আমেরিকা কেন অল্পস্বল্প ক্রিকেট খেলে?

ক্রিকেট মানেই যেন ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের কথা ক্রিকেটের সঙ্গে খুব কমই আসে। অথচ ইতিহাস বলছে, একসময় আমেরিকার মাটিতেও ক্রিকেটের ছিল বেশ শক্ত অবস্থান। 

তাহলে কীভাবে আমেরিকার জনপ্রিয় খেলা হওয়ার সম্ভাবনা থাকা ক্রিকেট ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল? কেন বেসবল দখল করে নিলো সেই জায়গা? চলুন জেনে নিই বিস্তারিত। 

আমেরিকায় ক্রিকেটের শুরু ১৭০৯ সালে

আমেরিকার মাটিতে ক্রিকেটের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে ১৭০৯ সাল থেকেই। ১৭৩৯ সালে নিউ ইয়র্কের সংবাদপত্রে ক্রিকেট খেলোয়াড় চেয়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়েই খেলাটি আমেরিকান সমাজে জায়গা করে নিতে শুরু করেছিল।

১৭৫১ সালে ম্যানহাটনে অনুষ্ঠিত হয় আমেরিকায় ক্রিকেটের প্রথম নথিভুক্ত প্রতিযোগিতাগুলোর একটি। ধীরে ধীরে খেলাটি ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে।

উনিশ শতকে ক্রিকেট পৌঁছে যায় আমেরিকার অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও। ১৮৮১ সালে পেনসিলভানিয়া, হার্ভার্ড, হ্যাভারফোর্ড, প্রিন্সটন ও কলাম্বিয়ার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে গঠিত হয় ইন্টারকলিজিয়েট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন। 

ক্রিকেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে ফিলাডেলফিয়া। ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ফিলাডেলফিয়া ক্রিকেট ক্লাব দেশটিতে খেলাটির বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। এরও আগে ১৮৩৩ সালে হ্যাভারফোর্ড কলেজে গড়ে উঠেছিল আমেরিকার প্রথম ক্রিকেট দল।

স্বাধীনতার পর বদলে যায় মানসিকতা

সমস্যা শুরু হয় আমেরিকার স্বাধীনতার পর। ব্রিটিশ শাসন থেকে বেরিয়ে নতুন একটি জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা সমাজের নানা ক্ষেত্রেই দেখা যায়। ক্রিকেটও সেই পরিবর্তনের ধাক্কা লাগে।

ক্রিকেট তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও অভিজাত সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে নতুন আমেরিকান পরিচয়ের সঙ্গে খেলাটি খুব একটা মানিয়ে নিতে পারেনি।

তবে শুধু ব্রিটিশবিদ্বেষ দিয়ে ক্রিকেটের পতন ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ ব্রিটিশ উৎসের টেনিস ও গলফ পরবর্তীতে আমেরিকায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে।

আরেকটি বড় সমস্যা ছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কাঠামো। ১৯০৯ সালে গঠিত আইসিসির আদি সংগঠন ইমপেরিয়াল ক্রিকেট কনফারেন্স-এর কাঠামো মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোকেন্দ্রিক ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ সেই আন্তর্জাতিক পরিসরে জায়গা পায়নি।

ফলে আমেরিকান ক্রিকেটের সামনে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও উন্নয়নের বড় মঞ্চও তৈরি হয়নি।

এর মধ্যেই উঠে এলো বেসবল

ক্রিকেট যখন ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে, তখন আমেরিকার মাটিতে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে আরেকটি ব্যাট-বল খেলা বেসবল।

এই উত্থানে বড় ভূমিকা রাখেন ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া উদ্যোক্তা এজি স্পালডিং। তিনি শুধু বেসবল সরঞ্জাম তৈরি করেননি, খেলাটিকে বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় করতেও বড় ভূমিকা রাখেন।

পেশাদার লিগ, সংগঠিত প্রতিযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের কাছে খেলাটিকে সহজলভ্য করার মাধ্যমে বেসবল দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে ক্রিকেটের সঙ্গে তখনও জড়িয়ে ছিল অভিজাত শ্রেণির ভাবমূর্তি। ফলে সাধারণ আমেরিকানদের কাছে বেসবল হয়ে উঠলো প্রতিযোগিতা, শক্তি ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক।

একটি প্রচলিত তুলনা তখনকার মানসিকতাকে বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরে—ক্রিকেট অবসরের বিনোদন, আর বেসবল যেন যুদ্ধের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলা।

ক্রিকেট কি খুব ধীর ছিল?

আমেরিকায় ক্রিকেট ব্যর্থ হওয়ার কারণ হিসেবে প্রায়ই বলা হয়, খেলাটি খুব ধীরগতির। কিন্তু ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এই যুক্তি খুব শক্তিশালী নয়।

ক্রিকেটের দীর্ঘতম সংস্করণ টেস্ট ক্রিকেট অবশ্যই সময়সাপেক্ষ। কিন্তু ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির মতো দ্রুত সংস্করণ পরে ক্রিকেটকে অনেক বেশি গতিশীল করেছে।

তার চেয়েও বড় কথা, আমেরিকানরা গলফ ও টেনিসের মতো ধৈর্য ও দীর্ঘ মনোযোগ প্রয়োজন এমন খেলাও পছন্দ করে। তাই শুধু ক্রিকেটের গতি এর ব্যর্থতার কারণ ছিল- এমন সিদ্ধান্তে আসা কঠিন।

একইভাবে ক্রিকেটে নিয়ম, আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া বা কর্তৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টিও আমেরিকান সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল- এমন যুক্তিও খুব শক্তিশালী নয়। ফুটবল ও বাস্কেটবলেও খেলোয়াড়দের কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়।

আসল কারণ বেসবল!

সব কারণ বিবেচনা করলে সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যাটি দাঁড়ায়- ক্রিকেটের জায়গা দখল করে নিয়েছিল বেসবল। যখন আমেরিকায় বেসবল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তখন সেটিকে আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং সাধারণ মানুষের খেলা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল। পেশাদার লিগ ও কলেজ পর্যায়ের সুযোগও বেসবলের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে।

অন্যদিকে ক্রিকেটের সঙ্গে অভিজাত ও ব্রিটিশ সংস্কৃতির সম্পর্ক রয়ে যায়। ফলে খেলাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি।

একসময় আমেরিকার মাটিতে ক্রিকেটের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, বেসবলের সাংগঠনিক ও বাণিজ্যিক উত্থানের কাছে সেটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

আবার ফিরছে ক্রিকেট

একুশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেট আবার মাথা তুলতে শুরু করেছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি দক্ষিণ এশীয় প্রবাসী জনগোষ্ঠী।

ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ ক্রিকেটপ্রেমী দেশগুলোর অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে বসতি গড়ার সঙ্গে নিয়ে গেছেন ক্রিকেটের ভালোবাসাও। বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় ক্লাব, লিগ ও টুর্নামেন্ট।

স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়েও ক্রিকেট পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফলে শুধু অভিবাসীদের খেলা হিসেবে নয়, নতুন প্রজন্মের আমেরিকানদের কাছেও ক্রিকেট পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে হারিয়ে নতুন বার্তা

যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিকেটের পুনর্জাগরণের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হয়ে আসে ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে যৌথভাবে টুর্নামেন্ট আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্র। এটিই ছিল দেশটির মাটিতে প্রথম আইসিসি টুর্নামেন্ট। 

আর সেই বিশ্বকাপেই ক্রিকেটবিশ্বকে চমকে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ডালাসে শক্তিশালী পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ টাই করে সুপার ওভারে জয় পায় স্বাগতিকরা। পাকিস্তান যেখানে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অন্যতম সফল দল, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের এই জয়কে আইসিসি টুর্নামেন্টের ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে বর্ণনা করেছে। 

বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আরও বড় অঘটনের জন্ম দেয় তারা। বাংলাদেশকে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হারিয়ে দেয় ২-১ ব্যবধানে। কোনও পূর্ণাঙ্গ সদস্যের বিপক্ষে সেটিই ছিল তাদের প্রথম সিরিজ জয়।