গাজীপুরের সিনাবহ হাইস্কুলের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক শওকত আলী সিদ্দিকীর স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হওয়ার। কিন্তু জীবনের টানাপোড়েনে সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে। তবে হাল ছেড়ে দেননি তিনি। নিজের স্বপ্নের সারথী বানিয়েছেন দুই পুত্রসন্তানকে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বড় ছেলের মৃত্যু হয় শাহজাদপুরে গ্রামের পুকুরে ডুবে। ছোট ছেলে ওয়াসি সিদ্দিকী তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। বাবা ও প্রয়াত বড় ভাইয়ের স্বপ্নপূরণের ভার এখন তার কাঁধে। এর অংশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে দারুণ কিছু করে দেখাতে চান লেগ-স্পিনার ওয়াসি।
বাবার ইচ্ছে থাকলেও ক্রিকেটে স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যেতে আগে মায়ের মন জয় করতে হয়েছে ওয়াসিকে। কারণ ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে চাইতেন না তিনি। ক্রিকেট খেলাকে তার মনে হতো সময় নষ্ট করা। একদিন ছেলেকে খেলতে নিয়ে গিয়ে ভুল ভাঙের তার। এরপর থেকে উৎসাহ দিতে থাকেন তিনিও।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় লেগ-স্পিনারদের সংগ্রাম করতে হয় তুলনামূলক বেশি। জাতীয় দলে এখন পর্যন্ত কোনও লেগ-স্পিনার এসে থিতু হতে পারেননি। ফলে নতুনদের সামনে আদর্শ হওয়ার মতো স্থানীয় উদাহরণ নেই। এত কিছু না ভেবে ওয়াসি নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। তার প্রতিভার খবর পৌঁছে গেছে জাতীয় দলের হেড কোচের কাছে। বিদেশ সফরে নেট বোলিংয়ের জন্য ওয়াসিকে নিয়ে যান চন্ডিকা হাথুরুসিংহে।
এবার যুব বিশ্বকাপে ওয়াসির সামনে সুযোগ এসেছে নিজের পায়ের মাটি শক্ত করার। একজন বিশ্বমানের লেগ-স্পিনার পাওয়ার অপেক্ষা হয়তো এবার ফুরাবে তার সুবাদে!
অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশ স্কোয়াডকে নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের ধারাবাহিক আয়োজনে আজ থাকছে লেগ-স্পিনার ওয়াসি সিদ্দিকীর সাক্ষাৎকার।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার বড় ভাইকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন বাবা, কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের মশাল এখন আপনার হাতেই।
ওয়াসি সিদ্দিকী: আব্বু সবসময় চাইতেন তার বড় ছেলে যেন ক্রিকেটার হয়। সেভাবেই তাকে গড়ে তোলা হচ্ছিল। ভাইয়া খুব ভালো ক্রিকেট খেলতেন। তার স্পিন বল খুব ভালো হতো। তাকে ঘিরেই আব্বুর সব পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ভাইয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তখন আমি সবেমাত্র প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। ভাইয়া নেই, এখন আমাকে নিয়ে আব্বুর স্বপ্ন। ভাইয়াকে হারিয়ে তিনি অনেক কঠিন সময় পাড়ি দিয়েছেন। তার স্বপ্নপূরণ করতে পারলে, আমার জন্য সত্যিকার অর্থেই স্পেশাল অর্জন হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: ক্রিকেটের রাজপথে উঠে এলেন কীভাবে?
ওয়াসি: ভাইয়া মারা যাওয়ার পর পুরো পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আমি যখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, তখন গাজীপুরে ট্রায়াল দিতে গিয়েছিলাম। তার আগে বড় ভাইয়ের সঙ্গে টেপ টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। আব্বু আমাদের ট্রায়ালে নিয়ে যান। ছয় মাস গাজীপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থায় অনুশীলন করে বিকেএসপিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ২০১৮ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হই। সেখানে থেকে বয়সভিত্তিক সব ধাপ পেরিয়ে আজ এই পর্যায়ে এসেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: শুনেছি আপনার ক্রিকেটার হওয়ার ব্যাপারে সায় দিতেন না মা?
ওয়াসি: আম্মু শুরুর দিকে চাইতেন না আমি ক্রিকেটার হই। তার চাওয়া ছিল, আমি যেন ঠিকঠাক পড়াশোনা করি। তবে আমার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরির পর তিনি বুঝতে পারেন, ক্রিকেটে ভালো একটা সম্ভাবনা আছে। এরপর আম্মুর কাছ থেকে অনেক ভালো সহায়তা পাচ্ছি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার মায়ের মত হুট করে পাল্টালো কীভাবে?
ওয়াসি: মা আমাকে সবসময় পড়াশোনায় মনোযোগ রাখতে বলতেন। তার স্বপ্ন ছিল আমাকে প্রকৌশলী বানানোর। এদিকে আব্বু আমাকে বিভিন্ন সময় মাঠে নিয়ে যেতেন। ভাইয়াকে হারানোর পর আমাকে ঘিরে তার অনেক স্বপ্ন। এজন্য তিনি সবসময় আমাকে ছায়া দিয়ে রাখেন। অনূর্ধ্ব-১৪ দলে থাকার সময় আমাকে ট্রায়ালে নিয়ে যান আব্বু। এ কারণে তার সঙ্গে আম্মুর অনেক রাগারাগি হয়েছিল। একদিন আব্বুর স্কুলে খুব ব্যস্ততা থাকায় আম্মুর ওপর দায়িত্ব পড়ে আমাকে নিয়ে যাওয়ার। আম্মু শুরুতে যেতে চাননি। পরে আমাকে নিয়ে যান ঠিকই। সেখানে যাওয়ার পর তার উপলব্ধি হয়, খেলাধুলায় থেকেও ভালো কিছু করা সম্ভব। সেই থেকে আম্মু আমাকে উৎসাহ দেন।
বাংলা ট্রিবিউন: বাবা আপনাকে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করেন?
ওয়াসি: আব্বু অনেক আগে থেকে ক্রিকেট খেলা দেখেন। ক্রিকেট ভালো বোঝেন তিনি। আমার খেলাও ভালো বোঝেন। কোথাও ভুল করলে সেগুলো শুধরে দেন আব্বু। তার কাছ থেকে অনেক উৎসাহ পাই। ভালো-খারাপ সবসময় সবখানেই আমার জন্য তার উপস্থিতি টের পাই।
বাংলা ট্রিবিউন: এমনিতেই বাবার স্বপ্নপূরণের চ্যালেঞ্জ আছে, তার ওপর আপনি লেগ-স্পিনার। কঠিন এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার কারণ কী?
ওয়াসি: ছোটবেলা থেকে লেগ-স্পিনের প্রতি আমার দুর্বলতা আছে। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুযায়ী চলার চেষ্টা করছি। লেগ স্পিনার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার স্বপ্ন বিশ্বমানের একজন লেগ-স্পিনার হওয়ার। যদিও জাতীয় দলে লেগ-স্পিনারদের সুযোগ হয় না। এসব বিষয় কখনও মাথায় আনিনি। আমার ভাবনা ছিল– যদি সেরা অবস্থানে যেতে পারি, তাহলে অবশ্যই সুযোগ আসবে আমার সামনে।
বাংলা ট্রিবিউন: এশিয়া কাপে আপনার পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা হয়েছে, এসব কতটা অনুপ্রাণিত করছে?
ওয়াসি: খবরে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাকে নিয়ে লেখা দেখে অবশ্যই উদ্বুদ্ধ হয়েছি। আগামীতে ভালো করতে পারলে প্রমাণিত হবে বাংলাদেশে লেগ-স্পিনার আছে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আমার জন্য ভালো একটা সুযোগ। আশা করি, সুযোগটা খুব ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে পেসারদের আধিপত্য থাকে, সেখানে লেগ-স্পিনার হিসেবে সাফল্য পেতে কেমন প্রস্তুতি নিয়েছেন?
ওয়াসি: আমি কিন্তু কঠিন কিছু ভাবছি না। অন্য দেশের লেগ স্পিনাররা তো ঠিকই ভালো করছেন সেখানে। আমি ব্যক্তিগতভাবে আত্মবিশ্বাসী। এশিয়া কাপের আত্মবিশ্বাস আমাদের কাজে দেবে। এটা সত্যি যে, দক্ষিণ আফ্রিকান কন্ডিশন একটু আলাদা। তবে এতে সমস্যা হবে বলে মনে করি না। আমরা বিশ্বকাপের বেশ কিছুদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাবো, সেখানে আমরা অনুশীলন করে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবো। ইনশাল্লাহ পুরোপুরি প্রস্তুত হয়েই বিশ্বকাপের মঞ্চে নামতে পারবো।
বাংলা ট্রিবিউন: ওয়াসির ব্যক্তিগত লক্ষ্য কী?
ওয়াসি: আমি এটা-ওটা করতে চাই ভাবা ঠিক নয়। পরিস্থিতিই আমাকে জানিয়ে দেবে কী করতে হবে। কেবল আমার প্রক্রিয়া অনুযায়ী খেলে যেতে চাই। নির্দিষ্ট ব্যাটারদের বিপক্ষে আমার পরিকল্পনা যদি ভালো হয়, তাহলে অবশ্যই সফল হবো। সাফল্য আমার হাতে নেই। আমার হাতে যেটা আছে সেটাই করে দেখাতে চাই। কষ্ট ও পরিশ্রমের সম্মিলনে ভালো করতে পারলে বাংলাদেশে লেগ-স্পিনারের শূন্যতা পূরণ হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: রশিদ খান আপনার পছন্দের ক্রিকেটার, কেন?
ওয়াসি: রশিদ খানের বোলিং আমার খুব ভালো লাগে। তার বোলিং ও গ্রিপসহ নানান কৌশল আলাদা। রশিদ তেমন কোনও অনুশীলন সুবিধা না পেয়েও বিশ্বমানের বোলার হয়ে উঠেছেন। তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হই। তার কিছু সাক্ষাৎকার পড়ে জেনেছি, তিনি নিজে থেকে বোলিংয়ের নতুন দিক আবিষ্কারের চেষ্টা করেন। নিজের প্রতি তিনি বেশি আত্মবিশ্বাসী। তবে মানুষ হিসেবে আমার পছন্দের ক্রিকেটার বাবর আজম। তার ব্যাটিং আমাকে মুগ্ধ করে।
একনজরে
পুরো নাম: ওয়াসি সিদ্দিকী
ডাক নাম: ওয়াসি
জন্ম: ৬ নভেম্বর, ২০০৬
জন্মস্থান: সিরাজগঞ্জ
বাবা: শওকত আলী সিদ্দিকী
মা: শারমিন সিদ্দিকি
উচ্চতা: ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি
পড়াশোনা: এইচএসসি পরীক্ষার্থী
প্রথম ক্লাব: বিকেএসপি
বর্তমান ক্লাব: বিকেএসপি
প্রথম কোচ: লিটন স্যার
বোলিং স্টাইল: লেগ-স্পিন
বোলিংয়ে শক্তির জায়গা: জোরের ওপর বোলিং করা
যুব ওয়ানডেতে উইকেট: ১৩ ম্যাচে ১২ উইকেট
ব্যাটিং স্টাইল: বাঁহাতি
প্রিয় শট: স্লগ সুইপ
যুব ওয়ানডেতে রান: ১৩ ম্যাচে ৮৯ রান
প্রিয় মানুষ: বাবা
প্রিয় ক্রিকেটার: বাবর আজম, রশিদ খান
ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্ত: অনূর্ধ্ব-১৮তে দুই ইনিংসে ৯ উইকেট