প্রিমিয়ার লিগে প্রত্যাশা পূরণ করবেন জুবায়ের

জুবায়ের হোসেন লিখনগত বছর জুনে ভারতের বিপক্ষে ফতুল্লা টেস্টে বিরাট কোহলিকে যেভাবে নাস্তানাবুদ করেছিলেন জুবায়ের হোসেন লিখন, তা বহুদিন মনে থাকবে ক্রিকেটপ্রেমীদের। ওই এক ওভারে প্রত্যেকটি বলেই কোহলিকে বিভ্রান্ত করেছিলেন লেগ স্পিনার লিখন। শেষ পর্যন্ত লিখনের গুগলিতে বোকা বনে বোল্ড হয়েছিলেন কোহলি।

আজও জুবায়েরেরে স্মৃতিতে ঘুরে-ফিরে আসে ম্যাচটি। সোমবার বিকেলে মুঠোফোনে স্মৃতি হাতড়ে চলে গেলেন প্রায় দশ মাস আগের রাত্রিতে। বাংলা ট্রিবিউনকে জানালেন, ‘ওই ম্যাচের আগের রাতে আমি খুব কাছের এক বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম, যদি কোহলিকে আউট করতে পারি এটা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম পাওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত ওকে আউট করতে পেরেছিলাম। সত্যি কথা কি ওই মুহূর্তটা আমার কাছে সারাজীবন অনন্য হয়ে থাকবে। এখনও বিষয়টি চিন্তা করলে অনেক বেশি অনুপ্রেরণা পাই।’

বাংলাদেশ-ভারত ফতুল্লা টেস্টের পর অবশ্য আরও কিছু টেস্ট ও ওয়ানডে খেলেছেন জাতীয় দলের জার্সিতে। কিন্তু তাও প্রায় ৯ মাস আগে। অবশ্য গত বছর নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছিলেন। তবে বিপিএলের তৃতীয় আসরে খেলা হয়নি জুবায়েরের। কেননা কোনও ফ্র্যাঞ্চাইজি বাংলাদেশের এই লেগ স্পিনারকে দলে নেয়নি।
এমনকি আগের আসরের প্রিমিয়ার লিগে আবাহনীর হয়ে নিয়মিত মাঠেও নামতে পারনেনি লিখন। লেগ স্পিনাররা ‘বেশি রান দেয়’ এমন তকমা লাগিয়ে কোচ সারোয়ার ইমরান মাঠে নামানো থেকে বিরত রাখেন উঠতি এই ক্রিকেট তারকাকে। তবে এবার প্রিমিয়ার লিগে নিজেকে বদলে, দলের প্রত্যাশা পূরণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ জুবায়ের।

নিয়মিত সুযোগ না পাওয়া নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবছেন না জুবায়ের। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসলে বিষয়টি তেমন নয়। আগেরবার আবাহনীতে আমিসহ তিনজন স্পিনার ছিলাম। বাকি দুইজন ভালো করছিলো বলে আমাকে নামানো হয়নি। এবার হয়তো সুযোগ আসতে পারে। আমি সুযোগে কাজে লাগানোর অপেক্ষায় আছি।’

সাম্প্রতিক সময়ে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলারই সুযোগ পাচ্ছেন না। বিষয়টি হতাশাজনক মানছেন জুবায়ের হোসেন লিখন। তিনি বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, একজন খেলোয়াড়ের জন্য ম্যাচ খেলাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন খেলোয়াড়ের উন্নতি হচ্ছে নাকি অবনতি হচ্ছে সবকিছুই ম্যাচে ফুটে উঠে। আগের ম্যাচগুলো খেলতে পারলে আমার জন্য ভালো হতো। তারপরও আমি কোনও সমস্যা দেখছি না। সামনে অনেক খেলা আছে; সেগুলোতে খেলার সুযোগ পেলে নিজেরে উন্নতিটা ধরতে পারবো।’.

তিনি আরও যোগ করেন, ‘যদি এবার প্রিমিয়ার লিগের সবগুলো ম্যাচ খেলার সুযোগ পাই চেষ্টা করবো ধারাবাহিকতা বজায় রাখার। সামনে বাংলাদেশ দলের প্রচুর টেস্ট ম্যাচ রয়েছে। চেষ্টা করবো এখানে ভালো করে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নেওয়ার। ভবিষ্যতে জাতীয় দলে সুযোগ পেলে, যাতে কাজে লাগাতে পারি।’

বাংলাদেশের ক্রিকেটে জুবায়েরকে দিয়ে নতুন যুগের সূচনা হতে পারতো। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটেই ঠিকমতো সুযোগ না পেয়ে নিজেকে পরিণত করত ব্যর্থ হয়েছেন জুবায়ের। অথচ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের ইশ সোধী, দক্ষিণ আফ্রিকার ইমরান তাহির, আফগানিস্তানের রশিদ খানরা বেজায় সাফল্য পেয়েছেন ভারতের উইকেটে। সেখানে বাংলাদেশের একমাত্র লেগ স্পিনার জুবায়ের হোসেন দলে সুযোগই পাননি! বাংলাদেশের ক্রিকেটে এর আগে টেস্টে একাধিক লেগ স্পিনার বোলিং করেছেন। তবে মোহাম্মদ আশরাফুল, অলক কাপালি কিংবা রকিবুল হাসানদের কেউই নিয়মিত বোলার ছিলেন না।

জুবায়ের অবশ্য এগুলো নিয়ে আফসোস করছেন না। তার বিশ্বাস ভালো খেলতে পারেননি বলেই দলে সুযোগ আসেনি। তিনি বলেন, ‘সব ফরম্যাটেই লেগ স্পিনাররা খেলছে। আমি আশা করি ভবিষ্যতে সব ফরম্যাটেই খেলবো। যখনই সুযোগ আসবে চেষ্টা করবো, সুযোগটা কাজে লাগানোর। আমাদের এই মুহূর্তে কিছুটা স্পিনারদের অভাব রয়েছে। আমি চেষ্টা করবো এই অভাবটা পূরণ করার।’

জুবায়ের হোসেন লিখনলেগ স্পিনাররা যখন ভালো করছে, সেটা আপনি টিভিতে দখছেন। একজন লেগ স্পিনার হিসেবে আপনার আক্ষেপ লাগে কিনা; জানতে চাইলে জুবায়ের বলেন, ‘আক্ষেপ লাগার কোনও কারণ নেই। আমি যদি ঠিকমতো পারফরম্যান্স করতে পারতাম, তারপর যদি আমি দলে সুযোগ না পেতাম তাহলে খারাপ লাগতো।'

মাথার ওপর কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের ছাতা পেয়েও পায়ের নিচে মাটি হারিয়ে ফেলছিলেন তিনি। বেশ কয়কে মাস ধরে ক্রিকেটের বাইরে। ২২ এপ্রিল শুরু হচ্ছে প্রিমিয়ার লিগ। আপাতত সেই ভাবনায় দিন গুনছেন চলতি আসরে আবাহনীতে সুযোগ পাওয়া এই লেগ স্পিনার।

এ প্রসঙ্গে জুবায়ের বলেন, ‘অনেকদিন ধরে বসে আছি। যেখানে আমার সমস্যা ছিলো সেগুলো নিয়ে প্রচুর কাজ করেছি। আমার বোলিং অ্যাকুরিসি ভালো হয়েছে, নাকি আগের মতো আছে সেটা দেখার জন্য আমাকে ম্যাচ খেলতে হবে। আশা করি প্রিমিয়ার লিগে এগুলো সব ঠিকঠাক মতো হবে।’

একজন ক্রিকেটারকে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন সুযোগের। কিন্তু গত বছর ঘরোয়া ক্রিকেটেই কোচরা সেটাই দিচ্ছিলেন না জুবায়েরকে। নেটেও ওভার প্রতি তিন-চারটি বাজে বল দেয়, বোলিংয়ের ‘অ্যাকুরেসি’ কম এমন সব কথা শুনে আসতে হয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ থেকে। তবে জুবায়ের এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। এবারের প্রিমিয়ার লিগে নিজের উন্নতিটা দেখিয়ে দিতে চান তিনি। সেটা হলেই কেবল জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত সুযোগ পাওয়ার স্বপ্নটা সত্যি হবে তার।

/এমআর/