ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার স্যার গ্যারি সোবার্স আর নেই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৭ জুলাই ২০২৬, ২২:২৯আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ২২:২৯

ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার এবং কিংবদন্তি স্যার গ্যারি সোবার্স মারা গেছেন। শুক্রবার (১৭ জুলাই) বার্বাডোজে নিজের বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

অনেকের মতেই ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান ও সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয় সোবার্সকে। টেস্ট ব্যাটার হিসেবে অনন্য সোবার্স বাঁহাতি পেস বোলিংয়ের পাশাপাশি অর্থোডক্স এবং রিস্ট স্পিন উভয় ধরনের বোলিংয়েই পারদর্শী ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন এক অসাধারণ ফিল্ডার এবং ক্লোজ ইন ক্যাচার। তার এই বহুমুখী গুণের কারণেই সর্বকালের আরেক সেরা ক্রিকেটার স্যার ডোনাল্ড ব্রাডম্যান তাকে ফাইভ-ইন-ওয়ান ক্রিকেটার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে ৯৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন সোবার্স। ৫৭.৭৮ গড়ে তিনি রান করেছেন ৮,০৩২ এবং ৩৪.০৩ গড়ে নিয়েছেন ২৩৫টি উইকেট। বিশ্ব ক্রিকেটে তার এই অনন্য অবদানকে সম্মান জানিয়ে পুরুষদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সব সংস্করণে বছরের সেরা পারফরমারকে আইসিসির যে প্রধান বার্ষিক পুরস্কার দেওয়া হয়, তার নামকরণ করা হয়েছে ‘র গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি।

সোবার্সের প্রয়াণে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে লিখেছে, একটি মহান ইনিংসের সমাপ্তি ঘটলো। আমাদের হৃদয়ে এখন এবং চিরকাল থাকবেন স্যার গারফিল্ড সোবার্স। তবে বিবৃতিতে তার মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

ষোলো বছর বয়সে শুরু, অতঃপর বিশ্ব রেকর্ড

১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে সফরকারী ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় সোবার্সের। সেই ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট নিয়ে তিনি দলের প্রতিপক্ষকে ফলো-অন করতে বাধ্য করেছিলেন। এর এক বছর পর জ্যামাইকাতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তার টেস্ট অভিষেক হয়। ৯ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নেমে তিনি ১৪ ও ২৬ রান করেন এবং ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে ৭৫ রানে ৪ উইকেট নেন।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের টেস্টগুলো তিনি মূলত বোলার হিসেবে খেলেছিলেন। তবে ২৩ বছর বয়সে তিনি তার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পান এবং একই সঙ্গে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সাবিনা পার্কে ১৯৫৮ সালে ৩৬৫ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে লেন হাটনের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত টেস্ট স্কোরের বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে দেন। এই রেকর্ডটি ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল, যা পরবর্তীতে ব্রায়ান লারা ভেঙে দেন। সোবার্স নিজে মাঠে উপস্থিত থেকে লারার সেই কীর্তি প্রত্যক্ষ ও উদযাপন করেছিলেন।

সেই রেকর্ড গড়া ইনিংসের এক দশক পর, নটিংহামশায়ারের হয়ে খেলার সময় গ্ল্যামারগনের ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে ছয়টি ছক্কা মেরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম এই কীর্তি গড়েন সোবার্স। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বার্বাডোজ, নটিংহামশায়ার এবং সাউথ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তার প্রথম শ্রেণির দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ৩৮৩টি ম্যাচ খেলে ৫৪.৮৭ গড়ে ২৮,৩১৪ রান করেছেন এবং ২৭.৭৪ গড়ে ১,০৪৩টি উইকেট নিয়েছেন।

সোবার্স ৯৫টি লিস্ট এ ম্যাচ খেললেও ওডিআই বা ওয়ানডে ক্রিকেটের সূচনালগ্নে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষের দিকে চলে এসেছিল। ফলে তিনি মাত্র একটি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছিলেন, ১৯৭৩ সালে হেডিংলিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ক্রিকেটে অনন্য সেবার জন্য ১৯৭৫ সালে তাকে নাইটহুড উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এরপর ২০০০ সালে উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাক তাকে ব্রাডম্যান, স্যার জ্যাক হবস, স্যার ভিভ রিচার্ডস এবং শেন ওয়ার্নের পাশাপাশি ‘শতাব্দীর সেরা পাঁচ ক্রিকেটারের’ একজন হিসেবে নির্বাচিত করে।

ছয় আঙুল নিয়ে জন্ম ও ক্যারিবীয়দের স্বপ্নসারথি

১৯৩৬ সালে বার্বাডোজে জন্ম নেওয়া সোবার্স ছিলেন মা-বাবার ছয় সন্তানের মধ্যে পঞ্চম। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার বণিক-নাবিক বাবা মারা যাওয়ার পর মূলত তার মায়ের কাছেই তিনি বড় হন। জন্মের সময় দুই হাতেই তার ছয়টি করে আঙুল ছিল, তবে শৈশবেই অতিরিক্ত আঙুল দুটি অস্ত্রোপচার করে অপসারণ করা হয়। তিনি বাস্কেটবল, ফুটবল এবং গলফসহ সব ধরনের খেলাধুলাতেই পারদর্শী ছিলেন।

ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ড. কিশোর শ্যালো সোবার্সকে ‘পৃথিবীর দেখা সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সোবার্সের পরিবার, বার্বাডোজ সরকার ও জনগণ এবং বিশ্বজুড়ে তার মৃত্যুতে শোকাহত সকলের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

কিশোর শ্যালো আরও বলেন, ‘একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন একজন ব্যক্তির জীবন প্রজন্মের পর প্রজন্মের আশা, স্বপ্ন এবং পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়। আজ ক্যারিবীয় অঞ্চল তেমনই একজন মানুষের প্রয়াণে শোকাহত... ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিংয়ে তার দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। তবে তার আসল তাৎপর্য বাউন্ডারি লাইনের সীমানা ছাড়িয়ে আরও উঁচুতে পৌঁছেছিল।’

তিনি আরও বলেন, তিনি এমন এক সময়ে ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে উঠে এসেছিলেন যখন আমাদের অঞ্চলটি বিশ্বমঞ্চে নিজের কণ্ঠস্বর ও অবস্থান জানান দিচ্ছিলো। তার এই শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে তিনি আমাদের দ্বীপপুঞ্জের এবং প্রবাসী লাখ লাখ মানুষের মনে নতুন করে বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিলেন যে যেকোনও কিছুই সম্ভব। তিনি দেখিয়েছেন যে শ্রেষ্ঠত্ব কোনও দেশের আকার, দ্বীপের ভূগোল বা আমাদের শুরুর পরিস্থিতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। স্যার গারফিল্ড সোবার্স কেবল একজন ক্রীড়া আইকন ছিলেন না, তিনি ক্যারিবীয় শ্রেষ্ঠত্ব, স্থিতিস্থাপকতা এবং সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তার অর্জন বার্বাডোজের জন্য গর্ব, ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য অনুপ্রেরণা এবং ক্রিকেট বিশ্বের প্রতিটি কোণ থেকে প্রশংসা কুড়িয়ে এনেছিলো।

সূত্র: ক্রিকইনফো

/এএ/
সম্পর্কিত
টি টোয়েন্টিতে ১৫ হাজার রানের ক্লাবে জস বাটলার
গাঙ্গুলীর বায়োপিকের শুটিংয়ে পিচের ক্ষতি, লেস্টারশায়ারের ২৭ পয়েন্ট কাটা!
৩০ বলে সেঞ্চুরি, অভিষেকের ইতিহাস
সর্বশেষ খবর
নিয়ন্ত্রিত এআই, নাকি নিয়ন্ত্রণহীন এআই 
নিয়ন্ত্রিত এআই, নাকি নিয়ন্ত্রণহীন এআই 
‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কেউ কেউ ফুটবলের বাস্তবতা বোঝেন না’
‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কেউ কেউ ফুটবলের বাস্তবতা বোঝেন না’
বহিষ্কারের ভয় নাকি অন্য কিছু: সেই শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার নেপথ্যে কি?
বহিষ্কারের ভয় নাকি অন্য কিছু: সেই শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার নেপথ্যে কি?
সালমান শাহকে যেভাবে খুঁজে পেলেন নির্মাতা সোহানুর রহমান
সালমান শাহকে যেভাবে খুঁজে পেলেন নির্মাতা সোহানুর রহমান
সর্বাধিক পঠিত
পাকিস্তানে জুমার নামাজের সময় বিস্ফোরণ, প্রাণ গেলো ১৬ জনের
পাকিস্তানে জুমার নামাজের সময় বিস্ফোরণ, প্রাণ গেলো ১৬ জনের
তিন নামকরা হোটেলকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা
তিন নামকরা হোটেলকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা
৩ দফা বদলি, অবশেষে উপজেলা ছাড়লেন সেই এসিল্যান্ড
৩ দফা বদলি, অবশেষে উপজেলা ছাড়লেন সেই এসিল্যান্ড
জেলায় জেলায় বিয়ে করা পুলিশ কর্মকর্তাকে যেভাবে ধরিয়ে দিলেন ষষ্ঠ স্ত্রী
জেলায় জেলায় বিয়ে করা পুলিশ কর্মকর্তাকে যেভাবে ধরিয়ে দিলেন ষষ্ঠ স্ত্রী
লংমার্চের সভামঞ্চে একদিনের জন্য বসেছে বিদ্যুতের মিটার, এক এলাকাতেই ৫০০ পুলিশ
লংমার্চের সভামঞ্চে একদিনের জন্য বসেছে বিদ্যুতের মিটার, এক এলাকাতেই ৫০০ পুলিশ