইলচেয়ার দেবেন বলেছেন। এইসবতো আমি কল্পনাও করতে পারছি না।’

s9
 
শাহীনের গল্পের অধ্যায় শেষ হতে হতে তার সাথে আসা বাকি সদস্যদের আবদার- প্রিয় ক্রিকেটার তামিমের সাথে ছবি তুলবেন, নেবেন অটোগ্রাফ। তামিম সময় নিয়ে সবার জার্সিতে অটোগ্রাফ দিয়েছেন। সবার সাথে ছবি তুলেছেন। এই পর্ব শেষ করেই শাহীনের সাথে সেলফি তুলেছেন।  আড্ডা শেষ হওয়ার পর তামিম যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, শাহীন তখনও ঘোরের মধ্যেই। কী হয়ে গেলো যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না তিনি। হোটেলের মূল গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার চোখে মুখে তৃপ্তির আলোরেখা। স্বপ্ন পূরণের অনুভূতি নিয়ে আজ রাতে হয়তো শাহীনের ঘুম হবে না। হয়তো শনিবার ড্রেসিংরুমের পাশের গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে বসে প্রিয় ক্রিকেটার তামিমের খেলা দেখার রোমাঞ্চেও ঘুম হবে না। এমন শাহীনদের হৃদয়ে এভাবেই বেঁচে আছেন হাজারো তামিমরা।