টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়ার ঘটনায় বড় প্রভাব পড়তে পারে ভারতের ওপর! ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের চেষ্টা করছে তারা। কিন্তু সেই পথে বাধা হতে পারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক এই ঘটনা। যার মূল কারণ হিসেবে খেলাধুলায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিকেই সামনে আনা হচ্ছে। ব্যাপারটা নিয়ে উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি)। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে জানুয়ারির শুরুতে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল তথা আইসিসি বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের বদলে অন্যতম আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত তাদের বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে নেয় আইসিসি।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) কলকাতা নাইট রাইডার্স বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে থেকে বাদ দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কলকাতা নাইট রাইডার্স দাবি করেছে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)–এর নির্দেশনা অনুযায়ীই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তার পর বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তানও টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের কথা বিবেচনা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। শিগগিরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
আইসিসি তাদের সিদ্ধান্তে অটল ছিল কারণ তারা চেয়েছিল বাংলাদেশ ভারতের মাটিতেই খেলুক। তবে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে বিসিসিআইয়ের প্রভাব ছিল। বোর্ডটি ভেন্যু পরিবর্তনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
আইসিসি নিজেদের স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দাবি করলেও অতীতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বিসিসিআইকে সুবিধা দেওয়ার নজির রয়েছে। এর মধ্যে আর্থিক ও সম্প্রচার–সংক্রান্ত কারণে ২০২৪ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গায়ানায় ভারতের জন্য নিশ্চিত সেমিফাইনাল ভেন্যু বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছে দ্য গার্ডিয়ান।
আইসিসির ভেতরে বিসিসিআইয়ের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভারত সরকারের সঙ্গে বোর্ডটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আইসিসির বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ আগে বিসিসিআইয়ের সচিব ছিলেন। তার বাবা অমিত শাহ আবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়া আইসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জোগ গুপ্তা আগে জিওস্টার নামের একটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে স্পোর্ট অ্যান্ড লাইভ এক্সপিরিয়েন্স বিভাগের প্রধান ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি আবার ভারতে সব আইসিসি ইভেন্টের একচেটিয়া সম্প্রচার স্বত্বের মালিক।
এই রাজনৈতিক বিরোধ ভারতের জন্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশটি বড় ক্রীড়া আয়োজনের দৌড়ে এগিয়ে যেতে চাইছে। সম্প্রতি দিল্লিতে ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের স্বত্ব পেয়েছে তারা। এখন তাদের লক্ষ্য ২০৩৬ অলিম্পিক- যা আয়োজনের জন্য আহমেদাবাদকে প্রস্তাব করা হয়েছে। এই দৌড়ে ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কাতার।
খেলাধুলায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আইওসি বরাবরই কঠোর অবস্থানে রয়েছে। আইওসির এক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, অন্য দেশগুলোর বয়কটের সম্ভাবনা থাকলে ভারতের অলিম্পিক আয়োজনের সুযোগ প্রায় শেষ হয়ে যাবে।
অলিম্পিক চার্টারে বলা হয়েছে, ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে হবে এবং যে কোনও ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে। চার্টারের ৫০.২ ধারা অনুযায়ী অলিম্পিক চলাকালে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
গত বছরের অক্টোবরে আইওসির এই কঠোর অবস্থানের একটি উদাহরণ দেখা যায়। জাকার্তায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ইসরায়েলি দলের জন্য ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইন্দোনেশিয়াকে ভবিষ্যতের অলিম্পিক আয়োজন-সংক্রান্ত সব কিছু থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর আগে ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের দৌড়ে ছিল দেশটি।
২০৩৬ অলিম্পিকের পথে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতিও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দুই বছর পর লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ক্রিকেট ফিরছে এবং ২০৩২ ব্রিসবেন অলিম্পিকেও খেলাটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আইওসি ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ভারতীয় বাজারকে আকৃষ্ট করতে চাইলেও নিজেদের নীতিতে কোনও ছাড় দেবে না বলেই বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ভারত গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোয় এবারের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজও বন্ধ।
আইওসির ওই সূত্র আরও জানিয়েছেন, অলিম্পিক আয়োজনের জন্য ভারতকে বিশ্বাসযোগ্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে হবে।