স্বাধীনতার ১৬ বছর আগেই ঢাকায় টেস্ট! জানেন সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের গল্প?

মাত্র সাত সপ্তাহ। একটি আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ আয়োজনের জন্য নতুন একটি স্টেডিয়াম তৈরি করতে সময়টা ছিল এতটুকুই। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তৈরি হলো মাঠ। তারপর ১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি, সদ্য নির্মিত সেই স্টেডিয়ামেই মুখোমুখি হলো পাকিস্তান ও ভারত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ১৬ বছর আগেই ঢাকার মাটিতে শুরু হলো আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়।

আজকের জাতীয় স্টেডিয়াম, তখনকার ঢাকা স্টেডিয়াম। বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ৪৫ বছর আগেই এই মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছিল টেস্ট ক্রিকেট। পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম হোম টেস্টের ভেন্যু ছিল ঢাকার এই স্টেডিয়াম। সর্বোচ্চ ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার মাঠটি তৈরি হয়েছিল পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার পাঁচ টেস্টের সিরিজের প্রথম ম্যাচ আয়োজনের জন্য।

পাকিস্তানের মাটিতে প্রথমবারের মতো অফিসিয়াল টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়েছিল ভারত। সেই সিরিজের প্রথম ম্যাচ আয়োজনের দায়িত্ব পড়ে ঢাকার ওপর। আর ম্যাচ আয়োজনের জন্য স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ শেষ করতে হয়েছিল মাত্র সাত সপ্তাহে। সময়ের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তৎকালীন ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিপির সাবেক চেয়ারম্যান এন এম খান। তার অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্টেডিয়ামটি হয়ে উঠেছিল তাঁর কৃতিত্বের স্থায়ী স্মারক।

পাকিস্তানের মাটিতে প্রথম অফিসিয়াল টেস্ট আয়োজনের এই গল্প নিজের বই ক্রিকেট উইদাউট চ্যালেঞ্জে তুলে ধরেছিলেন প্রয়াত কামারুদ্দিন বাট। তাঁর বর্ণনায়, ঢাকার স্টেডিয়াম ছিল এক অনন্য স্থাপত্যকীর্তি।

স্টেডিয়ামটি নির্মাণের দ্রুততা সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল ভারতীয় দলের খেলোয়াড়দের। অধিনায়ক লালা অমরনাথ ও তাঁর সতীর্থরা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, মাত্র সাত সপ্তাহে একটি স্টেডিয়াম তৈরি করা সম্ভব। পরে যখন তাঁরা বিষয়টি নিশ্চিত হলেন, অমরনাথ বলেছিলেন, যারা এই কাজ সম্ভব করেছেন, তাঁদের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি টুপি খুলে অভিবাদন জানাবেন।

সেই প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠেছিল নির্মাতাদের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা। পাকিস্তানের গঠনপর্বের দিনগুলোতে এমন দ্রুততার সঙ্গে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রচেষ্টার উদাহরণ।

মাঠের খেলায় অবশ্য শুরুতে এগিয়ে ছিল স্বাগতিক পাকিস্তান। চার দিনের ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ১০৯ রানের লিড নিয়েছিল তারা। পাকিস্তানের দুই পেসার মাহমুদ হোসেন ও খান মোহাম্মদ ভারতীয় ব্যাটিংয়ে বড় ধস নামান। মাহমুদ হোসেন ৬৭ রানে ছয়টি এবং খান মোহাম্মদ ৪২ রানে চারটি উইকেট নিয়ে ভারতের পুরো দলকে গুঁড়িয়ে দেন।

কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায় ভারত। এস. আর. গুপ্তের দুর্দান্ত বোলিংয়ে মাত্র ১৫৮ রানে অলআউট হয়ে যায় পাকিস্তান। গুপ্তের শিকার ছিল পাঁচ উইকেট, খরচ করেছিলেন মাত্র ১৮ রান।

এরপর ভারতের সামনে লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ম্যাচ বাঁচানো। ভি এল মানজরেকারের অপরাজিত ৭৪ এবং পি. রায়ের অপরাজিত ৬৭ রানের দৃঢ়চেতা ব্যাটিংয়ে বদলে যায় ম্যাচের পরিস্থিতি। শেষ পর্যন্ত ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়ে দুই দল। পাকিস্তানের হয়ে দুই ইনিংসেই হাফসেঞ্চুরি করেছিলেন ওয়াকার হাসান। দুই ইনিংসেই তাঁর সংগ্রহ ছিল ৫০ রান।

তবে ঢাকার এই মাঠের গল্প শুধু ১৯৫৫ সালের সেই ম্যাচে আটকে নেই। ক্রিকেট ইতিহাসে এটি এক বিরল রেকর্ডেরও মালিক। বিশ্বের একমাত্র স্টেডিয়াম হিসেবে এখানে দুটি ভিন্ন দেশ তাদের প্রথম হোম টেস্ট খেলেছে। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান এবং ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ—দুই দলেরই প্রতিপক্ষ ছিল ভারত।

১৯৫৫ থেকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান মোট সাতটি অফিসিয়াল টেস্ট খেলেছে। এরপর সময়ের পালাবদলে মাঠটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরও অংশ হয়ে ওঠে।

স্বাধীনতার আগের সেই সময়ের শেষ স্বীকৃত ম্যাচেও জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেকটি স্মৃতি। ওই ম্যাচে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার লাগানো ব্যাট নিয়ে খেলেছিলেন রকিবুল হাসান।

যে মাঠে স্বাধীনতার ১৬ বছর আগেই টেস্ট ক্রিকেটের আয়োজন হয়েছিল, সেই মাঠই পরে বাংলাদেশের প্রথম হোম টেস্টের সাক্ষী হয়েছে। একই প্রতিপক্ষ, দুই ভিন্ন দেশের ইতিহাস আর মাঝখানে বদলে যাওয়া একটি ভূখণ্ড—ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামের গল্পে ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময়েরও এক দীর্ঘ যাত্রা।