বিশ্ব ক্রিকেটে কোচদের চাকরি হারানোর ঘটনা অহরহ। তবে সাধারণত পারফরম্যান্সের অধারাবাহিকতা বা ব্যর্থতার কারণে কোচদের চাকরি হারাতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের চাকরি হারাতে হলো অদচারণ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে। মঙ্গলবার জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বোর্ড সভাপতি ফারুক আহমেদ তাকে চাকরিচ্যুত করার আর কোনও কারণ উল্লেখ করেননি। মূল কারণ হিসেবে নাসুমের গায়ে হাত তোলাকেই সামনে এনেছেন তিনি।
ভারতে ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ চলাকালে নাসুমের গায়ে হাত তোলেন হাথুরুসিংহে। ওই বিশ্বকাপে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচ ছিল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছিল সেদিন। ম্যাচে বিরতির সময় একাদশের বাইরে থাকা নাসুমকে পানি নিয়ে মাঠে যেতে বলেন কোচ হাথুরুসিংহে। সবকিছু গুছিয়ে পানি নিয়ে মাঠে যেতে নাসুমের ৩০ সেকেন্ড দেরি হয়। যে কারণে সেদিন তাকে চড় মারেন হাথুরুসিংহে। হাথুরুসিংহের এমন ব্যবহারে সেদিন নাসুম কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। প্রধান কোচের এমন ব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন দলের ট্রেইনার এবং বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড। ম্যাচ শেষে ক্রিকেটাররাও ঘটনাটি জানতে পারেন।
এই নিয়ে তখন বিস্তর লেখালেখি হলেও আগের বোর্ডে সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বিষয়টিকে উড়িয়েই দিয়েছিলেন। বিশ্বকাপ ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে একটি কমিটি গঠন হয়েছিল। সেই কমিটি রিপোর্টও তৈরি করে জমা দিয়েছিল। ওই রিপোর্টে নাসুমের গায়ে হাত তোলার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও আগের বোর্ড পুরোপুরি চেপে যায়। এমনকি বিশ্বকাপ ব্যর্থতার তদন্ত রিপোর্টও জনসম্মুখে প্রচার করেনি তারা। গত অক্টোবরে সরকার পতনের পর বিসিবির পদেও বদল আছে। সাবেক অধিনায়ক ফারুক আহমেদ বিসিবি প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর পরই ঘোষণা দেন তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশে আনবেন।
রিপোর্ট প্রকাশে না আনলেও সেই রিপোর্ট আমলে নিয়ে হাথুরুসিংহকে বরখাস্ত করছেন তিনি। সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন কয়েক দফা জানিয়েছিলেন নাসুমের গায়ে হাত তোলার বিষয়টি তিনি জানেন না, তদন্ত রিপোর্টে এমন কিছু ছিল না। কিন্তু দেড় মাসের ব্যবধানে পুরানো সেই তদন্ত রিপোর্টে নাসুমের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।
হাথুরুসিংহকে বরখাস্ত করার কারণ বলতে গিয়ে বোর্ড সভাপতি ফারুক আহমেদ বলেছেন, ‘দুই তিনটা ঘটনা ঘটেছে যেগুলো খুব পীড়াদায়ক ছিল আমার জন্য। অ্যাজ এ ফরমার প্লেয়ার প্লাস টিমের জন্য এটা ভালো উদাহরণ ছিল না আরকি। সো ওইদিক বিবেচনা করে আমরা আজকে একটা শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছি। আপনারা জানেন এই প্রসেসগুলো খুব একটা সহজ না। আইনি দিক থাকে এগুলোর। (অ্যাসল্ট করাটা) ইয়েস। অ্যাসল্ট এবং চাকরির যে- পারমিশন না নিয়ে আপনার ছুটি কাটানো। একটা হলো পেইড লিভ থাকে ও আনপেইড আনলিভ থাকে নটিফাই করতে হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটা হয় নাই।
ইট ওয়াজ অ্যা মিক্সার অব পারফরম্যান্স, যেমন টেস্ট দুইটা ভালো খেলেছি
এরপরই ফারুকের কাছে জানতে চাওয়া হয় শুধু মাত্র কি নাসুমের সঙ্গে ঘটনার কারণেই কি বরখাস্ত করা হয়েছে হাথুরুসিংহকে। উত্তরে ফারুক বলেছেন, ‘আপনি জানেন এখন আইসিসি খুব স্ট্রংলি রেসিজম, অ্যাবিউজ এগুলো তারা স্ট্রংলি হ্যান্ডেল করে। যদি অ্যাসল্টের মতো কিছু হয়, তাহলে আরও সিরিয়াসলি হ্যান্ডেল করবে। এটা পার্টিকুলার ওই ছেলের জন্য খুবই বাজে একটা জিনিস। খুব ভালোভাবে বোঝেন ন্যাশন্যাল টিমের প্লেয়ার। উই আর হিউম্যান বিং। আমি ডিফেন্ড করতে চাচ্ছি না। হিট অ্যাট দ্য মোমেন্ট একটা জিনিস হতে পারে বাট ফিজিক্যাল অ্যাসল্ট আসলে কোনও পর্যায়ে কোনোভাবে একটা ন্যাশন্যাল প্লেয়ারকে আপনি করতে পারবেন না। এটার শাস্তি হয়, এখন যেটা হলো আর কি। এটা আরও আগে হওয়া উচিত ছিল।’
ফারুক বিস্ময় প্রকাশ করেছেন রিপোর্ট সবকিছু থাকার পরও আগের বোর্ড কেন কোনও উদ্যোগ নিলো না, ‘আপনাদের বলেছি, আপনারা খুব জোর দিয়েছিলেন রিপোর্টটা বের হয় না কেন? আমি ওই রিপোর্ট নিয়ে অনেক কাজ করেছি। আপনি শুনেছেন আমি প্লেয়ারের সঙ্গে টেলিফোন, ফিজিক্যাল মিট করেছি। রিপোর্ট আমি পড়েছি। রিপোর্টে সবকিছু আছে। নিয়মের মধ্যে থেকে চেষ্টা করেছি- সব প্রসেস করতে কিন্তু পাকিস্তানে খেলতে গেলাম, পাকিস্তান থেকে এসে ইন্ডিয়া গেলাম। ইন্ডিয়া থেকে এসে প্রসেসটা হয়েছে। তারপরও কিন্তু কোনও সময় নেই। আবার আরেকটা সিরিজ শুরু হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতেই হতো।’
শুধু অসদাচরণই নয়। হাথুরুসিংহের বিরুদ্ধে ইচ্ছে মতো ছুটি কাটানোর অভিযোগও আছে। তার জন্য বছরে ছুটি বরাদ্দ ছিল ৪৫ দিনের। তবে গত বছর তিনি কাটিয়েছেন ৬৭ দিন ছুটি। আর চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৫৯ দিন ছুটি কাটিয়েছেন এই লঙ্কান কোচ। অতিরিক্ত ছুটির জন্য বিসিবির কাছে থেকে অনুমতিও নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এটাকে আচরণবিধি ভঙ্গ হিসেবে দেখছে বিসিবি।
হাথুরুসিংহের সঙ্গে আগে থেকেই দ্বন্দ্ব ছিল বর্তমান বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদের। ২০১৬ সালে দল নির্বাচনে হাথুরুসিংহের হস্তক্ষেপের কারণেই প্রধান নির্বাচকের পদ থেকে সরে গিয়েছিলেন ফারুক। এবার বিসিবির সভাপতির পদে আসার পর আগের সিদ্ধান্তেই অটল ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার আচরণবিধি লংঘন ও অসদচারণের কারণ দেখিয়ে তাকে বরখাস্ত করলেন বোর্ড সভাপতি।
আপাতত হাথুরুসিংহকে ৪৮ ঘণ্টার সাপপেনশন চিঠি ধরিয়ে দিলেও আদতে এটি চাকরিচুত্যির চিঠিই। এ প্রসঙ্গে ফারুক বলেছেন, ‘হাথুরুর সাসপেনশন মিনিংস ৪৮ ঘণ্টার একটা নোটিশ পিরিয়ড। আমরা নোটিশটা মিস কন্ডাক্টে, যখন একটা কোচ বাদ যায় বা যে কারও চাকরি যায়। আমরা চিন্তা করি ইন্টারন্যাশন্যাল একজন পারসন সো এটা আসলে দেশের বাউন্ডারির বাইরে যাবে এটা ফলো করতে চাই, নিজেদের দেশের নিয়ম এবং ইন্টারন্যাশন্যাল যে নিয়মগুলো আছে ওইটা ফলো করেই ৪৮ ঘণ্টার নোটিশ- এটা না করলেও চলত। আমরা এই জন্য তাকে নোটিশ করেছি। এরপর হয়তো টার্মিনেশন হবে আর কী।'