বাংলাদেশি ফ্যানদের দখলে সানরাইজার্সের সাইবার ঘাঁটি!

সানরাইজার্স ও মুস্তাফিজআইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ যখন বাংলাদেশের ফাস্ট বোলিং তারকা মুস্তাফিজুর রহমানকে নিলামে কিনেছিল, কর্তৃপক্ষ বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি মুস্তাফিজের লক্ষ লক্ষ স্বদেশি ফ্যান সদলবলে এসে তাদের ফেসবুক পেজটাকেও দখল করে নেবেন! কিন্তু মূলত তেলুগু ভাষাভাষী সানরাইজার্স ভক্তদের ফেসবুক জটলায় এখন শুধু বাংলার ছড়াছড়ি—মুস্তাফিজের প্রশস্তি এবং তার সঙ্গে বাঙালিসুলভ তুমুল তর্কবিতর্কও!
দলের বাকি সমর্থকদের অন্ধকারে রেখে যার প্রায় পুরোটাই বাংলা ভাষায় লেখা হচ্ছে। সোজা কথায়—আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে মাঠে নামার চব্বিশ ঘণ্টা আগে সানরাইজার্সকে এখন হাইজ্যাক করে নিয়েছেন এই বাংলাদেশি মুস্তাফিজ ভক্তরা!    
কত নাম করবেন? ইব্রাহিম মাহমুদ মনির, আলমিরাজ আনিক, মহম্মদ মাসুদ আহমেদ, আমরাফুল ক্যালওয়ে, ইমরুল কায়েস, মোহাম্মদ জাহেদ নাসের, স্বপন, ফার্নান রাকিব, রাফিউন ইসলাম শুভ্র—এমন আরও হাজার হাজার বাংলাদেশি গত কয়েকদিনে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের পেজ ফলো করা শুরু করেছেন। দলের প্রতিটি মুভমেন্ট যখনই ফেসবুকে আপলোড করা হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে তারা বইয়ে দিচ্ছেন কমেন্টের বন্যা। আর বলাই বাহুল্য, সে সব মন্তব্যের কেন্দ্রে আছেন এক ও অদ্বিতীয় মুস্তাফিজুর রহমান। ‘মুস্তাফিজই আসল হিরো’, ‘হাসতে হাসতে ও দলকে চ্যাম্পিয়ন করে দেবে’ —এই জাতীয় ভবিষ্যদ্বাণীতে ভরে যাচ্ছে দলের ফেসবুক পেজ।

মুস্তাফিজের কাছ থেকে দলের কে কে বাংলা শিখছেন, সে খবরও আপনি পেয়ে যাবেন ফেসবুকের এই বাংলাদেশি ফ্যানদের কাছে থেকে। সব দেখেশুনে সানরাইজার্সের এক ভারতীয় ভক্ত বিজয় সাগর লিখেছেন, ‘হুমম, মনে হচ্ছে টিমে এগারোজন খেলবেন না—বরং আমাদের একটাই প্লেয়ার আছে, আর তার নাম মুস্তাফিজুর রহমান!’   

তবে শুধুই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা নয়, কোনও কোনও বাংলাদেশি ক্রিকেট অনুরাগী আবার মনে করছেন, সানরাইজার্সের পেজে মুস্তাফিজকে নিয়ে সত্যিই বাড়াবাড়ি করা হয়ে যাচ্ছে। রাসেদুল হাসান রিয়াদ, জহির রায়হান জিকো, কুদ্দুস আলির মতো অনেকেই আবার এই দলে পড়েন।  যারা মনে করেন এত আদিখ্যেতার কোনও দরকারই নেই, এতে খামোখা বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা লজ্জায় পড়ছেন। কুদ্দুস আলি তো এমন কথাও লিখেছেন, ‘কই আইপিএলে তো ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড বা ইংল্যান্ডের আরও কত বেশি প্লেয়ার কত দিন ধরে খেলছেন। তাদের দেশের লোকদের তো কখনও তা নিয়ে এরকম হইচই করতে দেখি না!’

আরও পড়তে পারেন:      পাঞ্জাবকে হারিয়ে দারুণ শুরু গুজরাটের

 

মঙ্গলবার রাতে চেন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে সানরাইজার্সের প্রথম ম্যাচ আরসিবি-র বিরুদ্ধে, যে মাঠে মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ভারতের কাছে অবিশ্বাস্যভাবে হেরেছিল বাংলাদেশ দল, শেষ বলে দৌড়ে রান শেষ করতে পারেননি মুস্তাফিজুর। সেই ‘অপয়া’ মাঠে তিনি এখনও সানরাইজার্সের প্রথম একাদশে থাকবেন কি না নিশ্চিত নয়। সম্ভবত নিউজিল্যান্ডের ট্রেন্ট বোল্ট বা বাংলাদেশের মুস্তাফিজের মধ্যে কোনও একজনকে খেলানো হবে।

তবে মুস্তাফিজ যদি দলের প্রথম এগারোতে শেষ পর্যন্ত না আসেন, দলের ফেসবুক পেজে যে তার ভক্তরা যে ফাটাফাটি করে ফেলবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একেই কেকেআর তাদের প্রথম ম্যাচে সাকিব আল হাসানকে খেলায়নি বলে বাংলাদেশি ক্রিকেট অনুরাগীরা রেগে আছেন, মুস্তাফিজকেও কোনও কারণে ডাগ-আউটে বসতে হলে নির্ঘাত তুলকালাম বাঁধবে।

গোটা বিষয়টা অবশ্য এখনও পর্যন্ত দারুণ উপভোগই করছে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ কর্তৃপক্ষ। টিম ম্যানেজমেন্টের একজন উচ্চ পদস্থ কর্তা নাম প্রকাশ না-করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন, ‘আমরা বুঝতেই পারিনি মুস্তাফিজের সঙ্গে সঙ্গে এত হাজার হাজার ভক্তও আমরা বিনি পয়সায় পেয়ে যাব। বেশির ভাগ বাংলায় লেখা বলে আমি সব কমেন্ট বুঝতে পারছি না। তবে এটুকু আন্দাজ করতে পারছি, এই ভক্তদের আবেগ আর প্যাশনটা খুব বেশি, আর মেজাজটাও যে খুব নরমসরম নয়, সেটাও বোঝা যাচ্ছে। ফলে আমাদের এখন তাদের মন বুঝে, একটু সামলে চলতে হবে।’

তবে এটাও ঠিক, সারা দুনিয়াতেই খেলাধুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যখনই কোনও ক্লাব বিদেশি তারকাদের সই করায়, সেই দেশে ওই ক্লাবের জনপ্রিয়তা হু হু করে বেড়ে যায়। এটা ক্রিকেটের চেয়েও ফুটবলে আরও বেশি করে সত্যি। ইংলিশ প্রিমিয়ারলীগে অচেনা ক্লাব লেস্টার সিটিকে শীর্ষে নিয়ে যেতে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন আলজিরীয় তারকা রিয়াদ মাহরেজ, তার পর থেকেই আলজিরিয়াতে লেস্টার সিটির বিরাট একঝাঁক ভক্ত তৈরি হয়ে গেছে। কিংবা জাপানের শিনজি কাগাওয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক জি সুং যখনই ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে খেলেছেন – তখনই ওই দুই দেশে ম্যাঞ্চেস্টার শিবিরে নাম লিখিয়েছেন দলে দলে ভক্ত, রাত জেগে ইউনাইটেডের খেলা দেখতে বসেছেন জাপানি বা কোরিয়ানরা!


আরও পড়তে পারেন: ফিকরুর নৈপুণ্যে শেখ রাসেলের টানা তৃতীয় জয়

সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদককে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বাংলাদেশে তাদের হঠাৎ-করে-পাওয়া এই জনপ্রিয়তাকে ব্যবসায়িকভাবে কিভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটাও তাদের মাথায় আছে। এই মুহূর্তে দলের মার্চেন্ডাইজ শুধু  হায়দ্রাবাদে বা ভারতের মধ্যে অনলাইনেই কিনতে পাওয়া যায়—কিন্তু দিনকয়েকের মধ্যেই ঢাকায় বসেও হয়তো কিনতে পারা যাবে হায়দ্রাবাদ দলের উজ্জ্বল ও ঝলমলে কমলা জার্সি!

‘‘আমাদের ‘অরেঞ্জ আর্মি’ যে এভাবে মুস্তাফিজের সেনায় ভরে যাবে, তা আর আগে কে জানত? নইলে তো অনেক আগেই ঢাকায় আমরা জার্সি পাঠিয়ে রাখতাম!’’ হাসতে হাসতে বলছিলেন সানরাইজার্স দলের ওই প্রভাবশালী কর্মকর্তা!    

/এমএনএইচ/