বাবার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে গ্রামের বড় ভাই ওয়ালিউর রহমান শুভর উৎসাহে গাইবান্ধা স্টেডিয়ামে অনুশীলন শুরু করেন শিহাব জেমস। স্বপ্ন ছিল বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু প্রথমবার ট্রায়ালে বাদ পড়লেও দমে যাননি। নানির বাসায় থেকে গাইবান্ধা স্টেডিয়ামে নিবিড় অনুশীলন শুরু করেন। তাতেই ২০১৬ সালে দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় বিকেএসপিতে টিকে গেছেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
যদিও শিহাব জেমসের চলার পথ মসৃণ ছিল না। অন্যসব পরিবারের কর্তার মতোই তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক ছেলের ক্রিকেটার হওয়ার চেষ্টাকে ভালোভাবে নেননি। ছেলেকে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ক্রিকেট বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মন দেওয়ার কথা। তবুও বাবার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ক্রিকেট ধরে রেখেছেন এই ব্যাটার। তার শক্তি ছিলেন মা শাহিনুর বেগম। তিনি ছেলেকে বরাবরই আগলে রেখেছেন। যাবতীয় সব খরচ ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শিহাবের বাবা আব্দুর রাজ্জাক আগে ছেলের ক্রিকেটে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও এখন অবশ্য পরিস্থিতি পাল্টেছে।
পার্ট-টাইম লেগ স্পিন করলেও শিহাব মূলত মিডল অর্ডার ব্যাটার। বিশেষ করে পাওয়ার হিটিংয়ে দক্ষ তিনি। ক্রিকেটের প্রতি তার ভালোবাসা মূলত টিভিতে বাংলাদেশের খেলা দেখেই। টিভির সামনে বসে তার পাশে থাকা সমর্থকেরা যখন বাংলাদেশের কোনও ক্রিকেটারকে নিয়ে আলোচনা করতেন, তখন শিহাব আনমনা হয়ে যেতেন! মনে মনে ভাবতেন, জাতীয় দলে যদি কখনও খেলতে পারেন, তাকে নিয়েও এমন আলোচনা হবে। মিডল অর্ডার এই ব্যাটারের সেই স্বপ্নের পথেই আছেন।
অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশ স্কোয়াডকে নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের ধারাবাহিক আয়োজনে আজ থাকছে মিডল অর্ডার ব্যাটার মোহাম্মদ শিহাব জেমসের সাক্ষাৎকার।
বাংলা ট্রিবিউন: শুনেছি টিভিতে খেলা দেখেই ক্রিকেটে আগ্রহী হয়েছেন?
শিহাব জেমস: হ্যাঁ। ছোটবেলা থেকে টিভিতে বাংলাদেশের খেলা দেখেছি। খেলা দেখতে দেখতেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় আমার। বাংলাদেশ যখন ভালো খেলতো, খেলোয়াড়দের প্রশংসা হতো; তখন ভাবতাম– আমিও যদি ক্রিকেটার হয়ে দলকে জেতাই, তাহলে সবাই আমার প্রশংসা করবে! এসব ভাবনা আমাকে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটের হাতেখড়ি কীভাবে?
শিহাব: প্রথম শ্রেণি কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি তখন। গ্রামে বড় ভাইয়েরা একসঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন। আমারও ইচ্ছে হতো তাদের সঙ্গে খেলার। তারা আমাকে কখনও নিতেন, কখনও নিতেন না। খেলতে না পারলে পাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম। আমার বোনদের সঙ্গেও ক্রিকেট খেলেছি। তখন ক্রিকেট ভালো না পারলেও খুব উপভোগ করতাম। পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে বাবুল স্যারের কাছে প্রথম ক্রিকেট বলে অনুশীলন শুরু করি। তিনিই আমার প্রথম গুরু।
বাংলা ট্রিবিউন: এরপর?
শিহাব: আমার গ্রামের বড় ভাই ওয়ালিউর রহমান শুভ কিছুদিন গাইবান্ধা স্টেডিয়ামে অনুশীলন করেছেন। তিনি একদিন আমাকে ডেকে বলেন, ‘শিহাব তুই যদি ঠিকঠাক অনুশীলন করিস, তাহলে বিকেএসপিতে ভর্তি হতে পারবি।’ তার কথাটা আম্মুকে জানাই। আম্মু অনুপ্রাণিত করলেও আব্বু শুরুতে চাইতেন না আমি ক্রিকেট খেলি। ক্রিকেট খেলে কিছু হবে না– এই ভাবনা থেকে টাকা-পয়সা খরচ করতে রাজি ছিলেন না তিনি। তবুও আম্মু কখনও বাবার কাছে বলে, কখনও না বলে আমাকে টাকা দিতেন। বাবা অনেক রাগারাগি করে আম্মাকে বলতেন, ‘ক্রিকেটের পেছনে টাকা খরচ করে কোনও লাভ আছে? ওকে পড়াশোনায় মন দিতে বলো।’ তারপরও আম্মা আমাকে সবসময় ছায়া দিয়েছেন।
বাংলা ট্রিবিউন: বিকেএসপিতে কিভাবে ভর্তি হলেন?
শিহাব: আমাদের এলাকার বড় ভাইয়ের পরামর্শে গাইবান্ধা স্টেডিয়ামে অনুশীলন শুরু করি। আমার বাড়ি নলডাঙা থেকে স্টেডিয়ামের দূরত্ব অনেক। স্টেডিয়ামের কাছাকাছি আমার নানির বাসা। তাই তার বাসায় চার-পাঁচ দিন থেকে অনুশীলন করতাম, এরপর বাড়ি ফিরতাম। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর পড়াশোনার চাপ কিছুটা কমলো। তখন প্রথমবার বিকেএসপিতে ট্রায়াল দিয়েছিলাম। কিন্তু ২০১৫ সালে প্রথমবার সুযোগ পাইনি। ভাবলাম গ্রামে না গিয়ে নানির বাসায় থেকে অনুশীলন করি। এতে করে বেশি অনুশীলন করা যাবে। গাইবান্ধা সদরে নিউটন প্রিপারেটরি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। নানির বাসায় একবছর থেকে অনুশীলন করে পরের বছর দ্বিতীয় দফায় বিকেএসপিতে ট্রায়াল দিয়ে টিকে যাই। পরবর্তী সময়ে অনূর্ধ্ব-১৪ এবং অনূর্ধ্ব-১৫ দলে সুযোগ পাই। যদিও ব্যাটার হিসেবে সফল ছিলাম না। আমার ব্যাটে খুব বেশি রান ছিল না। খুব হতাশার মধ্যে ছিলাম। তবুও অনুশীলন চালিয়ে গিয়েছি। আমার ভাবনা ছিল একটাই– আমাকে বড় ক্রিকেটার হতে হবে। নিজেকে নিজে উদ্বুদ্ধ করেছি। তবে অনূর্ধ্ব-১৮তে গিয়ে আমার পারফরম্যান্সে ব্যাপক উন্নতি আসে। ঢাকা সাউথের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচে ৭৫ রানের একটি ইনিংস খেলেছিলাম। মনে হয় ওই ইনিংসের জন্যই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলের সঙ্গী হতে পেরেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার বাবা নিশ্চয়ই এখন অনেক খুশি?
শিহাব: এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বাবা অনেক খুশি, মা আর বোনেরা তো খুশিই। সবাই আমাকে অনুপ্রেরণা দেন। বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছি বলে সবাই আমার ওপর সন্তুষ্ট।
বাংলা ট্রিবিউন: বিরাট কোহলি আপনার প্রিয় ক্রিকেটার। সাকিবকেও পছন্দ করেন?
শিহাব: আমার প্রিয় ক্রিকেটার বিরাট কোহলি। ক্রিকেটের প্রতি তার নিবেদন, অনুশীলন, লাইফস্টাইল– সবই আমার ভালো লাগে। তবে আমি অনুপ্রেরণা পাই সাকিব (সাকিব আল হাসান) ভাইয়ের কাছ থেকে। তার শক্ত মানসিকতা আমাকে মুগ্ধ করে। আমি একদিন তার মতোই হতে চাই।
বাংলা ট্রিবিউন: দক্ষিণ আফ্রিকায় এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ দল শিরোপা জিততে কতটা প্রস্তুত?
শিহাব: আমার কাছে মনে হয়, সব দলের চেয়ে আমরা এগিয়ে আছি। আমাদের দলের ঐক্য অনেক ভালো। আমরা একসঙ্গে যত ম্যাচ খেলেছি এবং যত ম্যাচ জিতেছি, সেটা দারুণ বোঝাপড়ার সুবাদেই। আশা করি, দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলে সফল হতে পারবো। আমরা এশিয়া কাপ জিতেছি, এটা হয়তো অতীত। কিন্তু এমন অর্জন আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। ফলে বিশ্বকাপের আগে দলের প্রত্যেক ক্রিকেটার দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামবে।
বাংলা ট্রিবিউন: যতদূর জানি আপনি হার্ডহিটার ব্যাটার, আপনার দায়িত্বই হলো রানের চাকা সচল রাখা। কিন্তু এশিয়া কাপে রান পাননি। নিজের অফ-ফর্ম নিয়ে কতটা চিন্তিত?
শিহাব: বিশ্বকাপের আগে যে কয়দিন পাচ্ছি, সময়টা কাজে লাগাবো। এশিয়া কাপের ভুলগুলো নিয়ে কাজ করছি। আমাদের ব্যাটিং কোচ জাফর স্যারের (ওয়াসিম জাফর) সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি আমাকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। আমি নিজেও বুঝতে পারছি আমার ভুলগুলো। আশা করি, বিশ্বকাপের আগে ভুলগুলো কাটিতে উঠতে পারবো। দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার আগে কোনও দ্বিধা কিংবা সংকোচ রাখতে চাই না।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী?
শিহাব: আমার মূল লক্ষ্য দলের প্রত্যাশা পূরণ করা। দলের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাটিং করা। কত রান করছি সেটি গুরুত্বপূর্ণ না। দল উপকৃত হলেই আমি খুশি। অবশ্যই লম্বা সময় ব্যাটিং করতে পারলে বড় ইনিংস খেলতে চাই। এটা তো বিশ্বমঞ্চ, এখানে ভালো কিছু করতে পারলে সবার নজরে থাকা যাবে।
একনজরে
পুরো নাম: মোহাম্মদ শিহাব
ডাক নাম: জেমস
জন্ম: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৫
জন্মস্থান: নলডাঙা, গাইবান্ধা
বাবা: মো. আব্দুর রাজ্জাক
মা: শাহিনুর বেগম
উচ্চতা: ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি
পড়াশোনা: এইচএসসি পাস
প্রথম ক্লাব: বিকেএসপি
বর্তমান ক্লাব: গুলশান ইয়ুথ ক্লাব
প্রথম কোচ: বাবুল
বোলিং স্টাইল: লেগ স্পিন (অনিয়মিত)
ব্যাটিং স্টাইল: ডানহাতি
ব্যাটিংয়ে শক্তির জায়গা: দলের চাহিদা অনুযায়ী খেলা
প্রিয় শট: স্কয়ার কাট
প্রিয় মানুষ: বাবা-মা
প্রিয় ক্রিকেটার: বিরাট কোহলি
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: বিকেএসপিতে সুযোগ পাওয়া