দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের ফুটবলের মশাল সাবিনাদের হাতে

অনুশীলনে সাবিনারাসাবিনাকে ঠেকানোর জন্য বাড়তি কিছু কী ভেবেছেন ? ভারতীয় কোচ সাজিদ ধরকে প্রশ্নটি করে ভ্রু কুঁচকে উত্তরের অপেক্ষায় থাকলেন কলকাতার জনপ্রিয় এক দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক। উত্তরটি পাওয়া গেল । কিন্তু দেখে মনে হলো উত্তরটি দিয়ে না স্বস্তি পেয়েছেন ভারতীয় কোচ, না শুনে খুশি হয়েছেন প্রশ্নকর্তা সাংবাদিক।

বাংলাদেশের গোলরক্ষক সাবিনা আক্তারের সামনে পড়লে আপনি মনে হয় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছেন! দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের ফুটবলে ব্রাজিলিয়ান মার্তা ডি সিলভাখ্যাত ভারতীয় অধিনায়ক বালা দেবী মাথা নুয়ে স্বদেশী সাংবাদিকের অভিযোগটি মেনে নিলেন।

গ্রুপ পর্বের ম্যাচে যেভাবে বালা দেবীকে টার্ন করতে দেননি, ফাইনালের জন্য তো সে একই রকম ফরমেশন? ভারতীয় সাংবাদিকের প্রশ্নটি যেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ধামাকার মতো উড়িয়ে দিলেন বাংলাদেশ কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন।

ফাইনালের আগের দিন দুই ফাইনালিস্ট ভারত ও বাংলাদেশের টিম হোটেলে ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের সাংবাদিকদের নানা প্রশ্ন আটকে ছিল কাচের ঘরের মধ্যেই । কিন্তু উত্তরগুলোর প্রভাব বাউন্ডারি ছাপিয়ে অনেক দূরে। সব প্রশ্নের উত্তর মেলালে যেই স্ক্রিন শটটি পাওয়া গেল, সেটা হলো দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের ফুটবলের ভবিষ্যত এখন বাংলাদেশ। অর্থাৎ সাবিনার বাংলাদেশের হাতেই দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের ফুটবলের মশাল।

মুখে মুখে হিসেব করেই বলে দেওয়া যাচ্ছে, সাফ ফুটবলে খেলা বাংলাদেশ দলের গড় বয়স মাত্র ১৮ এর নিচে। সাফের ২০ সদস্যের দলে মোটা দাগে ১৫ জনই এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য। অর্থাৎ দলে ষোড়শী কন্যাদের মিছিল । তবুও কিনা অপরাজিত থেকে টুর্নামেন্টের ফাইনালিস্ট। সাবিনাদের ছায়ায় থাকা এই ষোড়শী কন্যারা ভবিষ্যতে কোথায় যেতে পারে সেটা তো দেখিয়ে দিয়েছে দেশের মাটিতে এএফসি অনুর্ধ্ব ১৬ বাছাইপর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েই। অর্থাৎ অভিজ্ঞ হয়ে গেলেই কৃষ্ণা, স্বপ্নাদের কাছে সাফের উত্তাপ হবে পাড়ার টুর্নামেন্টের মতো । এতদিন ভারত যা দেখিয়ে এসেছে আর কী । ভারতীয় কোচ সাজিদ ধর তো বলেই দিলেন , সামনের এএফসি টুর্নামেন্টগুলোতে বাংলাদেশর সম্ভাবনা উজ্জল। যা বলেছেন নেপাল ও আফগানিস্তান দলের কোচও।

বাংলাদেশ ও ভারতের অধিনায়ক সাবিনা ও বালা দেবীটানা তিন আসরের চ্যাম্পিয়ন ভারত ও ইউরোপীয় বংশোদ্ভুত খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত আফগানিস্তান বাংলাদেশের গ্রুপে থাকায় কেউ হাতে গোনেননি কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের বাংলাদেশকে। অথচ ছয় মাস আমেরিকায় অনুশীলন করে আসা আফগানদের জালে ৬ গোল দিয়ে রিটার্ন টিকিট ধরিয়ে বাংলাদেশের সাফ মিশন শুরু। আর শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে ড্র করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। সেমিফাইনালেও আবার প্রতিপক্ষ মালদ্বীপের গলায় গোলের মালা পরিয়ে দেওয়া। এই তো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলের টাইমলাইন।

আট দলের টুর্নামেন্টের ফাইনালে ভারত ও নেপাল এতদিন খেলে এসেছে নিয়ম করেই । এবারই সাবিনার বাংলাদেশের সামনে সে অলিখিত নিয়ম অসহায়। ফাইনালে নামার আগে তিন ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে ১২ গোল দিয়েছে বাংলাদেশর মেয়েরা, হজম করেনি একটি গোলও । অথচ সাবিনাকে বাদ দিলে ফরোয়ার্ড লাইনে যে স্বপ্না ও কৃষ্ণা আছেন, তারা ষোড়শী কিশোরী। আবার কোনও গোল হজম না করা বাংলাদেশের রক্ষণভাগ তো পুরোপিরই অনূর্ধ্ব ১৬ দল। এছাড়া ডাগ আাউট থেকে কোচের হাতের ইশারায় ভোজবাজির মত বদলে যাচ্ছে দলের ফরমেশন। এই সব ছোটখাটো পরিসংখ্যান জোড়া লাগালে বাংলাদেশের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানিই তো দিচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের ফুটবলের নাটাইটা এতদিন ছিল ভারতের হাতে, আছে এখনও। কিন্তু এবারই প্রথমবারের মত মেয়েদের ফুটবলের সিনিয়র পর্যায়ে ভারতের বিপক্ষে এসেছে গোলশূন্য ড্র । যার রেশ এখনও আছে শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে। ভারতের বিপক্ষে  হারের বৃত্ত ভেঙে বের হয়ে আসা গিয়েছে । বাকি থাকল জয় , সেটাও যদি  পাওয়া যায় তাহলে তো দক্ষিণ এশিয়ার মশাল নিয়েই বাংলাদেশে ফিরবে সাবিনারা। এবার না হলেও তো কিশোরীদের সামনেই থাকছে শ্রেষ্ঠত্বের মশাল ধরার হাতছানি। 

/এফএইচএম/