অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট। এক পাশে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাক্রমশালী দল, অন্য পাশে মাত্র তিন বছর আগে টেস্ট মর্যাদা পাওয়া এক নবীন দল। ২০০৩ সালে ডারউইনে সেই ঐতিহাসিক সিরিজের আগে বাংলাদেশকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমে চলছিল তীব্র সমালোচনা। এমনকি বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন।
সেই কঠিন সময়ে অবশ্য অন্য রকম এক বার্তা দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ। বাংলাদেশের অধিনায়ক খালেদ মাহমুদের কাছে গিয়ে নিঃশব্দে সাহস জুগিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘চিন্তা করো না।’
বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রয়াত সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অলরাউন্ডার ডেভিড হুকস। অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদার যোগ্য নয়। এমনকি স্টিভ ওয়াহদের বাংলাদেশকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ আহ্বানও জানিয়েছিলেন তিনি।
তবে হুকসের সেই মন্তব্য যে অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমের মনোভাব নয়, সেটিই বাংলাদেশকে বোঝাতে চেয়েছিলেন ওয়াহ।
ডারউইনে প্রথম টেস্ট শুরুর আগে এক অনুষ্ঠানে স্টিভ ওয়াহর সঙ্গে তার সেই কথোপকথন পরে স্মরণ করেছিলেন খালেদ মাহমুদ। ক্রিকবাজকে তিনি বলেছিলেন, ‘ডারউইনে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে একটি অনুষ্ঠানে আমরা একসঙ্গে হয়েছিলাম। সন্ধ্যার চা চলছিল। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম। হঠাৎ কোথা থেকে স্টিভ ওয়াহ এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কেমন আছি।’
এরপর ওয়াহ তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি সংবাদপত্র পড়ো?’ মাহমুদ বলেছিলেন, ‘সাধারণত পড়ি না, তবে মাঝে মাঝে পড়ি।’
এরপর ওয়াহ প্রশ্ন করেন, ‘ডেভিড হুকসের মন্তব্যটা পড়েছ?’ মাহমুদ বলেন, ‘হ্যাঁ, পড়েছি।’
তখন ওয়াহ তাকে বলেছিলেন, ‘এটা নিয়ে চিন্তা করো না। এটা শুধু একজন পাগল মানুষের কথা। আমি বিশ্বাস করি, তোমরা তার কথার চেয়ে অনেক ভালো দল এবং আমাদের বিপক্ষে ভালো খেলবে। তোমাদের জন্য শুভকামনা।’
কথোপকথনটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু খালেদ মাহমুদের মনে সেটি থেকে গিয়েছিল দীর্ঘদিন।
মাঠে যা ঘটেছিল, স্টিভ ওয়াহর কথার সঙ্গে তার ব্যবধান ছিল বিশাল। অস্ট্রেলিয়া তখন বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোর একটি। আর বাংলাদেশ ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর তখন পর্যন্ত কোনও টেস্ট জয়ের স্বাদ পায়নি। অভিজ্ঞ ও তারকাসমৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাই বাংলাদেশের সামনে ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ।
ডারউইনে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশকে ইনিংস ও ১৩২ রানে হারায় অস্ট্রেলিয়া। এরপর কেয়ার্নসে দ্বিতীয় টেস্টেও একইভাবে ইনিংস ব্যবধানে জয় পায় স্বাগতিকরা।
তবে অস্ট্রেলিয়ার সেই দাপটের মধ্যেও বাংলাদেশের যে অপমানজনক আচরণের অভিজ্ঞতা হয়নি- এটাই পরে মনে করেছিলেন মাহমুদ।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা অস্ট্রেলিয়ানদের অনেক স্লেজিং করতে শুনেছিলাম, কিন্তু মাঠে তার কিছুই দেখিনি। স্টিভ ওয়াহর দল স্লেজিংয়ের ধারেকাছেও যায়নি। আমাদের মতো দুর্বল ও অনভিজ্ঞ দলের বিপক্ষেও তাদের আচরণ ও মনোভাব ছিল শতভাগ পেশাদার।’
বাংলাদেশের জন্য অবশ্য সেই সফরের স্মৃতি শুধু দুটি বড় পরাজয়ের স্কোরকার্ডে আটকে থাকেনি। তাদের মনে থেকে গিয়েছিল বল মাঠে গড়ানোর আগেই স্টিভ ওয়াহর আচরণ।
টেস্ট ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোর পাশে বাংলাদেশের জায়গা পাওয়া উচিত কিনা—সেটি নিয়েই যখন প্রশ্ন উঠছিল, তখন ওয়াহ চাইলে বাংলাদেশকে সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি বাংলাদেশের অধিনায়কের কাছে গিয়ে কথা বলেছিলেন, সাহস দিয়েছিলেন।