বয়স এখন কত যে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখবো না: রুবেল

ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপে প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার পথ তৈরি করেছিলেন রুবেল হোসেন। শেষ আটে ভারতের বিপক্ষে ‘কিছু’ হিসাব-নিকাশ নিজেদের পক্ষে থাকলে সেমিফাইনালও খেলতে পারতো বাংলাদেশ! শুধু ২০১৫ সালেই নয়, বাংলাদেশকে এমন বহু সাফল্যে ভাসানোর নেপথ্য নায়ক ছিলেন রুবেল। সেই ডানহাতি পেসার লম্বা সময় ধরে জাতীয় দলে ব্রাত্য হয়ে আছেন। ২০২১ সালে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা রুবেল ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়মিত পারফরম্যান্স করছেন। কিন্তু তার প্রতিপক্ষ তাসকিন আহমেদ-ইবাদত হোসেন-হাসান মাহমুদ-শরিফুল ইসলামরা আছেন দারুণ ছন্দে। এই অবস্থায় তাকে দলে ফিরতে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স করতে হবে। ৩৩ বছর বয়সী ডানহাতি পেসার রুবেল অবশ্য সেই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত আছেন। তিনি স্বপ্ন দেখছেন আসন্ন ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার। এমনই আশার কথা বাংলা ট্রিবিউনকে শোনালেন দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে:

বাংলা ট্রিবিউন: ২০২১ সালে জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ ম্যাচ খেলেছেন, আবার দলে ফেরা আপনার জন্য কেমন কঠিন?

রুবেল: স্বাভাবিকভাবেই কঠিন আমার জন্য। এ মুহূর্তে জাতীয় দলের পেস আক্রমণ অনেক ভালো। দলের সব পেসার খুব ভালো করছে। আমার জন্য তো অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। আমাকে খুব ভালো বোলিং করতে হবে। প্রিমিয়ার লিগ চলছে, পহেলা মে থেকে সুপার লিগ হবে। ডিপিএলসহ অন্য ঘরোয়া ক্রিকেটে যদি ভালো করতে পারি, যদি আমি সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক হতে পারি, তাহলে হয়তো সুযোগ আসবে।

প্রিমিয়ার লিগ যেভাবে কাটছে, এই পারফরম্যান্স কি জাতীয় দলে ফেরার জন্য যথেষ্ট? 

রুবেল: আমি আগেই বলেছি, আমার জন্য তো আসলেই কঠিন। আমি তো বুঝি...। বাস্তবতা তো এটাই। এখানে আবেগ দিয়ে কিছু হবে না। এই মুহূর্তে জাতীয় দলে পেস বোলিং ইউনিটে থাকা তাসকিন, ইবাদত, শরিফুল, হাসানরা সবাই ভালো করছে। যে সুযোগ পাচ্ছে, ভালো করছে। খুব ভালো কিছু কম্বিনেশন দাঁড় করানো গেছে। এর আগে এরকম কখনোই বাংলাদেশ দল এতটা ভালো ছিল না। আমার কাছে মনে হয় আমার জন্য ফেরা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়।

rubel-1

তাহলে আপনাকে কী করতে হবে?

রুবেল: সুযোগ পেতে হলে আমাকে অসাধারণ পারফরম্যান্স করতে হবে। অনেক পরিশ্রম করতে হবে। আমি তো এত সহজে হাল ছাড়বো না। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবো। আমি নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে খুব ভালো করেই জানি। কেউ যদি বলে রুবেলের আর দেওয়ার কিছু নেই। আমার কাছে মনে হয় সেটা তার ভুল ধারণা। কারণ আমি আমার সক্ষমতা জানি। আলহামদুলিল্লাহ, আমার বোলিংয়ের গতি এখনও ভালোই আছে। বুঝি আমি আর কী কী করতে পারি!

গত বিপিএলের ফাইনালে ১৭তম ওভারে ২৩ রান দিয়েছিলেন। ওই ওভারেই শিরোপা থেকে ছিটকে যায় সিলেট স্ট্রাইকার্স। এত অভিজ্ঞতা থাকার পর তো আপনি পারেননি।

রুবেল: সেটা তো অবশ্যই, আমি ব্যর্থ হয়েছি। কেউ তো আর এই সমস্ত জায়গায় খারাপ করতে চায় না। আমি আমার শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ওই ম্যাচে আমি কিন্তু আগের ওভারগুলো ভালো করেছিলাম। ওই ওভার আসলে… আমিও কিন্তু চেষ্টা করেছি। দুভাগ্যবশত হয়নি। আমার কিন্তু পুরো টুর্নামেন্ট ভালো গেছে। ওই ওভারটাতেই গড়বর করে ফেলেছি। ৮ ম্যাচে আমি ১৪ উইকেট নিয়েছি। সেখানে তানভীর ১২ ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৭ উইকেট পেয়েছে। আমি আমার বোলিং নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম। আমি চেষ্টা করেছি, কিন্তু হয়নি। ওদের (কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সে) দুজন অভিজ্ঞ ব্যাটার ছিল, হয়তো আমি আরও একটু ভালো এক্সিকিউশন করতে পারতাম। টাইম নিয়ে যদি বোলিংটা করতে পারতাম। তাহলে হয়তো একটু ভালো হতো। 

rubel-2

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পেসারদের নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

রুবেল: তাসকিন, হাসান মাহমুদ, মোস্তাফিজ সবাই খুবই প্রতিভাবান এবং খুব ভালো খেলছে। হাসান মাহমুদকে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সেরা ডেথ বোলার মনে হয় আমার।  তাসকিন তো অনেকদিন ধরেই খেলছে। সে এখন অনেক সিনিয়র। আমার তো মনে হয় ও (তাসকিন) এখন পুরো পেস আক্রমণকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ওর কাছ থেকে অনেক পেস বোলারের অনেক কিছু শেখার আছে। যদি কারও বড় স্বপ্ন থাকে, তাহলে তাসকিনের কাছ থেকে পেসাররা শিখতে পারে। কীভাবে নিজেকে তৈরি করতে হয়, কীভাবে সাফল্য পেতে হয়- এইসব কিছুই তাসকিনের কাছ থেকে শেখা যাবে। পেস বোলারদের আসলে এই রকমই চিন্তা ভাবনা করা উচিত।

বলা হয়, মোস্তাফিজ ফুরিয়ে গেছেন। সত্যি কি তাই?

রুবেল: মোস্তাফিজকে নিয়ে আমরা অনেক সময় বলি সে শেষ হয়ে গেছে। মোস্তাফিজের কাছ থেকে আমরা যেভাবে আশা করি...। ও তো একজন পেস বোলার। আগে যেভাবে ডমিনেট করেছে, ওই জিনিস এখন ওর কাছ থেকে আশা করলে কিন্তু আমরা পাবো না। আপনারা জানেন একেকটা দলে ভালো ভালো অ্যানালিস্ট থাকে, ওকে নিয়ে বিশ্লেষণ করে। ফলে ও একটু ধুঁকছে। তবে খেয়াল করে যদি দেখেন, মোস্তাফিজ উইকেট কম পেলেও কিন্তু রান বেশি দিচ্ছে না। অন্য অনেক পেসারের চেয়ে বেশ ভালো। সমস্যা  হচ্ছে মোস্তাফিজের থেকে আমাদের প্রত্যাশার মাত্রা অনেক বেশি। আমি মনে করি ও নিজেকেও বুঝতে পারছে ওর এখন কী করতে হবে। আমার মনে হয় যেহেতু ওর কাটারে একটু সমস্যা হচ্ছে, ইয়র্কারটা ঠিকভাবে করতে পারলে তার বোলিংয়ে আরও একটি অপশন যোগ হবে। 

rubel-3

চাপের মুহূর্তে বাংলাদেশের অভিজ্ঞ পেসাররা মাঝে মধ্যে বিগড়ে যান, নিয়মিত এমন ব্যর্থতার পর অনেকে প্রশ্ন তোলেন, তাহলে এই অভিজ্ঞতা অর্জন করে কী লাভ?

রুবেল: এই রকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ অনেকগুলো ম্যাচ হেরেছে। আমার ক্ষেত্রে এমন অনেকগুলো ম্যাচ হয়েছে। তার আগেও হয়েছে। এই জায়গাটা নিয়ে আমাদের অনেক কাজ করার আছে। তবে  বর্তমানে আমাদের যে পেস বোলিং ইউনিট আছে, আমি বিশ্বাস করি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সেরা পেস বোলিং ইউনিট। আমাদের কি স্কিলে সমস্যা, নাকি প্ল্যানিংয়ে, এই জিনিসগুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। ইয়র্কার মারার সময় আমাদের বডি মুভমেন্ট ঠিক থাকে কি না, এগুলো ভাবতে হবে। তারপরও আমি বলবো বাংলাদেশের বোলিং বিভাগ এখন অনেক ভালো, অনেক উন্নত।

আপনিই বললেন দলে এখন অনেক প্রতিযোগিতা। সামনে আমাদের বিশ্বকাপ, সেখানে খেলার স্বপ্ন দেখেন কি?

রুবেল: স্বপ্ন দেখবো না কেন? ১২ বছর জাতীয় দলের সঙ্গে ছিলাম। দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছি। দেশ ও এই জার্সির প্রতি অন্যরকম একটি ভালোবাসা তো আছেই। অবশ্যই স্বপ্ন দেখি, আমি যদি ভালো খেলি। নির্বাচকরা তো আমাকে অবশ্যই সুযোগ দেবেন। বয়স এখন কত আমার? সাকিব ভাই বলছিলেন না যে বয়স কেবল একটি সংখ্যা। আপনার ভেতরে যদি সেই স্কিল থাকে এবং ভেতরে যদি সেই সামর্থ্য থাকে। তাহলে যে কোনও স্বপ্নই পূরণ হতে পারে। অবশ্য এই সুযোগের জন্য আমাকেও পারফরম্যান্স করতে হবে। অনেকের চেয়ে বেশি ভালো পারফরম্যান্স করতে হবে। স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন কেন দেখবো না? দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা তো একটা গর্বের বিষয়। সবাই স্বপ্ন দেখে…।

তার মানে আপনি হাল ছাড়ছেন না?

রুবেল: হাল ছাড়বো কেন? ক্রিকেটে তো আমি খেলবোই, আমি ক্রিকেট ছাড়া থাকতে তো পারবো না। একটা সময় তো থামতেই হবে। তবে সেটা কবে এখনই বলা সম্ভব নয়।  আমি এখনও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছি। সবখানেই ভালো করছি। আমি এখনই কেন ক্রিকেট ছাড়ার চিন্তা করবো? আমি যখন দেখবো, ঘরোয়া ক্রিকেটে আমার চাহিদা কমে গেছে, বোলিংয়ের গতি কমে গেছে, আমাকে কেউ নিচ্ছে না, আমার কদর নাই- তখন আমি নিজেই ক্রিকেট ছেড়ে দিবো। আমি তেলাতেলি কিংবা ধরাধরির মধ্যে নেই।

rubel-4

আসন্ন ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কতটা দেখেন?

রুবেল: ওয়ানডে ফরম্যাটে আমরা সফল দল। এই দলে ভালো কিছু তরুণ খেলোয়াড়ের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন সিনিয়রও আছেন। খুব ভালো একটা কম্বিনেশন আছে দলে। স্কোয়াডে সব ধরনের খেলোয়াড়ই আছে। বোলিং সাইড তো খুবই শক্তিশালী। তার মধ্যে উপমহাদেশের কন্ডিশনে খেলা। আমাদের স্পিন আক্রমণও ভালো আছে। ভারতের খেলা, ওখানে (আইপিএলে) মোস্তাফিজ খেলছে। লিটনও আছে। এই অভিজ্ঞতা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বকাপে কাজে লাগবে। তাসকিন, হাসান মাহমুদ ভালো অবস্থানে আছে। মোস্তাফিজের ওপর আমরা আশা করতেই পারি। সে এশিয়ার কন্ডিশনে যে কোনও সময়, যে কোনও পরিস্থিতিতে যে কোনও ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। এই বিশ্বকাপে ভালো করবে বাংলাদেশ, এমন বিশ্বাস আমিও করি। সুন্দর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নই পারবে সফলতা এনে দিতে। সব ক্রিকেটারের বিশ্বকাপে ভালো করা সম্ভব- এই বিশ্বাসটুকু রাখতে পারলে অবশ্যই ভালো করা সম্ভব। 

ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার পর কী পরিকল্পনা?

রুবেল: পরিকল্পনা অবশ্যই আছে। টুকটাক ব্যবসার মধ্যে আমি যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছি। অতি শিগগিরই জানতে পারবেন। তবে ক্রিকেটের সাথে কোনোভাবে থাকবো কিনা, এটা নিয়ে এখনও ভাবিনি। যখন ছেড়ে দিবো, তখনও যদি আমার আবেগ এখনকার মতো থাকে, তাহলে অবশ্যই কোনও না কোনোভাবে ক্রিকেটে থাকবো। এই মুহূর্তে ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি ছোটাখাটো কিছু ব্যবসা করার চিন্তা করছি। সবচেয়ে বড় কথা ভবিষ্যতের কথা তো বলা যায় না। আমাকে আপনারা চিনেছেন ক্রিকেটের কারণেই। নয়তো অঁজপাড়া গাঁয়ের রুবেলকে তো চেনার কথা ছিল না আপনাদের। ফলে কোনোভাবে যদি ক্রিকেটে যুক্ত হতে পারি, অবশ্যই হবো। কিন্তু এখন এই ভাবনা নেই।

rubel-5

আপনার ছেলে কি আপনার মতোই ক্রিকেটার হবে?

রুবেল: আমি ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখছি অনেক পরে। আমার ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল আর্মি অফিসার হওয়ার। ছেলেকে কী বানবো, এখনই সেটা বলা কঠিন। আমার চেষ্টা থাকবে ভালো মানুষ হওয়ার। আর পেশা হিসেবে আয়ান কী নেবে, সেটা তার সিদ্ধান্ত। সে যদি ক্রিকেটার হতে চায়, হবে। পড়াশোনা অবশ্যই করতে হবে। পাশাপাশি ওকে আমি ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত করবো।