সাকিব ইস্যুতে মিরপুরে মারামারি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিচার্জ

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে সাকিব আল হাসানকে রেখে স্কোয়াড ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দেশের বিমানও ধরেছিলেন তিনি। কিন্তু তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানায় দেশের ক্রিকেট সমর্থকগোষ্ঠীর একটি অংশ। ওই পরিস্থিতিতে সবুজ সঙ্কেত না পেয়ে দুবাই থেকে ফিরে যান বাংলাদেশের বাঁহাতি অলরাউন্ডার। তাকে বাদ দিতে বাধ্য হন নির্বাচকরা। এর পরদিন সাকিবকে ফেরানোর দাবিতে মিরপুরে স্টেডিয়ামের সামনে বিক্ষোভ করেন তার সমর্থকগোষ্ঠী। শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এবার রূপ নিলো সহিংসতায়। 

গত কয়েকদিন ধরেই সাকিব ভক্ত এবং তার বিরোধীরা বিক্ষোভ করছিলেন মিরপুরে স্টেডিয়ামের প্রধান ফটকের সামনে। প্রথম টেস্টের আগের দিন রবিবার যেন সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেলেন তারা। দুই পক্ষের হাতাহাতি শেষ পর্যন্ত মারামারিতে রূপ নিলো। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হয়।

রবিবার দুপুরে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের উদ্দেশ্যে লং মার্চ করার কথা সাকিব ভক্তরা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন। আজ দুপুর দুইটার দিকে স্টেডিয়ামের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন তারা। সংখ্যায় তারা খুব বেশি ছিলেন না। শখানেক লোক মিরপুর স্টেডিয়ামের সামনে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। তারা দীর্ঘক্ষণ ধরে মিছিল করতে থাকেন ও দুই নম্বর গেটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও পুলিশ তাদের যেতে দেয়নি। দুই নম্বর গেট থেকে প্রশিকার মোড় পর্যন্ত ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছিলেন আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা।

সহিংসতায় রূপ নেয় বিক্ষোভ

সাকিবকে দেশে ফিরিয়ে শেষ টেস্ট খেলার সুযোগ করে দেওয়ার দাবিতে অবস্থান নেন সাকিব ভক্তরা। তারা স্লোগান দিতে থাকেন, ‘তুমি কে, আমি কে, সাকিবিয়ান, সাকিবিয়ান।’ ‘কানপুর না মিরপুর, মিরপুর, মিরপুর।’ 

তাদের দাবি, সাকিব দেশের হয়ে অনেক সম্মান বয়ে এনেছেন। তাকে তাই দেশের মাঠ থেকে বিদায় নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। সাকিবের এক ভক্ত বলেছেন, ‘সাকিবকে এই টেস্ট খেলতে দিতে হবে। যে কোনও মূল্যে আজই সাকিবকে দেশে ফিরিয়ে এনে ঢাকা টেস্টে মাঠে নামার সুযোগ করে দিতে হবে। আমাদের দাবি এটাই।’

সাকিব ভক্তদের আন্দোলন চলাকালে তার বিরোধীরাও স্লোগান দিতে থাকেন। তারা প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্টেডিয়ামে থাকা সেনাবাহিনী এবং পুলিশ স্টেডিয়ামে অবস্থান করছিল। ফলে শখানেক সাকিব ভক্তের জন্য স্টেডিয়ামের প্রধান ফটকের সামনে যাওয়ার কোনও সুযোগ ছিল না। এই সময় হুট করেই অবস্থান কর্মসূচি চলার এক পর্যায়ে বাঁশ ও লাঠি নিয়ে কয়েকজন লোক এসে তাদের ওপর হামলা চালায়। হামলার পর তারা স্টেডিয়ামের দুই নম্বর মোড়ের দিকে যেতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের প্রতিহত করে বিপরীত দিক দিয়ে ধাওয়া দেয়। তাদেরকে লাঠিপেটাও করা হয়। এতে করে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় সাকিব ভক্তদের। এক নারী আহতও হয়েছেন। 

একজনকে গ্রেফতার করা হয়
 
সাকিবের নারী ভক্ত মাহফুজা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলাম। আমাদের দাবি জানাচ্ছিলাম। অথচ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর উপস্থিতিতে হুট করে কয়েকজন এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। তারা হামলাকারীদের প্রতিহত না করে উল্টো আমাদেরকেও ধাওয়া দিয়েছে।’

দুই পক্ষের মারামারির এক পর্যায়ে সানি মিয়া নামের এক সাকিব ভক্ত সরকার বিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন। এমন অভিযোগে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। তবে সানির দাবি, তিনি সাকিবের জন্য এসেছিলেন, ‘আমি কেবল চেয়েছি সাকিব শেষ ম্যাচটি খেলুক। কিন্তু সাকিব বিরোধীরা আমাকে ধাওয়া দেয়। আমি দৌঁড়ে পালাতে চেষ্টা করি। তখন আমাকে ধরে নিয়ে এসেছে। আমি কোনও অন্যায় করিনি। বাংলাদেশকে যে ক্রিকেটার সম্মান এনে দিয়েছে, তার সম্মানজনক বিদায় দেখতে চাওয়া তো অপরাধ নয়।’

এদিকে সাকিব ভক্তরা ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর তার বিরোধীরা মিছিল শুরু করে। তারা সাকিবের বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন। তাদের একজন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সাকিবের মতো ক্রিকেটার আমাদের দরকার নাই। দেশে যখন মানুষ মরছিল, সাকিব তখন ঘুরে বেড়িয়ে আমাদের সঙ্গে মজা নিচ্ছিল। বাংলাদেশের মানুষের আবেগ নিয়ে সে খেলা করেছে। তাকে আর জাতীয় দলের জার্সিতে আমরা দেখতে চাই না।’

ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি। পুরো ঘটনার সময় দক্ষিণ আফ্রিকা দল মাঠের ভেতরে অনুশীলন করছিল। বেলা সাড়ে তিনটার কিছুক্ষণ পর অনুশীলন শেষ করে তারা মাঠ ছাড়েন। পুরো দলকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মাঠ ছাড়তে দেখা গেছে। এই সময় গাড়ি থেকে বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারকে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতে দেখা গেছে। যদিও স্টেডিয়ামের প্রধান ফটকের সামনে নিরাপত্তা বাহিনী ও কিছু গণমাধ্যম ছাড়া আর কেউ ছিল না।

দক্ষিণ আফ্রিকা অনুশীলন করে চলে যাওয়ার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢিলেঢালা হয়ে যায়। গেটের সামনে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা না থাকায় দুই পক্ষই অবস্থান নেয়। বিকাল সাড়ে চারটার পর থেকে দুই পক্ষই ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া করে স্টেডিয়ামের প্রধান ফটক দখলে রাখার চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ পর সেনাবাহিনী এসে তাদের হটিয়ে দিয়ে শৃঙ্খলা ফেরান।

প্রসঙ্গত, গত ভারত সফরে কানপুর টেস্টের আগে অবসরের ঘোষণা দেন সাকিব। তিনি জানান নিরাপত্তা দিলে শেষ টেস্টটা খেলতে চান দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মিরপুরে। বিসিবি সভাপতি শুরুতে নিরাপত্তার আশ্বাস না দিলেও পরে তাকে দেশে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেন। সাকিবকে রেখেই ঘোষিত হয় প্রথম টেস্টের দল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশের পথে রওয়ানাও দেন সাকিব। কিন্তু দুবাই আসার পর সরকারের পক্ষ থেকে তাকে দেশে ফিরতে নিষেধ করা হয়। এই কারণে সাকিব পরবর্তীতে আর দেশে ফেরেননি। সাকিবের এই না ফেরার দায়টা সরকারকেই দিচ্ছেন তার ভক্তরা।