টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল: বাংলাদেশের সামনে কত কঠিন সমীকরণ?

চলতি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে এখনও বাকি ২৭ সিরিজের ১৫টি। তবে আগামী কয়েক মাসে টেস্ট ক্রিকেটই হয়ে উঠতে যাচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেটের মূল আকর্ষণ। কারণ প্রতিটি সিরিজের ফল সরাসরি প্রভাব ফেলবে ২০২৭ সালের ৯ থেকে ১৩ জুন দ্য ওভালে অনুষ্ঠিতব্য ফাইনালের লড়াইয়ে। 

গত দুই চক্রের হিসাব বলছে, ফাইনালে জায়গা পেতে সাধারণত ৬৫ শতাংশের বেশি পয়েন্ট প্রয়োজন হয়েছে। চার ফাইনালিস্টের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ভারত। যারা ২০২৩ সালে ৫৮.৮ শতাংশ পয়েন্ট নিয়েও ফাইনালে উঠেছিল। ২০২৫ সালে অবশ্য দুই ফাইনালিস্টই ৬৭ শতাংশের বেশি পয়েন্ট নিয়ে শেষ করেছিল।

আর কিছু দিন পর বাংলাদেশও অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ খেলতে নামবে। তার আগে নেওয়া যাক, চলতি চক্রে কোন দল কোথায় আছে এবং ৬০ শতাংশ বা তার বেশি পয়েন্টে যেতে তাদের কী করতে হবে।

অস্ট্রেলিয়া

টেস্ট: ৮, জয়-হার-ড্র: ৭-১-০, পয়েন্ট শতাংশ: ৮৭.৫০

বাকি সিরিজ: বাংলাদেশ (ঘরে), দক্ষিণ আফ্রিকা (অ্যাওয়ে), নিউজিল্যান্ড (ঘরে), ভারত (অ্যাওয়ে)-মোট ১৪ টেস্ট।

চলতি চক্রে এখন পর্যন্ত ৯৬ পয়েন্টের মধ্যে মাত্র ১২ পয়েন্ট হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তবে নয় দলের মধ্যে তাদেরই সবচেয়ে বেশি ১৪টি টেস্ট বাকি।

এর মধ্যে আগামী বছরের শুরুতে ভারতে পাঁচ টেস্টের কঠিন সিরিজ রয়েছে। শেষ ১২ টেস্টে ভারতে অস্ট্রেলিয়া জিতেছে মাত্র দুটি। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘরের মাঠে ভারতের পারফরম্যান্সে বড় পতন এসেছে, তবু সেই সিরিজ শুরুর আগেই ফাইনালে নিজেদের জায়গা প্রায় নিশ্চিত করে রাখতে চাইবে অস্ট্রেলিয়া।

বিশেষ করে তার আগে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ছয়টি টেস্ট খেলবে তারা।

৬০ শতাংশে যেতে প্রয়োজন আরও ৭৫ পয়েন্ট, অর্থাৎ ছয় জয় ও একটি ড্র। আর বাকি ১৪ টেস্টে আট জয় ও ছয় হার হলে তাদের পয়েন্ট শতাংশ দাঁড়াবে ৬৮.১৮।

দক্ষিণ আফ্রিকা

টেস্ট: ৪, জয়-হার-ড্র: ৩-১-০, পয়েন্ট শতাংশ: ৭৫.০০

বাকি সিরিজ: অস্ট্রেলিয়া (ঘরে), বাংলাদেশ (ঘরে), ইংল্যান্ড (ঘরে), শ্রীলঙ্কা (অ্যাওয়ে)-মোট ১০ টেস্ট।

চলতি চক্রে দক্ষিণ আফ্রিকার তিনটি অ্যাওয়ে সিরিজই উপমহাদেশে- পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কায়। সেখানে এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত করেছে প্রোটিয়ারা। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ ১-১ ড্র করার পর ভারতকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়েছে তারা।

ফলে বাকি ১০ টেস্টের আটটিই ঘরের মাঠে খেলার সুবিধা পাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। যদিও এর মধ্যে তিনটি টেস্ট টেবিলের শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।

৬০ শতাংশে যেতে আরও ৬৫ পয়েন্ট প্রয়োজন। পাঁচ জয় ও দুটি ড্রতেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে তারা।

বাকি ১০ টেস্টে ছয় জয় ও চার হার হলে পয়েন্ট শতাংশ হবে ৬৪.২৮। আর সাত জয় ও তিন হার হলে তা দাঁড়াবে ৭১.৪৩, যা ফাইনালে ওঠার জন্য প্রায় নিশ্চিত অবস্থান তৈরি করবে।

নিউজিল্যান্ড

টেস্ট: ৬, জয়-হার-ড্র: ৪-১-১, পয়েন্ট শতাংশ: ৭২.২২
বাকি সিরিজ: ভারত (ঘরে), অস্ট্রেলিয়া (অ্যাওয়ে), শ্রীলঙ্কা (ঘরে), পাকিস্তান (অ্যাওয়ে)-মোট ১০ টেস্ট।

ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং অ্যাওয়ে সিরিজে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বর্তমানে বেশ ভালো অবস্থানে নিউজিল্যান্ড। তবে সামনে কঠিন পরীক্ষা- অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে চার টেস্টের সিরিজ।

বাকি ১২০ পয়েন্টের মধ্যে ৬০ শতাংশে যেতে প্রয়োজন ৬৪ পয়েন্ট। পাঁচ জয় ও একটি ড্রতে সেটি সম্ভব।

ঘরের মাঠে ভারত ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সব টেস্ট জিততে পারলে সেই পাঁচ জয়ের চারটিই পেয়ে যেতে পারে কিউইরা।

তবে শুধু ঘরের সাফল্য হয়তো ফাইনালের জন্য যথেষ্ট হবে না। ছয় জয় ও তিন হার হলে তাদের পয়েন্ট শতাংশ হবে ৬৪.৫৮। সাত জয় ও তিন হার হলে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৭০.৮৩।

বাংলাদেশ

টেস্ট: ৪, জয়-হার-ড্র: ২-১-১ , পয়েন্ট শতাংশ: ৫৮.৩৩

বাকি সিরিজ: অস্ট্রেলিয়া (অ্যাওয়ে), ওয়েস্ট ইন্ডিজ (ঘরে), দক্ষিণ আফ্রিকা (অ্যাওয়ে), ইংল্যান্ড (ঘরে)-মোট ৮ টেস্ট।

চলতি চক্রে এখন পর্যন্ত ভালোই করেছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় ছিল সবচেয়ে বড় সাফল্য।

তবে সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাদের খেলতে হবে প্রতিপক্ষের মাটিতে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবটি হলো- ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চারটি টেস্ট জিতলেও অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অন্তত একটি অ্যাওয়ে টেস্ট জিততে হবে। অথবা ওই চার অ্যাওয়ে টেস্টের মধ্যে তিনটিতে ড্র করে ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে হবে।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের জন্য ঘরের মাঠে নিখুঁত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি অ্যাওয়ে সিরিজেও বড় কিছু করতে হবে।

ভারত

টেস্ট: ৯, জয়-হার-ড্র: ৪-৪-১, পয়েন্ট শতাংশ: ৪৮.১৫

বাকি সিরিজ: শ্রীলঙ্কা (অ্যাওয়ে), নিউজিল্যান্ড (অ্যাওয়ে), অস্ট্রেলিয়া (ঘরে)-মোট ৯ টেস্ট।

গত বছর ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ হার ভারতের সমীকরণকে কঠিন করে দিয়েছে।

৬০ শতাংশে যেতে ভারতের প্রয়োজন আরও ৭৮ পয়েন্ট। অর্থাৎ ছয় জয় ও দুটি ড্রতে ৮০ পয়েন্ট, অথবা সাত জয়েই ৮৪ পয়েন্ট পেয়ে যাবে তারা।

বাকি নয় টেস্টের পাঁচটিই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। তবে এই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে ভারতের রেকর্ড দুর্দান্ত- ২০০৮ সাল থেকে নিজেদের মাটিতে শেষ পাঁচ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতের জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ১২-২। তবু সাম্প্রতিক ঘরের ফর্ম খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। নিউজিল্যান্ডের কাছে ৩-০ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ হেরেছে ভারত।

তাই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের আরও অনেক ভালো করতে হবে। তবে তার আগে শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কঠিন দুটি অ্যাওয়ে সিরিজ পার হতে হবে।

গত চক্রে ফাইনালিস্ট দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া যথাক্রমে ৬৯.৪৪ ও ৬৭.৫৪ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে শেষ করেছিল।

ভারত বাকি নয় টেস্টে সাত জয় ও দুই হার দেখলে ৬২.৯৬ শতাংশে শেষ করবে। আট জয় ও এক হার হলে তা দাঁড়াবে ৬৮.৫২ শতাংশ। 

শ্রীলঙ্কা

টেস্ট: ৪, জয়-হার-ড্র: ১-১-২, পয়েন্ট শতাংশ: ৪১.৬৭

বাকি সিরিজ: ভারত (ঘরে), পাকিস্তান (অ্যাওয়ে), নিউজিল্যান্ড (অ্যাওয়ে), দক্ষিণ আফ্রিকা (ঘরে)- মোট ৮ টেস্ট।

চলতি চক্রে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি সিরিজ খেলেছে শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশকে ১-০ ব্যবধানে হারানোর পর একই ব্যবধানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরেছে তারা।

ফলে সামনে ব্যস্ত টেস্ট সূচি। ৬০ শতাংশে যেতে আরও ৬৭ পয়েন্ট প্রয়োজন শ্রীলঙ্কার। পাঁচ জয় ও দুটি ড্র, অথবা ছয় জয়েই সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

তাই ঘরের মাঠের ম্যাচগুলো তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ আগস্ট ভারতের বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজ দিয়ে শুরু হবে সেই লড়াই।

বাকি আট টেস্টে ছয় জয় ও দুই হার দেখলে শ্রীলঙ্কা ৬৩.৮৯ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে শেষ করবে। সাত জয় ও এক হার হলে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৭২.২২ শতাংশে।

ইংল্যান্ড

টেস্ট: ১৩, জয়-হার-ড্র: ৪-৮-১, পয়েন্ট শতাংশ: ২৪.৩৬

বাকি সিরিজ: পাকিস্তান (ঘরে), দক্ষিণ আফ্রিকা (অ্যাওয়ে), বাংলাদেশ (অ্যাওয়ে)- মোট ৮ টেস্ট।

ওভার রেটের কারণে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইংল্যান্ড। চলতি চক্রে এখন পর্যন্ত ১৪ পয়েন্ট কাটা গেছে তাদের।

চার জয় ও এক ড্র থেকে পাওয়া ৫২ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৮-এ। এমনকি বাকি আটটি টেস্টের প্রতিটিতে জিতলেও এবং আর কোনও পেনাল্টি না পেলেও ইংল্যান্ডের চূড়ান্ত পয়েন্ট শতাংশ হবে মাত্র ৫৩.১৭।

অর্থাৎ, ফাইনালে জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা তাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষীণ।

পাকিস্তান

টেস্ট: ৬, জয়-হার-ড্র: ২-৪-০, পয়েন্ট শতাংশ: ২২.২২

বাকি সিরিজ: ইংল্যান্ড (অ্যাওয়ে), শ্রীলঙ্কা (ঘরে), নিউজিল্যান্ড (ঘরে)- মোট ৭ টেস্ট।

দুটি জয় ও চার হার-চলতি চক্রে পাকিস্তানের পারফরম্যান্স এখন পর্যন্ত হতাশাজনক। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আট পয়েন্টের পেনাল্টি।

বাকি সাতটি টেস্টের সবকটিতে জিতলে পাকিস্তান শেষ করতে পারবে ৬৪.১০ শতাংশে।

ছয় জয় ও একটি ড্র হলে তাদের পয়েন্ট শতাংশ হবে ৫৮.৯৭। আর ছয় জয় ও এক হার হলে তা নেমে যাবে ৫৬.৪১ শতাংশে।

অর্থাৎ, ফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পাকিস্তানের সামনে এখন প্রায় নিখুঁত পারফরম্যান্সের বিকল্প নেই।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ

টেস্ট: ১২, জয়-হার-ড্র: ২-৮-২, পয়েন্ট শতাংশ: ২০.৮৩

বাকি সিরিজ: বাংলাদেশ (অ্যাওয়ে)-২ টেস্ট।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে এখন আর খুব বেশি ম্যাচ নেই। বাকি মাত্র দুই টেস্ট। সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করলেও চলতি চক্রে তাদের পয়েন্ট শতাংশ ৩২.১৪-এর বেশি হবে না।

অর্থাৎ, ফাইনালের দৌড় থেকে কার্যত ছিটকে গেছে ক্যারিবীয়রা।