বেতন বাড়ছে, মান কমছে: আফগানিস্তান-জিম্বাবুয়ে থেকে কী শেখার আছে বাংলাদেশের?

একদিকে বাড়ছে ক্রিকেটারদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশা বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, ক্রিকেটারদের আর্থিক প্রাপ্তি বাড়লেও সেই অনুপাতে কি বাড়ছে মাঠের পারফরম্যান্স? তুলনামূলক কম সুযোগ-সুবিধা নিয়েও আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ে যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতার নজির গড়ছে, তখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সংকট কোথায়?

২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে ২৮ ক্রিকেটারকে পাঁচটি শ্রেণিতে রেখেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ‘এ’ শ্রেণির ক্রিকেটারদের মাসিক বেতন ৮ লাখ টাকা, ‘বি’ শ্রেণিতে ৬ লাখ, ‘সি’ শ্রেণিতে ৪ লাখ এবং ‘ডি’ শ্রেণিতে ২ লাখ টাকা। গত বছর থাকা সর্বোচ্চ ‘এ প্লাস’ শ্রেণি এবার বাদ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ ক্রিকেটারদের আর্থিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও ২০২৬ সালে বেতন ও ম্যাচ ফি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায় এই বিনিয়োগের প্রতিফলন মাঠে কতটা দেখা যাচ্ছে?

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতার অভাব। বড় দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য থাকলেও সেই লড়াই ধরে রাখার ক্ষমতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কখনও ব্যাটিং, কখনও বোলিং, আবার কখনও ফিল্ডিং। একটি জায়গার সমস্যা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই অন্য জায়গায় দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ব্যর্থতার আগে এশিয়ান গেমসেও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। সবশেষ ১৬টি অ্যাওয়ে ওয়ানডের ১৪টিতেই হেরেছে দলটি।

অথচ আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ের দিকে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তারা। বাংলাদেশের জন্য এই দুই দলের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার আছে অনেক কিছু।

প্রতিকূলতার মধ্যেও আফগানিস্তান

আফগানিস্তানের ক্রিকেটের পথ কখনোই সহজ ছিল না। রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশের মাটিতে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের সুযোগের অভাব। সবকিছুর মধ্যেই নিজেদের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়েছে তারা।

তারপরও আফগানিস্তান এখন আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছোট দল হিসেবে পরিচিত নয়। বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মতো বড় মঞ্চে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারানোর সামর্থ্য দেখিয়েছে দলটি। বাংলাদেশের বিপক্ষে টানা পাঁচ ম্যাচে জিতে নিজেদের উন্নতির চিত্রও আরও স্পষ্ট করেছে তারা।

আফগানিস্তানের সাবেক কোচ জোনাথন ট্রট দলটির সঙ্গে কাজ করার সময় নানা চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তার পর্যবেক্ষণ, খেলোয়াড়দের মধ্যে নিজেদের ও পরিবারের জন্য কিছু করার তাগিদও ছিল।

আফগান ক্রিকেটের আরেকটি বড় শক্তি হলো আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের নিয়মিত অংশগ্রহণ। ২০২৬ সালের আইএল টি-টোয়েন্টিতে ২৫ জন আফগান ক্রিকেটার বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজিতে চুক্তি পেয়েছেন। আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাহীও আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটকে খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা ও পেশাদার সুযোগ বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন।

অর্থাৎ আফগানিস্তানের সাফল্যের পেছনে শুধু জাতীয় দলের ক্যাম্প কিংবা অনুশীলন নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খেলার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আফগান ক্রিকেটারদের বেতন কাঠামোও বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন। সম্প্রতি এক পডকাস্টে দেশটির কেন্দ্রীয় চুক্তির বেতন নিয়ে ধারণা দিয়েছেন সাবেক কোচ ট্রট। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন ফরম্যাটেই বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা একজন ক্রিকেটারের বার্ষিক আয় প্রায় ৮০ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ বছরে কোটি টাকার কিছুটা কম।

তবে এই অঙ্কের বেতন পান এমন ক্রিকেটারের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ট্রটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু টি-টোয়েন্টি খেলা নূর আহমেদ বোর্ড থেকে মাসে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা আয় করেন।

এই তুলনা থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সামনে বোর্ডের চুক্তি থেকে তুলনামূলক বেশি আয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই আর্থিক সুবিধার সঙ্গে মাঠের সাফল্যের ব্যবধানও আলোচনায় আসছে।

জিম্বাবুয়ের লড়াইও কম নয়

জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটও দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। ঘরোয়া ক্রিকেটে অর্থের অভাব, খেলোয়াড়দের বেতন নিয়ে সমস্যা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—এসব দেশটির ক্রিকেটে নতুন নয়।

তারপরও বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে জিম্বাবুয়ে। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে খেলোয়াড় তুলে আনা এবং সীমিত সুযোগের মধ্যেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

সাম্প্রতিক উদাহরণটি বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের আবুধাবি ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশকে ৯৯ রানে হারিয়েছে জিম্বাবুয়ে। ওই ম্যাচে ব্রেন্ডন টেলর ৮১ রান করে জিম্বাবুয়ের ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন।

জিম্বাবুয়ের আর্থিক সামর্থ্য হয়তো বাংলাদেশের সমান নয়। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা, ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে খেলোয়াড় উঠে আসার পথ এবং নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের তাড়না তাদের লড়াইয়ে টিকে থাকতে সাহায্য করছে।

তাহলে বাংলাদেশের সমস্যা কোথায়?

প্রশ্নটি তাই ক্রিকেটারদের বেতন-ভাতা বাড়ানো উচিত কি না, তা নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বাড়তি সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে পারফরম্যান্সের দায়বদ্ধতাও কি একই হারে বাড়ছে?

জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের পেশাদারত্ব ও নৈতিক স্বচ্ছতা নিয়েও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রিদেশীয় সিরিজে আফগানিস্তানের কাছে হারের আগের রাতে বাংলাদেশের কয়েকজন ক্রিকেটার দুবাইয়ে শপিং করতে গিয়েছিলেন। তাদের কেউ কেউ স্বর্ণের দোকানেও গিয়েছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

অভিযোগটি সত্য হলে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে দলের প্রস্তুতি, শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামার দায়িত্ব কেবল রান করা, উইকেট নেওয়া কিংবা ম্যাচ জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রস্তুতি, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও পেশাদার আচরণও সেই দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে ক্রিকেটারদের মাঠের বাইরের আচরণ নিয়ে ওঠা এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

এশিয়ান গেমসের সময়ও ক্রিকেটারদের পেশাদার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে বারবার মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাঠের বাইরের আচরণও আলোচনায় আসছে। এতে জাতীয় দলের প্রস্তুতি ও শৃঙ্খলা নিয়ে জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা আরও সামনে চলে আসছে।

একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ভালো বেতন তাকে পেশাদারভাবে ক্রিকেটে মনোযোগী হতে সাহায্য করে। কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই শক্তিশালী দল তৈরি হয় না। প্রয়োজন মানসম্মত কোচিং, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ঘরোয়া ক্রিকেট, নিয়মিত ভালো মানের ম্যাচ, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত ধারাবাহিক পরিকল্পনা এবং পারফরম্যান্সের কঠোর মূল্যায়ন। এর পাশাপাশি প্রয়োজন পেশাদারত্ব ও দায়িত্ববোধের চর্চাও।

আফগানিস্তানের উদাহরণ বলছে, সীমাবদ্ধতা থাকলেও প্রতিভা সঠিকভাবে তৈরি ও কাজে লাগাতে পারলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শক্ত অবস্থান গড়া সম্ভব। দেশের মাটিতে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ না থাকায় কখনও ভারত, কখনও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিজেদের হোম ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করতে হয় আফগানিস্তানকে। তবু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের অগ্রযাত্রা থেমে নেই।

অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের অভিজ্ঞতা বলছে, আর্থিক সংকট থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা ও ক্রিকেটের কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা একটি দলকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখতে পারে।

সেই জায়গায় বাংলাদেশের হাতে তুলনামূলক বেশি আর্থিক সামর্থ্য ও ক্রিকেট অবকাঠামো রয়েছে। দর্শক, স্পনসর ও সম্প্রচার-সব মিলিয়ে দেশের ক্রিকেটের বাজারও বড়। ফলে প্রত্যাশাটাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মাঠের ফলাফলের ব্যবধান যখন বাড়তে থাকে, তখন প্রশ্ন উঠবেই। কেন প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বাংলাদেশ? আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এখনই।