শেষ বলে সব ফিল্ডার সীমানায়, যে ঘটনা বদলে দিয়েছিল ক্রিকেটের নিয়ম

ক্রিকেটে শেষ বলের উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু একসময় এমন এক শেষ বল এসেছিল, যা শুধু একটি ম্যাচের ফলই নির্ধারণ করেনি, বদলে দিয়েছিল ওয়ানডে ক্রিকেটের নিয়মও। বাউন্ডারি থেকে রান আটকাতে উইকেটের আশপাশ প্রায় ফাঁকা করে সব ফিল্ডারকে সীমানায় পাঠিয়ে দিয়েছিল ইংল্যান্ড। সেই অদ্ভুত কৌশলই পরবর্তী সময়ে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ফিল্ডিংয়ের ওপর বিধিনিষেধ চালুর পথ তৈরি করে।

গত তিন দশকে ক্রিকেটের ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং তিন বিভাগেই ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ওয়ানডে ক্রিকেট চালুর পর সীমিত ওভারের ক্রিকেট দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। খেলার ধরন বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্যাট-বলের লড়াই আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে নিয়মেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

বর্তমান ওয়ানডে নিয়মে ইনিংসের প্রথম ১০ ওভারে ৩০ গজের বৃত্তের বাইরে সর্বোচ্চ দুজন ফিল্ডার থাকতে পারেন। এতে ব্যাটাররা শুরুতে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের বাড়তি সুযোগ পান। কিন্তু ওয়ানডে ক্রিকেটের শুরুর সময়ে এমন কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। চাইলে একটি দল ১০ জন ফিল্ডারকেই ৩০ গজের বৃত্তের বাইরে দাঁড় করাতে পারতো!

বাস্তবে এমন কৌশল খুব একটা দেখা যেতো না। তবে ১৯৭৯ সালে একটি ঘটনা ক্রিকেট বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিল, নিয়মে এমন সুযোগ থাকলে দলগুলো কতটা চরম কৌশল নিতে পারে।

ঘটনাটি ঘটেছিল বেনসন অ্যান্ড হেজেস ওয়ার্ল্ড সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে। ত্রিদেশীয় এই সিরিজে খেলছিল ক্রিকেট বিশ্বের তিন পরাশক্তি ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড।

প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। ফলে সিরিজে টিকে থাকতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচটি জেতা তাদের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দিবা-রাত্রির ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড। ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার দারুণ জুটি গড়েন। প্রথম উইকেটে আসে ৭৯ রান। তারকা ব্যাটিং লাইনআপের জন্য তৈরি হয় বড় সংগ্রহের ভিত্তি। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের গার্নার ও প্যারির দুর্দান্ত বোলিংয়ে শেষ পর্যন্ত ৫০ ওভারে ২১১ রানেই থামে ইংল্যান্ডের ইনিংস।

বৃষ্টির কারণে ম্যাচে বিরতি আসে। পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে ৪৭ ওভারে সংশোধিত লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯৯ রান। শুরুটা ভালো করলেও দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় ক্যারিবীয়রা। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে চলে আসে ইংল্যান্ডের হাতে।

শেষ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন ছিল ১০ রান। বল হাতে তুলে নেন ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি অলরাউন্ডার স্যার ইয়ান বোথাম। প্রথম পাঁচ বলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৭ রান তুলে নেয়। ফলে শেষ বলে জয়ের জন্য প্রয়োজন পড়ে মাত্র ৩ রান। এরপরই ঘটে সেই ঘটনা, যা পরবর্তীতে ক্রিকেটের নিয়ম বদলে দেওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।

ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক ব্রিয়ারলি শেষ বলের আগে দলের সব ফিল্ডারকে সীমানার কাছে পাঠিয়ে দেন। এমনকি উইকেটকিপার ডেভিড বেয়ারস্টোকেও বাউন্ডারিতে পাঠানো হয়। 

অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শেষ দিকের ব্যাটার কলিন ক্রফটের সামনে তখন কার্যত একটাই পথ- বল সীমানার বাইরে পাঠানো। তিন রান দরকার হওয়ায় ছক্কা মারার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু বোথামের বলে বোল্ড হয়ে যান ক্রফট।

ইংল্যান্ড ম্যাচটি জিতে যায়। কিন্তু জয় পেলেও তাদের সেই কৌশল প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাই কুড়ায় বেশি। ক্রিকেট বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রশ্ন ওঠে একটি দল কি এভাবে মাঠ সাজিয়ে প্রতিপক্ষকে ব্যাটিংয়ের স্বাভাবিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে পারে?

এই ঘটনার পরই সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ফিল্ডিং বিধিনিষেধ নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথমে ফিল্ডিং বিধিনিষেধ চালু করা হয়। পরে সেই নিয়ম ওয়ানডে ক্রিকেটেও আসে। ১৯৯২ সালে ওয়ানডেতে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিল্ডিং বিধিনিষেধ চালু হয়।