‘স্পেশাল অ্যামং দ্য ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স’

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব সোয়ানসির ফিরিয়ে দেওয়া অখ্যাত ফরোয়ার্ড এদেরের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলে দেশের ইতিহাসের প্রথম বৈশ্বিক শিরোপা জিতে পর্তুগাল দেখিয়ে দিল টিমওয়ার্ক বা দলীয় ঐক্য এবং  জেতার অদম্য মানসিকতায় সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন সম্ভব।

ঐতিহাসিক ভাবেই ফুটবলের সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সফল দলগুলোর সুপার স্টারদের নাম। ব্রাজিলের প্রথম তিনটি বিশ্বকাপের জয়নায়ক হিসেবে পেলে, পরে রোমারিও, রোনালদো। আর্জেন্টিনার ১৯৮৬ সালের সর্বশেষ বিশ্বকাপ সাফল্যে ম্যারাডোনা, ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ে জিনেদিন জিদান, ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ সাফল্যে জিওফ হার্স্ট বা ১৯৮২ সালে পাওলো রসির ইতালি। ইউরোতেও হল্যান্ডের রুড গুলিত ও ফন বাস্তেন, ডেনমার্কের কোয়েম্যান ভাতৃদ্বয়, স্পেনের জাভি-ইনিয়েস্তার অধ্যায় দিয়েই তাদের সাফল্য কাহিনী। পর্তুগালের সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে কি তার দলের চূড়ান্ত সাফল্যের একক কাণ্ডারি বলা যাবে? সাত ম্যাচে তিন গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট রোনালদোকে দলের সেরা পারফরমারের মুকুট পড়ায় না কিন্তু পর্তুগাল তাতেও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন। কখনও রোনালদো, কখনও রেনাটো সানচেজ, কখনও নানি আর কখনও এদের ভাগাভাগি করে নেওয়া দলের সাফল্যযাত্রার দায়িত্বে বুঝা গিয়েছে এখানে দল বড়, পর্তুগালের টিমওয়ার্ক বড়। আর এজন্য পর্তুগাল ‘স্পেশাল অ্যামং দ্য আদার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স।’

২০০৪ সালে এরকম এক গ্রিসের কাছে হেরেছিলেন রোনালদো। গ্রিসের ধারাবাহিকতা নেই কিন্তু পর্তুগাল ঠিকই এগিয়ে গেছে; থেমে থাকেনি। যেখানে পর্তুগালের আরেক ফুটবল কিংবদন্তি ইউসেবিও যা পারেননি তাই করে দেখিয়েছেন রোনালদো। দেশকে উপহার দিয়েছেন একটি ফুটবল শিরোপা যার স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরেই দেখছিল পর্তুগাল। তবে মোট ১২০ মিনিটের খেলায় তিনি মাঠে ছিলেন মাত্র ২৩ মিনিট, এ ২৩ মিনিটের অর্ধেক কাটিয়েছেন খুঁড়িয়ে, খুঁড়িয়ে। আট মিনিটে ফরাসি মিডফিল্ডার দিমিত্রি পায়েতের করা কড়া ট্যাকলে বাম হাঁটুতে আঘাত পান। দুইবার চিকিৎসা নিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করেন খেলা চালিয়ে যেতে কিন্তু পারেননি। দলের কাণ্ডারির অশ্রুসজল প্রস্থান আসলে ছিল ছদ্মবেশী আশির্বাদ। এটি পর্তুগালকে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করে তোলে, অনুপ্রাণিত করে তোলে নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার জন্য। শোককে তারা পরিণত করে শক্তিতে আর তুলে নেয় সর্বোচ্চ সাফল্য।

ইউরো বা বিশ্বকাপের ইতিহাসে পর্তুগালই একমাত্র দল যারা গ্রুপে তৃতীয় হয়ে শেষ পর্যন্ত জিতেছে শিরোপা! বিদ্রুপের হাসি হেসেছিলেন অনেকেই কিন্তু ট্রফিটা যখন রোনালদোসহ তার টিমমেটদের হাতে শোভা পাচ্ছিল তখন সেই বীরদের সালাম করা ছাড়া কারও উপায় ছিল না।

এরমধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের পর প্রথমবার ফ্রান্সকে হারালো পর্তুগাল। ভেঙে দিল নিজ মাঠে টানা ১৮ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড। যে মাঠে ফ্রান্স জিতেছিল বিশ্বকাপ শিরোপা সেখানে তাদের বিপক্ষে অর্জন করলো ঐতিহাসিক জয়। অসাধারণ, অনন্য তাদের এ সাফল্য।

পর্তুগালের এ সাফল্য ফুটবল বিশ্বকে দিতে পারে নতুন এক দর্শন। ডিফেন্স বা রক্ষণভাগ সুদৃঢ় রেখে ধৈর্য্য ধরে এগিয়ে চলা আর নিজের শক্তির ওপর অগাধ আস্থা রেখে কৌশল বাস্তবায়ন করা ছিল পর্তুগালের সাফল্যের মূল উপাদান। লক্ষ্যে অবিচল, চাপে ভেঙে না পড়ার যে অনবদ্য উদাহরণ পর্তুগালের খেলোয়াড়রা দেখিয়েছেন তা স্থাপন করেছে এক দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ। আগামীতে পর্তুগাল তো বটে অনেক দলেরই অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে এ সাফল্য।

/এফআইআর/