টি-টোয়েন্টিতে ‘পঞ্চপাণ্ডব’ অধ্যায়ের দাঁড়ি টানলেন মাহমুদউল্লাহ

২০০৭ সালে তরুণ চার ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম ও তামিম ইকবাল নিজেদের প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলতে নেমেই ভারতের মতো দলকে হারাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এক বছর পরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় মাহমুদউল্লাহর। এরপর তারা পাঁচ জন মিলে বাংলাদেশকে অনেকবারই জয়ের আনন্দে ভাসান। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আলো ছড়িয়ে পরিচিতি পান পঞ্চপাণ্ডব নামে। এবার টি-টোয়েন্টি থেকে এই নামটি চিরতরে মুছে যাচ্ছে। পঞ্চপাণ্ডবের শেষ সদস্য মাহমুদউল্লাহ মঙ্গলবার এই সংস্করণ থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন।  

২০০৬ সালে বাংলাদেশ প্রথম টি-টোয়েন্টি খেলে, ওই ম্যাচের একাদশে ছিলেন সাকিব, মাশরাফি ও মুশফিক। ২০০৭ সালে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে পা রাখেন তামিম। এই চার জনই ইতোমধ্যে অবসর নিয়েছেন এই ফরম্যাট থেকে। এবার সরে দাঁড়াচ্ছেন মাহমুদউল্লাহ। 

বাংলাদেশ দলকে স্মরণীয় সাফল্যের নায়কদের আর কাউকে দেখা যাবে না টি-টোয়েন্টিতে। পঞ্চপাণ্ডবের শেষ ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহর হাতে আছে কেবল দুটি ম্যাচ। বাংলাদেশের ক্রিকেটে আক্ষেপ হয়েই থাকবে পঞ্চপাণ্ডবরা কোনও বৈশ্বিক ট্রফি জিততে না পারায়। টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে ফরম্যাটের এশিয়া কাপে বেশ কয়েকবার ফাইনাল খেললেও ট্রফিটা ছুঁতে পারেননি তারা। পঞ্চপাণ্ডবদের নিয়ে ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সেরা সাফল্য কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা।

বুধবার দিল্লিতে ভারতের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। এই ম্যাচের আগের দিন মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে এসে টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মাহমুদউল্লাহ। তবে ভারতের বিপক্ষে দ্বিতীয় ও শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলবেন তিনি। আগামী ১২ অক্টোবর ভারতের বিপক্ষে মাহমদুউল্লাহ তার ক্যারিয়ারের শেষ টি-টোয়েন্টি খেলবেন। ২০০৭ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল মাহমুদউল্লাহর। 

বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত খেলেছে ১৭৭ টি-টোয়েন্টি, মাহমুদউল্লাহ মাঠে ছিলেন অধিকাংশ ম্যাচেই। তার খেলা ১৩৯ ম্যাচে বেশ কিছু জয়ে ছোটখাটো অবদান থাকলেও সবচেয়ে বড়টি ছিল নিদাহাস ট্রফিতে দলকে ফাইনালে তোলার ইনিংস। ২০১৮ সালে লঙ্কানদের বিপক্ষে ১৮ বলে তার খেলা ৪৩ রানের ক্যামিও ইনিংসে ফাইনালে উঠে বাংলাদেশ। এই ফরম্যাটে মাহমুদউল্লাহ ২৩.৪৮ গড়ে ২৩৯৫ রান করেছেন। স্ট্রাইক রেট ১১৭.৪। বল হাতে নিয়েছেন ৪০ উইকেট। কোনও সেঞ্চুরি না থাকলেও হাফ সেঞ্চুরি আছে আটটি। ভারত সিরিজ শেষে নামের সঙ্গে হয়তো আরও দুটি ম্যাচ এবং কিছু রান যুক্ত হবে।

মাহমুদউল্লাহর আগে টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন সাকিব আল হাসান। চলতি সফরেই কানপুর টেস্টের আগে সংবাদ সম্মেলনে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন বাঁহাতি অলরাউন্ডার। যদিও ঢাকায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শেষ টেস্ট খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন সাকিব। তার ইচ্ছা পূরণ হলে চলতি মাসেই শেষ টেস্ট খেলার মাধ্যমে লাল বলের ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ করবেন তিনি। অন্যদিকে টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েও যদি কিন্তু রেখে দিয়েছেন। দল যদি প্রয়োজন মনে করেন, সেক্ষেত্রে অবসর ভেঙে ফিরবেন। তবে সেই সুযোগ খুব একটা নেই বললেই চলে। সেক্ষেত্রে ২০০৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সদস্য থাকা সাকিবের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে রইলো গত বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। 

সাকিবের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ার বেশ সমৃদ্ধ। ১২৯ ম্যাচ খেলে ২৫৫১ রানের পাশাপাশি বল হাতে নিয়েছেন ১৪৯ উইকেট। কোনও সেঞ্চুরি না পেলেও হাফ সেঞ্চুরি করেছেন ১৩টি। বাংলাদেশের বেশ কিছু জয়েই সাকিবের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের ভূমিকা রয়েছে। 

মাহমুদউল্লাহ-সাকিবের আগে অনেকটা অভিমানেই টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেন মুশফিকুর রহিম। ২০২২ এশিয়া কাপে ব্যর্থতার পর সামাজিকমাধ্যমে এক বিবৃতি দিয়ে বিদায় বলেন তিনি। সাকিবের মতো মুশফিকও ২০০৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সদস্য ছিলেন। ১০২টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ৯৩ ইনিংসে ব্যাট করে ১৯.৪৮ গড়ে করেছেন ১৫০০ রান। সেখানে ৬টি ফিফটি করা ৩৭ বছর বয়সী এ ব্যাটারের স্ট্রাইক রেট ১১৫.০৩। মুশফিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিলেও ওয়ানডে ও টেস্ট চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে পঞ্চপাণ্ডবের আরেক সদস্য তামিমের অবসর নিয়েও কম আলোচনা হয়নি। তিনি জাতীয় দলের হয়ে সবশেষ টি-টোয়েন্টি খেলেন ২০২০ সালের মার্চে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ওই বছর অক্টোবর-নভেম্বরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল ঘোষণার আগে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে নিজেকে সরিয়ে নেন তামিম। তারপরও টি-টোয়েন্টিতে তামিমের ফেরা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা চলতো। তবে ২০২২ সালে সব আলোচনা থামিয়ে দেন এক ঘোষণার মাধ্যমে। ওই বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ শেষ করেই হুট করে টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন দেশ সেরা এই ওপেনার। তাও ঘোষণাটি দিয়েছিলেন নিজের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে! আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ৭৮ ম্যাচ খেলে (বাংলাদেশের হয়ে ৭৪, বিশ্ব একাদশের হয়ে ৪ ম্যাচ) ২৪.০৮ গড়ে ১ হাজার ৭৫৮ রান করেন তামিম। স্ট্রাইক রেট ১১৬.৯৬। 

তামিমের ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়ে কোনও প্রশ্ন ছিল না। সমস্যা ছিল কেবল স্ট্রাইক রেট নিয়েই। এসব নিয়ে সমালোচনার মধ্যে নিজে থেকেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন বাঁহাতি ওপেনার। তামিম কুড়ি ওভারের ফরম্যাট থেকে অবসর নিলেও বাকি দুই ফরম্যাটে খেলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা। গত বিশ্বকাপের আগে সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছিলেন। টেস্ট তো খেলেছেন আরও আগে। গত বছর এপ্রিলে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট খেলেন তামিম। তাকে নিয়ে এখনও আলোচনা আছে ওয়ানডেতে ফিরতে পারেন তিনি। যদিও তার কথা, বিসিবি এবং সতীর্থরা সুনির্দিষ্ট কারণে তাকে চাইলেই কেবল তিনি ফিরবেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সেই সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ।

সবার আগে টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের দিক বদলের অন্যতম নায়ক মাশরাফি। ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বি-পাক্ষিক সিরিজ খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ। টি-টোয়েন্টি সিরিজ চলাকালেই হুট করে ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে মাশরাফি ঘোষণা দেন যে ওই দুই ম্যাচ সিরিজের পর তিনি আর টি-টোয়েন্টি খেলবেন না। মাশরাফি ৫৪ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৩৭৭ রান করেছেন এবং ৪২ উইকেট নিয়েছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল ২৮ খেলার মধ্যে দশটিতে জয়লাভ করেছে, ১৭টিতে পরাজিত হয়েছে এবং একটির ফলাফল অমীমাংসিত ছিল। মাশরাফি শুধু টি-টোয়েন্টি নয়, ওয়ানডে থেকে বিদায় নিয়েছেন। ২০২০ সালে সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সতীর্থদের কাঁধে চড়ে বিদায় বলেন আন্তর্জাতিক ওয়ানডেকে। তবে ইনজুরির কারণে লম্বা সময় ধরেই টেস্ট খেলতে পারছিলেন না তিনি। ৩৬ টেস্ট খেলা মাশরাফি সর্বশেষ লাল বলে খেলেছেন ২০০৯ সালে। 

এই পঞ্চপাণ্ডবের প্রত্যেকেই অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দলকে সামনে থেকে এগিয়ে নিতে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু থামতে সবাইকেই হয়।

তামিম-মুশফিক-সাকিব-মাশরাফি-মাহমুদউল্লাহরাও তাই থামছেন। ইতোমধ্যে ব্যাটন বদল হল। পঞ্চপাণ্ডবের পর নেতৃত্ব এখন নাজমুল হোসেন শান্তর কাঁধে। এখন শান্ত-মিরাজ-লিটন-হৃদয়-তাসকিনরা মিলে বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যান সেটিই দেখার!