বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) বরাবরই সমালোচিত একটি টুর্নামেন্ট। ২০১২ সালে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের এই টুর্নামেন্টটি শুরু হলেও এখন পর্যন্ত সমালোচনা এড়াতে পারেনি। প্রতি আসরেই কোনও না কোনও ইস্যু নিয়ে সমালোচিত হচ্ছে। এবারতো সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। গত কয়েক আসর ধরেই বিদেশি ক্রিকেটাররা হুটহাট করে আসছেন, এক-দুই ম্যাচ খেলে চলেও যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্রিকেটারদের জন্য যেমন মানিয়ে নেওয়া কঠিন, তেমন টুর্নামেন্টের জৌলুসও হারাচ্ছে। সাবেক অধিনায়ক ও রংপুর রাইডার্সের সহকারি কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল মনে করেন, হুটহাট বিদেশি ক্রিকেটার আনিয়ে খেলানো কখনই আদর্শিক নয়।
সোমবার এলিমিনেটর রাউন্ডে রংপুর রাইডার্স মুখোমুখি হয়েছিল খুলনা টাইগার্সের। ম্যাচটিতে তিন বিদেশি তারকা ক্রিকেটার টিম ডেভিড, জেমস ভিন্স ও আন্দ্রে রাসেলদের উড়িয়ে আনে রংপুর ফ্র্যাঞ্চাইজি। যদিও তারা কেউই প্রত্যাশা মেটাতে পারেননি। আগের রাতে ঢাকায় ফেরে সোমবার সকালে ম্যাচ খেলতে নামা কারও জন্যই সহজ হওয়ার কথা নয়। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল গত কয়েক আসর ধরেই এই ধরনের সুযোগ দিয়ে আসছে। ফলে বিসিবির দেওয়া এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দলগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বিদেশি ক্রিকেটারদের দলে ভেড়াচ্ছে। কিন্তু হুটহাট বিদেশি ক্রিকেটার আসার আরও একটি কারণ আছে। গত কয়েক বছর ধরে বিপিএল চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট হচ্ছে। এবার যেমন দুবাইয়ে আইএল টি-টোয়েন্টি এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় এসএ টি-টোয়েন্টি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই দুটি টুর্নামেন্টের কারণে বিপিএলের দলগুলো কারও সঙ্গেই লম্বা সময়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হতে পারেনি। এই কারণেই মূলত শেষ দিকে এসেও বিদেশি ক্রিকেটারদের দলে ভেড়াতে হচ্ছে।
সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল মনে করেন, হুটহাট বিদেশি ক্রিকেটার এনে খেলানো মোটেও আদর্শ নয়, ‘ইংল্যান্ডে যেটা হয়, বিদেশি ক্রিকেটাররা লিগ পর্বে তিনটা ম্যাচ খেললে তারপর নকআউট পর্বে খেলার অনুমতি দেয়। আমাদের বিপিএলে এই ধরনের কোনও নিয়ম নেই। খেলার দিন সকালে নিয়ে এলেও খেলতে পারে। এটা তো অবশ্যই আদর্শ নয়।’
হুট করে এসে সাফল্য পাওয়াটা কঠিন। আজকের ম্যাচে রংপুরের বিদেশি ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। যদিও আশরাফুল মনে করেন, ‘রংপুর রাইডার্স ম্যানেজমেন্ট বড় তারকা ও কোয়ালিটি ক্রিকেটার আনার চেষ্টা করেছে। আমার মনে হয় না (মানিয়ে নেওয়া কঠিন)। তারা যেহেতু বিজনেস ক্লাসে এসেছে, ওই সমস্যাটা হওয়ার কথা না। আবহাওয়া ভিন্ন নয়। দুবাইয়ে তারা একইরকম আবহাওয়াতেই ছিল। হয়তো তারা রাতে খেলে এসেছে, এটা একটা (সমস্যা) হতে পারে। তবে তারা পেশাদার ক্রিকেটার। ওই জায়গা থেকে মনে হয় না অতটা সমস্যা ছিল।’
আশরাফুল আরও বলেছেন, ‘আমাদের কিন্তু গত বছর এই জিনিসটাই হয়েছিল। প্রচুর বিদেশি ক্রিকেটার তারা দুই ম্যাচ পরপর পরিবর্তন করেছে। এবার প্লেয়ার্স ড্রাফটে আমাদের পরিকল্পনা ছিল, যারা খেলবে তারা যেন সর্বোচ্চসংখ্যক ম্যাচ খেলতে পারে। খুশদিল শাহ, আকিফ জাভেদ, ইফতিখার আহমেদ কিন্তু সবগুলো ম্যাচ খেলেছে। মাঝপথে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ায় খুশদিলের চলে যেতে হয়েছে। আমাদের শুরু থেকে স্টিভেন টেলরও ছিল। তবে জিএসএলে যেভাবে খেলেছে এখানে সেটা পারেনি। সেই কারণেই ম্যানেজমেন্ট চেষ্টা করেছে বড় নামগুলো আনার। এটা তো অবশ্যই আদর্শ নয়। দলের সঙ্গে যদি অন্তত ২-৩ দিন না থাকে তাহলে তো দলের সদস্যদের চেনাও কঠিন হয়ে যায়।’
রংপুরের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার খুশদিল শাহ। দলের হয়ে নয়টি ম্যাচ খেলেছেন। পাকিস্তানে আসন্ন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির প্রস্তুতির কারণে তাকে চলে যেতে হয়েছে। টানা আট ম্যাচ জিতে খুশদিল ছিলেন দলটির প্রাণভোমরা। খুশদিল চলে যাওয়ার আগে একটি ম্যাচ হারলেও পরবর্তীতে আর জয়ের মুখ দেখেনি রংপুর। এমনকি গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি লিগে রংপুরকে চ্যাম্পিয়ন করার পেছনেও ভূমিকা ছিল খুশদিলের। তারা না থাকার প্রভাব দেখছেন রংপুরের সহকারি কোচ আশরাফুল, ‘আমার মনে হয়, খুশদিল শাহর চলে যাওয়াটা আমাদের জন্য বড় একটা সেটব্যাক। গায়ানা থেকে শুরু করে... আমাদের মাস্ট উইন ম্যাচের উইকেট খুব কঠিন। সেদিন সে ৩০ বলে ফিফটি করেছিল, ৫টা ছক্কা মেরেছিল। আমরা ১১৩ বা ১১৭ রান করেছিলাম। ওই ম্যাচ থেকে আসলে... খুশদিল শাহ যাওয়ার পর ওই জায়গাটা আমাদের কোনো ক্রিকেটার নিতে পারেনি। লোকাল ক্রিকেটাররা শুরুতে যেমন খেলেছিল, শেষের পাঁচ ম্যাচে সেভাবে ভালো খেলতে পারেনি।’
খুশদিলকে নিয়ে সাবেক এই অধিনায়ক আরও বলেছেন, ‘আমাদের জিএসএল জেতার পেছনে কারণ কিন্তু খুশদিলের আগ্রাসী ব্যাটিং। আমরা ১১৩ রান করেছিলাম, তার মধ্যে সে ফিফটি করেছিল ৩০ বলে। এরকম একজন ক্রিকেটার হওয়া উচিত ছিল। আমরা আশা করেছিলাম শেখ মেহেদী বা সাইফ হাসান বা কেউ হয়তো এরকম একটা আগ্রাসী ইনিংস খেলবে। ওই জিনিসটাই আমরা পাইনি।’